নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিতে আপসহীন সশস্ত্র বাহিনী
বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে এত ব্যাপক নিরাপত্তা প্রস্তুতি আগে কখনো দেখা যায়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে যে পরিমাণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সশস্ত্র সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে, তা এক কথায় নজিরবিহীন। এটি কেবল একটি নির্বাচন নয়—এটি রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, সাংবিধানিক অঙ্গীকার এবং নিরপেক্ষতার এক বড় পরীক্ষা।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১ লাখ সদস্য মাঠে আছেন। নৌবাহিনীর ৫ হাজার এবং বিমান বাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। নজরদারিতে সেনাবাহিনী ব্যবহার করবে প্রায় ২০০ ড্রোন। প্রযুক্তিনির্ভর এই নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, সংবেদনশীল কেন্দ্র এবং জনসমাগমপূর্ণ স্থানগুলো পর্যবেক্ষণে রাখা হবে।
এত বিস্তৃত ও সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামো বাংলাদেশের ইতিহাসে অভূতপূর্ব একটি ঘটনা।
দেশজুড়ে মোট ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৭৮০টি কেন্দ্র “অধিক গুরুত্বপূর্ণ” এবং ১৬ হাজার ৫৪৮টি কেন্দ্র “গুরুত্বপূর্ণ” হিসেবে চিহ্নিত। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক কেন্দ্রই বিশেষ নজরদারির আওতায়।
এসব কেন্দ্রে অতিরিক্ত ফোর্স, মোবাইল টিম, স্ট্রাইকিং ফোর্স ও রিজার্ভ ইউনিট থাকবে। দ্রুত প্রতিক্রিয়ার জন্য কুইক রেসপন্স টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য, অতীত নির্বাচনের অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এই ঝুঁকি-ভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক নির্বাচন ব্যবস্থাপনায়ও এমন রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট মডেল অনুসরণ করা হয়।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ২৫ হাজার বডি ওয়ার্ন ক্যামেরা ব্যবহার। নিরাপত্তা সদস্যদের শরীরে সংযুক্ত এই ক্যামেরাগুলো দায়িত্ব পালনের সময়কার সার্বিক কার্যক্রম রেকর্ড করবে।
এর ফলে নিরাপত্তা সদস্যরা আরও সতর্ক ও পেশাদার আচরণ করবেন। নিরপেক্ষতা নিশ্চিতে এটিও একটি বড় পদক্ষেপ।
অভিযোগ উঠলে প্রমাণভিত্তিক তদন্ত করা সম্ভব হবে।
প্রযুক্তিনির্ভর এই পদক্ষেপ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এটি বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
স্বৈরাচারী শাসন-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মতো সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেনাবাহিনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সামনে আসে এবং দেশের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষা, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে।
কিন্তু নির্বাচন ভিন্ন বাস্তবতা। এখানে শুধু শৃঙ্খলা রক্ষা নয়—নিরপেক্ষতার দৃশ্যমান প্রমাণ দেওয়াও জরুরি। কারণ নির্বাচন মানেই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, উত্তেজনা ও অভিযোগ।
এই প্রেক্ষাপটে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মুহূর্তে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলেও তিনি সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে কোনো পদক্ষেপ নেননি। বরং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
এখানে এই কথা আমাকে বলতেই হবে যে সেনাপ্রধান ক্ষমতা দখলের পথে না গিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানগত স্থিতিশীলতাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন—এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু একটি প্রতিরক্ষা বাহিনী নয় বরং এটি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা জাতির অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পরবর্তী সময়ে সীমান্ত সুরক্ষা, পার্বত্য অঞ্চলে স্থিতিশীলতা, দুর্যোগ মোকাবিলা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে সাফল্যের মাধ্যমে তারা দেশের মর্যাদা উঁচু করেছে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সেনাসদস্যরা পেশাদারিত্ব ও মানবিকতার স্বাক্ষর রেখেছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদ্ধারকাজ, সড়ক-সেতু নির্মাণ, চিকিৎসা সহায়তা—সব ক্ষেত্রেই তারা আস্থার প্রতীক।
এই ঐতিহ্যই আজ তাদের সামনে বাড়তি দায়িত্ব তৈরি করেছে—নির্বাচনেও সেই পেশাদারিত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা তাদের অন্যতম কর্তব্য।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা গুজব ও অপপ্রচার ছড়ানো হচ্ছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভিডিও, বিভ্রান্তিকর বিশ্লেষণ এবং বিদেশি প্রভাবের অভিযোগ—সব মিলিয়ে তথ্যযুদ্ধের এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানের শক্তি তার কাজের মধ্যেই ফুটে ওঠে। সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল না হয়ে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে আস্থা অর্জনের পথেই এগোচ্ছে। পেশাদারিত্বই দিয়েই তারা এ ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করছে।
এত বিপুল পরিমাণ সেনা মোতায়েন একদিকে যেমন নিরাপত্তার বার্তা দেয়, অন্যদিকে বড় ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জও তৈরি করে। সমন্বয়, কমান্ড চেইন, নির্দেশনা এবং সংযম—সবই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
নিরাপত্তা যেন ভয়ের কারণ না হয়—এই ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় দক্ষতা। ভোটার যেন কেন্দ্রে গিয়ে নিজেকে নিরাপদ মনে করেন, কেউ যেন চাপের মধ্যে না পড়েন-নিরাপত্তার পাশাপাশি এটাও নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এত বড় নিরাপত্তা মোতায়েন আগে হয়নি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সংখ্যা নয়—আচরণই নির্ধারণ করবে এই নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হবে।
দেশের মানুষ চায় ভয়মুক্ত ভোট, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং গ্রহণযোগ্য ফলাফল। সশস্ত্র বাহিনীর সামনে এখন সেই প্রত্যাশা পূরণের ঐতিহাসিক সুযোগ।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। এখন সময়—গণতন্ত্রের প্রহরী হিসেবেও সেই আস্থা অটুট রাখার। নিরপেক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। সুতরাং পেশাদারিত্বই হোক সশস্ত্র বাহিনীর সবচেয়ে বড় পরিচয়। ১২ ফেব্রুয়ারি আরেকটি গৌরবের তিলক পড়ুক সশস্ত্র বাহিনী। এটাই গণতন্ত্রকামি ও দেশপ্রেমীক প্রতিটি মানুষের প্রত্যাশা।
লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]
এইচআর/এএসএম