নির্বাচনি প্রচারণায় সহিংসতা বন্ধ করতেই হবে
গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে বাকি আর মাত্র দুই সপ্তাহ। এরপরই ফয়সালা হয়ে যাবে কার হাতে উঠছে ক্ষমতার মসনদ। গণতন্ত্রের প্রাণ হচ্ছে নির্বাচন, আর নির্বাচনের প্রাণশক্তি হচ্ছে নির্বাচনি প্রচারণা—যেখানে প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের সামনে নিজেদের আদর্শ, কর্মসূচি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে। কিন্তু সেই প্রচারণাই যদি সহিংসতা, ভয়ভীতি, হামলা-মামলা ও সংঘর্ষে কলুষিত হয়ে ওঠে, তবে তা শুধু একটি নির্বাচনের পরিবেশই নষ্ট করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ভেঙে পড়ে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে চলমান প্রচারণায় সহিংসতার ঘটনাগুলো গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা মোটেও কাম্য নয়।
২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হওয়ার পরপরই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, প্রচারণায় বাধা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক মামলার ঘটনা সামনে এসেছে। নির্বাচনি মাঠ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, যা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য মোটেও সহায়ক নয়। বরং এটি একটি অশনিসংকেত—যেখানে রাজনীতির প্রতিযোগিতা নীতি ও যুক্তির জায়গা ছেড়ে শক্তি প্রদর্শনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, নির্বাচনি সহিংসতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কোনো বিষয় নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। কখনো ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, কখনো প্রশাসনিক দুর্বলতা, আবার কখনো রাজনৈতিক দলগুলোর অসহিষ্ণু আচরণ নির্বাচনি মাঠকে রক্তাক্ত করেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিশীলিত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে আমরা দেখছি, সহিংসতা অনেক ক্ষেত্রে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে।
বর্তমান নির্বাচনি প্রচারণায় যে সহিংসতার চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনার সমষ্টি নয়; বরং এটি একটি কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন। প্রতিপক্ষকে মাঠছাড়া করা, ভয় দেখিয়ে প্রচারণা বন্ধ করা, মিথ্যা মামলা দিয়ে নেতাকর্মীদের হয়রানি করা—এসব এখন যেন নির্বাচনি কৌশলের অংশ হয়ে উঠছে। এর ফলে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে, তারা প্রকাশ্যে কোনো প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছেন।
প্রচারণা শুরুর পর থেকেই বিভিন্ন জেলা ও আসনভিত্তিক সহিংসতার খবর গণমাধ্যমে এসেছে। কোথাও প্রার্থীর মিছিলে হামলা, কোথাও নির্বাচনি অফিস ভাঙচুর, কোথাও ককটেল বিস্ফোরণ বা অগ্নিসংযোগ। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রচারণায় অংশ নেওয়া কর্মীদের বিরুদ্ধে পুরোনো বা নতুন রাজনৈতিক মামলার মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এসব ঘটনা শুধু বিরোধী দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রেই নয়, একই রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকেও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাত পৌনে ১০টায় শেরপুরে নির্বাচনি সহিংসতার একটি মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে এসেছে। ঝিনাইগাতী উপজেলা পরিষদ মাঠে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসা নিয়ে বাগ্বিতণ্ডা থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। শেরপুর-৩ আসনের জামায়াত প্রার্থী রাশেদুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি সমর্থকদের হামলায় দেশীয় অস্ত্র ব্যবহৃত হলে ৫০ জনের বেশি জামায়াত সমর্থক আহত হন। গুরুতর আহত তিনজনকে ময়মনসিংহ নেওয়ার পথে রেজাউল করিমের মৃত্যু হয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে—নির্বাচনি সহিংসতা কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
এই সহিংসতার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। যাদের ভোট দেওয়ার কথা উৎসবমুখর পরিবেশে, তারাই এখন শঙ্কিত—ভোটকেন্দ্রে গেলে কোনো বিপদ হবে না তো? প্রচারণায় অংশ নিলে কোনো হয়রানির শিকার হতে হবে না তো? এই ভয়ই গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
নির্বাচনি সহিংসতা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয় বরং এটি মূলত একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট। সহিংসতার মাধ্যমে কোনো নির্বাচন জেতা গেলেও তা কখনো নৈতিক বৈধতা পায় না। জনগণের প্রকৃত মতামত সেখানে প্রতিফলিত হয় না। বরং ভয় ও চাপের মধ্য দিয়ে অর্জিত ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনাকে আরও দুর্বল করে।
