ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

নির্বাচনি ইশতেহারে কৃষি কতটুকু গুরুত্ব পেলো

ড. রাধেশ্যাম সরকার | প্রকাশিত: ০৯:১৯ এএম, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও নির্বাচনমুখী পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যেই ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে ঘিরে দলগুলো জনসমর্থন অর্জনের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ এবং নির্বাচনি প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিশ্রুতি, পরিকল্পনা এবং উন্নয়নের নানা অঙ্গীকার এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। ভোটারদের আস্থা অর্জনের জন্য দলগুলো তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরছে এবং বিভিন্ন খাতের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কৃষি নিয়েও কিছু বক্তব্য উঠে আসছে, তবে সেই আলোচনা গভীরতা এবং বাস্তব পরিকল্পনার দিক থেকে অনেকটাই সীমিত বলে প্রতীয়মান হয়। কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি খাত হওয়া সত্ত্বেও নির্বাচনি ইশতেহার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এই খাতটি প্রাপ্য গুরুত্ব পাচ্ছে না।

বাংলাদেশে কৃষির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ছয় থেকে আট কোটি। এর বাইরে দেশের প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে কৃষিপণ্যের ওপর নির্ভরশীল। খাদ্য, পুষ্টি, কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি কৃষি। তাই কৃষি খাতের উন্নয়ন মানে কেবল উৎপাদন বৃদ্ধি নয় বরং এটি জাতীয় উন্নয়নের একটি মৌলিক শর্ত। কিন্তু নির্বাচনি ইশতেহারগুলোতে কৃষির এই ব্যাপক বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়নি। কৃষকের জীবনমান, আয়, বাজার নিরাপত্তা এবং খাদ্য ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিয়ে স্পষ্ট কোনো রূপরেখা দেখা যায় না।

নির্বাচনি অঙ্গীকারগুলোতে প্রায়ই বাণিজ্যিক কৃষি গড়ে তোলার কথা বলা হয়। কৃষিকে লাভজনক ও আধুনিক করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বক্তব্য রাখা হয়। কিন্তু কৃষিকে বাণিজ্যিকভাবে উন্নত করতে হলে কৃষককে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা অপরিহার্য। একজন কৃষককে উদ্যোক্তা হতে হলে তাকে প্রযুক্তিগত জ্ঞান, আর্থিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ, বাজার বিশ্লেষণ দক্ষতা এবং সংগঠিত বিপণন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হয়। নির্বাচনি ইশতেহারগুলোতে এই বাস্তব পদক্ষেপগুলোর কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা দেখা যায় না। ফলে কৃষি বাণিজ্যিকীকরণের অঙ্গীকার বাস্তবতার চেয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কেবল উচ্চারণে সীমাবদ্ধ থাকে।

খাদ্য নিরাপত্তা বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো অবশ্যই জরুরি, তবে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে খাদ্যে ভেজাল, রাসায়নিক ব্যবহার এবং মান নিয়ন্ত্রণের অভাব একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনি ইশতেহারগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে কিছু সাধারণ বক্তব্য থাকলেও এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য কার্যকর আইন, মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক কাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদন থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার ওপর নজরদারি প্রয়োজন। কিন্তু নির্বাচনি অঙ্গীকারে এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতি স্পষ্ট।

কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়টি সব রাজনৈতিক দলের আলোচনায় স্থান পেয়েছে। তবে উৎপাদন বৃদ্ধি কেবল সমস্যার একটি অংশ সমাধান করে। উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারে সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিত করা সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবতা হলো কৃষক প্রায়ই উৎপাদনের সময় ভালো ফলন পেলেও বাজারে ন্যায্য মূল্য পায় না। অনেক সময় কৃষিপণ্য নষ্ট হয়ে যায় সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে। নির্বাচনি ইশতেহারগুলোতে উৎপাদন বৃদ্ধির কথা বলা হলেও উৎপাদন, সরবরাহ এবং বাজার ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কার্যকর পরিকল্পনা অনুপস্থিত। মূল্য নিরাপত্তা কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পেলে কৃষিতে আগ্রহ হারায়। অন্যদিকে ভোক্তা যদি অস্বাভাবিক উচ্চ মূল্যে খাদ্য কিনতে বাধ্য হয় তাহলে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে ন্যায্য মূল্যের কথা বলা হলেও মূল্য নির্ধারণে কার্যকর বাজার নিয়ন্ত্রণ, কৃষক সমবায় শক্তিশালী করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা নিয়ন্ত্রণের মতো বাস্তব পদক্ষেপের উল্লেখ দেখা যায় না।

