কে জিতবে নির্বাচনে?
নির্বাচনের দিন যতই এগিয়ে আসছে, ততই একটা প্রশ্ন জোরেশোরে সামনে আসছে, এবার কে জিতবে? বিএনপি, নাকি জামায়াত-এনসিপি জোট? এর পাশাপাশি আছে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এবারের নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক এখন আর কেবল ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এর কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্র—সংস্কার হবে কোন পথে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা কীভাবে পুনর্নির্ধারিত হবে, নারী নেতৃত্বের জায়গা কতটা প্রসারিত বা সংকুচিত হবে, আর তরুণ ভোটাররা কোন মূল্যবোধের দিকে ঝুঁকছে। এই সব প্রশ্ন একসঙ্গে এসে বিএনপি ও জামায়াত–এনসিপি জোটের প্রতিযোগিতাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ভোটের হিসাবে বিএনপি এগিয়ে—এই বাস্তবতা এখনও অটুট। মাঠপর্যায়ে বিএনপির সমর্থন যে তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত, তা তাদের নেতাদের বক্তব্যেও প্রতিফলিত হয়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান একাধিকবার বলেছেন, তারা এমন একটি রাষ্ট্র কাঠামো চান যেখানে ‘গণতন্ত্র মানে কেবল নির্বাচন নয়, কার্যকর জবাবদিহিও নিশ্চিত হবে’। সংস্কার প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী—তারা প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের কথা বলছে, কিন্তু বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মৌলিক ভিত্তিকে অস্বীকার করছে না। এই অবস্থান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ প্রশ্নেও স্পষ্ট; বিএনপি নেতৃত্ব বারবার দাবি করেছে যে মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপরিচয়ের ভিত্তি, যদিও তারা এই চেতনাকে কোনো একক দলের একচেটিয়া সম্পত্তি হিসেবে মানতে নারাজ।
এই জায়গাতেই জামায়াত–এনসিপি জোটের সঙ্গে একটি মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জামায়াত নেতারা সংস্কারের কথা বললেও তাদের সংস্কার ভাবনা মূলত নৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামোর ভেতরেই সীমাবদ্ধ। অতীতে এবং সাম্প্রতিক বক্তব্যেও জামায়াতের শীর্ষ নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, রাষ্ট্র সংস্কারের অর্থ তাদের কাছে পশ্চিমা উদার গণতন্ত্রের অনুকরণ নয়, বরং ‘ধর্মীয় ও নিজস্ব মূল্যবোধভিত্তিক শাসনব্যবস্থা’। মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে তাদের অবস্থান এখনও বিতর্কিত। তারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ অস্বীকার না করলেও, একে রাজনৈতিক বৈধতার চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে মানতে অনীহা দেখিয়েছে। এই অস্পষ্টতা জামায়াতের ঐতিহাসিক বোঝাকে আজও হালকা করতে পারেনি।
নারী নেতৃত্বের প্রশ্নে জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গি আরও স্পষ্টভাবে সংকীর্ণ। আলজারিরা টেলিভিশনে জামায়াতের আমীরের বক্তব্যেই তা স্পষ্ট হয়েছে। দলটির নেতারা বিভিন্ন সময় বলেছেন, নারীর সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত হওয়া উচিত, কিন্তু রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে নেতৃত্বের প্রশ্নে তারা ‘প্রাকৃতিক ভূমিকা বিভাজন’-এর যুক্তি তুলে ধরেছেন। এই ধরনের বক্তব্য শহুরে ও শিক্ষিত ভোটারদের বড় অংশের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। বিএনপি এই জায়গায় নিজেদের তুলনামূলকভাবে উদার শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের ইতিহাস এবং নারী রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে বিএনপির বক্তব্য জামায়াতের