আন্তর্জাতিকভাবে গণতন্ত্রের যে মানদণ্ড স্বীকৃত, সেখানে শান্তিপূর্ণ প্রচারণা একটি মৌলিক শর্ত। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা কমনওয়েলথের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—ভোটার ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে নির্বাচন কখনোই অবাধ ও সুষ্ঠু হতে পারে না। বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে চায়, তবে নির্বাচনি সহিংসতা বন্ধ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় শীর্ষ নেতৃত্ব যদি স্পষ্ট ও দৃঢ়ভাবে সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান না নেয়, তাহলে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা সহজেই আগ্রাসী আচরণে জড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় দেখা যায়, প্রকাশ্যে সহিংসতার নিন্দা জানানো হলেও ভেতরে ভেতরে তা প্রশ্রয় পায়। এই দ্বিচারিতা রাজনীতিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে।
রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত—নিজেদের কর্মীদের জন্য কঠোর আচরণবিধি প্রণয়ন করা এবং তা বাস্তবায়নে আন্তরিক হওয়া। কোনো কর্মী সহিংসতায় জড়ালে দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষের প্রচারণার অধিকারকে সম্মান করতে হবে। গণতন্ত্র মানে শুধু নিজের কথা বলার অধিকার নয় বরং অন্যের কথা শোনার মানসিকতাও থাকতে হবে।
শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব অপরিসীম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিরপেক্ষ ও পেশাদার ভূমিকা পালন করতে হবে। কোথাও সহিংসতার আশঙ্কা দেখা দিলে আগাম ব্যবস্থা নিতে হবে, শুধু ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া দেখালে চলবে না। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনকে হতে হবে দৃঢ় ও সক্রিয়। আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় দ্রুত ও দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত না করলে সহিংসতা আরও বাড়বে।
নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকাংশেই নির্ভর করে তাদের সিদ্ধান্তের ওপর। কমিশন যদি রাজনৈতিক চাপের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তবে নির্বাচনি মাঠে একটি ইতিবাচক বার্তা যাবে যে, এখানে সহিংসতার কোনো স্থান নেই।
গণমাধ্যম নির্বাচনি সহিংসতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমে সহিংসতার ঘটনা তুলে ধরা যেমন জরুরি, তেমনি গুজব ও উসকানিমূলক তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকাও প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য ও উস্কানিমূলক ভিডিও অনেক সময় সহিংসতা বাড়িয়ে দেয়। তাই এই ক্ষেত্রেও সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য।
নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোরও উচিত শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পক্ষে সোচ্চার হওয়া। ভোটারদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নির্ভর করে সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীল আচরণের ওপর। রাজনৈতিক নেতা, কর্মী, প্রশাসন, গণমাধ্যম ও সাধারণ নাগরিক—সবাই যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করে, তাহলে সহিংসতা অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
নির্বাচনি প্রতিযোগিতা থাকবে, মতপার্থক্য থাকবে—এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা হতে হবে যুক্তি, কর্মসূচি ও আদর্শের ভিত্তিতে; লাঠি, ককটেল বা আগুনের মাধ্যমে নয়। রাজনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের সেবা, জনগণকে ভয় দেখানো নয়।
অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্ব শর্ত হচ্ছে শান্তিপূর্ণ প্রচারণা। কারণ, সহিংসতা দিয়ে অর্জিত ক্ষমতা কখনোই টেকসই হয় না। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই নির্বাচন যদি শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক হয়, তবে তা দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে নতুন গতি দেবে। আর যদি সহিংসতা ও ভয়ভীতির ছায়ায় ভোট হয়, তবে তার দায়ভার সবাইকে নিতে হবে। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করবে না। সুতরাং নির্বাচনি সহিংসতা এখনই বন্ধ করুন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা
[email protected]
এইচআর/জেআইএম