বাংলাদেশে কৃষি জমির পরিমাণ ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং শিল্পায়নের কারণে কৃষি জমি সংকুচিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা ছাড়া বিকল্প নেই। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, উন্নত বীজ, স্মার্ট সেচ ব্যবস্থা এবং গবেষণাভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু নির্বাচনি ইশতেহারগুলোতে প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যাপারে সামগ্রিক পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের মতো এলাকায় সেচ সংকট এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব অঞ্চলে কৃষি পুনরুজ্জীবনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন, যা নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

এই নির্বাচন বাংলাদেশের কৃষি খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি আন্তরিকভাবে কৃষিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তবে কৃষি খাত নতুন সম্ভাবনা ও টেকসই উন্নয়নের দ্বার উন্মোচন করতে সক্ষম হবে। অন্যথায় কৃষি উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিগুলো কেবল নির্বাচনি স্লোগান ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে এবং কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাস্তবে অর্জিত হবে না।

পরিবেশ এবং কৃষির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। নদীর পানি দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষি উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। নদীর পানি দূষিত হলে সেচ ব্যবস্থা এবং মৎস্য সম্পদ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা, বন্যা এবং লবণাক্ততার মতো সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নির্বাচনি ইশতেহারগুলোতে পরিবেশসম্মত কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনার অভাব লক্ষ্য করা যায়।

কৃষি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু উপেক্ষিত সমস্যা হলো পোস্ট হারভেস্ট লস। প্রতিবছর উৎপাদিত কৃষিপণ্যের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বিভিন্ন কারণে নষ্ট হয়ে যায়। সংরক্ষণ সুবিধার অভাব, পরিবহন সমস্যার কারণে এই ক্ষতি ঘটে। এই ক্ষতি কমানো গেলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষকের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। কিন্তু নির্বাচনি ইশতেহারগুলোতে আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, শীতল সংরক্ষণ কেন্দ্র কিংবা কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলার বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই।

কৃষকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাজার অস্থিরতা এবং উৎপাদন ব্যয়ের বৃদ্ধি নিয়ে সবসময় ঝুঁকির মধ্যে থাকে। কৃষি বীমা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং কৃষক পরিবারের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সহায়তা কৃষকদের জীবনের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু নির্বাচনি ইশতেহারগুলোতে এসব বিষয় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

বাংলাদেশে কৃষিকে প্রায়ই গৌরবের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কৃষককে মাটির মানুষ হিসেবে সম্মান জানানো হয়। কিন্তু বাস্তব কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষকের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ সীমিত। কৃষকের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন এবং তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কৃষি খাতের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

বর্তমান নির্বাচনি প্রেক্ষাপটে কৃষি নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে তা আশাব্যঞ্জক হলেও যথেষ্ট নয়। কৃষি উন্নয়নের জন্য সমন্বিত খাদ্য ব্যবস্থা, বাজার কাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং পরিবেশ সুরক্ষার মতো বিষয়গুলোকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি বাস্তব পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন না করে তাহলে কৃষি খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না। কৃষক ন্যায্য মূল্য প্রত্যাশা করছে। ভোক্তা নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মূল্যের খাদ্য প্রত্যাশা করছে। সাধারণ মানুষ চায় কৃষি খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত হোক। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নির্বাচনি অঙ্গীকারকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়া।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন অনেকাংশেই কৃষির স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির ওপর নির্ভরশীল। কৃষিকে সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী করতে হলে শুধু বক্তৃতা, আশ্বাস বা নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট ও বাস্তবমুখী নীতি প্রণয়ন, কার্যকর ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। নির্বাচনি ইশতেহারে কৃষিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া মানে কেবল উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, বরং দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা শক্তিশালী করা এবং সামাজিক উন্নয়নের ভিতকে আরও মজবুত করা।

এই নির্বাচন বাংলাদেশের কৃষি খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি আন্তরিকভাবে কৃষিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তবে কৃষি খাত নতুন সম্ভাবনা ও টেকসই উন্নয়নের দ্বার উন্মোচন করতে সক্ষম হবে। অন্যথায় কৃষি উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিগুলো কেবল নির্বাচনি স্লোগান ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে এবং কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাস্তবে অর্জিত হবে না।

লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, কলামিস্ট ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।
[email protected]

এইচআর/এমএস