অবস্থানের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যায়, যা বিশেষ করে নারী ভোটার ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে রাজনীতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও একই সঙ্গে উদ্বেগজনক পরিবর্তনটি দেখা যাচ্ছে তরুণ ভোটারদের আচরণে। একদিকে তারা দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্থবিরতায় বিরক্ত; অন্যদিকে তাদের একটি অংশ ক্রমেই রক্ষণশীলতার দিকে ঝুঁকছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় ও পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির ভাষা তরুণদের মধ্যে নতুন করে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। জামায়াত–এনসিপি জোট এই প্রবণতাকে গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের বক্তব্য সাজাচ্ছে। এটা তরুণদের একাংশকে আকৃষ্ট করছে, যদিও একই সঙ্গে অনেক তরুণই নারী অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে জামায়াতের অবস্থানকে সন্দেহের চোখে দেখছে।
বিএনপির অতীত দুঃশাসন ও চাঁদাবাজিকে প্রতিপক্ষ যেমন বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, অন্যদিকে জামায়াতের স্বাধীনতা ও নারীবিরোধী ভূমিকাকে প্রতিপক্ষরা সামনে তুলে আনছে। এতে করে উভয় পক্ষই ভোটারদের কাছে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়ছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক মহল ও অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা এই আদর্শিক দ্বন্দ্বকে আরও জটিল করেছে। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো সংস্কার যতটুকু চায়, তার চেয়ে বেশি চায় নিয়ন্ত্রণ। তারা জামায়াত–এনসিপি জোটকে পুরোপুরি উপেক্ষা করছে না, আবার বিএনপির বড় জনসমর্থনকেও অগ্রাহ্য করতে পারছে না। অন্তর্বর্তী সরকারও একই দ্বন্দ্বে আটকে—নিরপেক্ষতা বজায় রাখার দাবি আর বাস্তব শাসন পরিচালনার চাপ একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে তাদের অবস্থাও লেজেগোবরে।
এবারের নির্বাচন কেবল কে সরকার গঠন করবে—এই প্রশ্নের উত্তর দেবে না; এটি জানিয়ে দেবে বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে। সংস্কার হবে কি উদার গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে, নাকি রক্ষণশীল নৈতিকতার মোড়কে? মুক্তিযুদ্ধ থাকবে কি রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তি হিসেবে, নাকি তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে? নারী নেতৃত্ব ও তরুণদের স্বাধীনতার জায়গা কি আরও প্রসারিত হবে, নাকি সংকুচিত হবে? বিএনপি ভোটে এগিয়ে থাকতে পারে, জামায়াত–এনসিপি কৌশলে শক্ত অবস্থান নিতে পারে, আর আওয়ামী লীগের ভোট—এই নীরব শক্তিই হয়তো ঠিক করে দেবে কোন দর্শন আগামী দিনের বাংলাদেশকে পরিচালনা করবে।
তবে এই পুরো হিসাবকেও সবচেয়ে বেশি অনিশ্চিত করে তুলেছে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা দলটি এই নির্বাচনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী না হলেও তাদের সমর্থকদের আচরণ ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। এই ভোটের একটি অংশ ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে, আরেকটি অংশ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় বিএনপির দিকে ঝুঁকতে পারে। আবার এমন ভোটারও আছেন, যারা বিএনপির একক ক্ষমতা নিয়ে শঙ্কিত এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার জন্য জামায়াত–এনসিপি জোটকে কৌশলগতভাবে বেছে নিতে পারেন। এই ‘অনাথ ভোট’-এর দিকনির্দেশনাই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার পাল্লা কোন দিকে ঝুঁকবে, তা ঠিক করে দেবে।
তবে সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্রের অবস্থান নির্বাচনকে কতটা প্রভাবিত করছে, তারওপরও ভোটের ফলাফল অনেকখানি নির্ধারিত হবে। আর এই সমর্থনের পাল্লা জামায়াত-এনপিসিপির দিকে ভারী বলে নানা মহলে আলাপ শোনা যাচ্ছে। এই সব বিষয় একসঙ্গে এসে বিএনপি ও জামায়াত–এনসিপি জোটের প্রতিযোগিতাকে আরও জটিল এবং বহুস্তরবিশিষ্ট করে তুলেছে।
নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লেই সমাজে নানা ধরনের কানাঘুঁষা, আশঙ্কা ও কল্পকাহিনি ভেসে ওঠে। বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম নয়। এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন শক্তিকে ক্ষমতায় আনার জন্য আমেরিকা–পাকিস্তান–তুরস্কের সমর্থনে একটি বিশাল গোপন পরিকল্পনা চলছে—এমন ধারণা রাজনৈতিক অঙ্গনে ও সামাজিক আলোচনায় ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। আবার এমন কথাও শোনা যাচ্ছে যে, তারেক রহমান ভারতের সবুজ সংকেত নিয়েই বাংলাদেশে এসেছে, কাজেই ভারতের সমর্থন বিএনপির দিকেই থাকছে। এই বয়ান বাস্তব তথ্যের চেয়ে বেশি নির্ভর করছে ভয়, সন্দেহ, অতীতের স্মৃতি এবং বর্তমান অনিশ্চয়তার ওপর। তবু এটিকে নিছক উড়িয়ে দেওয়াও সহজ নয়, কারণ প্রতিটি রাজনৈতিক গুজবের ভেতরেই কিছু না কিছু সামাজিক বাস্তবতা, মানসিক চাপ ও অভিজ্ঞতার প্রতিফলন থাকে।
নির্বাচন ঘিরে যে গুঞ্জন, কানাঘুষা ও ‘অভ্যন্তরীণ তথ্য’-এর বয়ান এখন নানা মহলে ঘুরছে, তা যদি কেবল রাজনৈতিক রটনা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া হতো, তাহলে বিষয়টি এতটা উদ্বেগজনক হতো না। কিন্তু এই বিবরণে যে কাঠামোগত পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে—আন্তর্জাতিক সমর্থন, আর্থিক লজিস্টিক্স, সামাজিক আড়াল, প্রযুক্তিগত সুবিধা, ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতি—সব মিলিয়ে এটি একটি নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছবি আঁকছে, যেখানে ভোট কেবল ব্যালট নয়; এটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বহুস্তরীয় প্রক্রিয়া। ভয়াবহতা এখানেই যে, এই প্রক্রিয়াটি দৃশ্যমান সংঘর্ষের বদলে নীরব, ধীর এবং সামাজিকভাবে প্রায় অপ্রতিরোধ্য বলে উপস্থাপিত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, এবারের নির্বাচন কেবল কে সরকার গঠন করবে—এই প্রশ্নের উত্তর দেবে না; এটি জানিয়ে দেবে বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে। সংস্কার হবে কি উদার গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে, নাকি রক্ষণশীল নৈতিকতার মোড়কে? মুক্তিযুদ্ধ থাকবে কি রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তি হিসেবে, নাকি তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে? নারী নেতৃত্ব ও তরুণদের স্বাধীনতার জায়গা কি আরও প্রসারিত হবে, নাকি সংকুচিত হবে? বিএনপি ভোটে এগিয়ে থাকতে পারে, জামায়াত–এনসিপি কৌশলে শক্ত অবস্থান নিতে পারে, আর আওয়ামী লীগের ভোট—এই নীরব শক্তিই হয়তো ঠিক করে দেবে কোন দর্শন আগামী দিনের বাংলাদেশকে পরিচালনা করবে।
তবে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন সত্যিই ‘দারুণ’ হবে নাকি আরও বিতর্কিত—তা নির্ভর করবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি, রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ববোধ এবং নাগরিক সমাজের সচেতনতার ওপর। ষড়যন্ত্রের গল্প যত আকর্ষণীয়ই হোক, গণতন্ত্র টিকে থাকে প্রমাণ, স্বচ্ছতা ও যুক্তির ওপর। ভয় নয়, প্রশ্নই হওয়া উচিত রাজনীতির চালিকাশক্তি। গুজব নয়, তথ্যই হওয়া উচিত আলোচনার ভিত্তি। আর ইতিহাস ভুলে যাওয়ার আহ্বান নয়—ইতিহাসকে বুঝে, তার শিক্ষা নিয়ে সামনে এগোনোর সাহসই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
এইচআর/এমএস