ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

ধর্ষণ-হত্যা ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি : রাষ্ট্র কোথায় দাঁড়িয়ে?

হাসান হামিদ | প্রকাশিত: ১০:৩৫ এএম, ০১ মার্চ ২০২৬

নরসিংদীর মাধবদীতে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে বাবার সামনে থেকে অপহরণ করে হত্যা করার ঘটনা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সামনে এক নির্মম প্রশ্নচিহ্ন তুলে ধরেছে। অভিযোগ রয়েছে, এর আগে ওই কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছিল এবং পরিবার বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো হুমকি, সামাজিক চাপ ও ক্ষমতার প্রভাবের মুখে পড়ে। বিচার না পেয়ে, নিরাপত্তা না পেয়ে, শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারাতে হলো একটি কিশোরীকে। এই ঘটনাকে আমরা বিচ্ছিন্ন অপরাধ বলে পাশ কাটাতে পারি না; বরং এটি আমাদের বিচারহীনতা, সামাজিক নৈতিক অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক-প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার গভীর সংকটের প্রতিফলন।

মাধবদী থানায় দায়ের করা মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে, ধর্ষণের অভিযোগের পর পরিবার স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছে বিচার চেয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, সালিশের নামে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয় এবং পরিবারকে এলাকা ছাড়ার চাপ দেওয়া হয়। বিচার না হওয়ায় অভিযুক্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পরিণতিতে, বাবার সামনে থেকে কিশোরীকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়। যদি অভিযোগ সত্য হয়, তবে এটি কেবল একটি খুন নয়; এটি বিচারপ্রার্থীর কণ্ঠরোধ, একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের অধিকারকে নির্মমভাবে অস্বীকার করা।

এই ঘটনার পর পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং মূল অভিযুক্ত নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরাকেও গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন প্রথম অভিযোগের সময়ই আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি? কেন পরিবার থানায় অভিযোগ করতে পারেনি; ভয়, অজ্ঞতা, নাকি প্রভাবশালীদের চাপ? স্থানীয় সালিশ সংস্কৃতি আমাদের গ্রামীণ সমাজে দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। কিন্তু যখন এই সালিশ বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রতিস্থাপন করে এবং অপরাধীদের রক্ষা করে, তখন তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২,৮০৮ জন নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৭৮৬ জন ধর্ষণের শিকার, যার ৫৪৩ জনই কন্যাশিশু। দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৭৯ জন; ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩১ জনকে। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি জীবন, একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ। একই বছরে ৭৩৯ জন নারী ও কন্যাকে হত্যা করা হয়েছে। ২৩০ জনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। এই চিত্র আমাদের বলে দেয়- নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।

ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বিচারহীনতা। মামলার দীর্ঘসূত্রতা, প্রমাণ সংগ্রহে গাফিলতি, সাক্ষী সুরক্ষার অভাব, সামাজিক কলঙ্কের ভয় সব মিলিয়ে ভুক্তভোগী পরিবার অনেক সময়ই আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয়ধারীরা সালিশের নামে আপসের চাপ সৃষ্টি করেন। এতে অপরাধীরা বার্তা পায়, ক্ষমতা থাকলে শাস্তি এড়ানো সম্ভব। এই সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে কেবল আইন প্রণয়ন যথেষ্ট হবে না।

আমরা দেখছি, রাজনৈতিক দলগুলো অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয়। এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে, কিন্তু দলীয় বহিষ্কার কখনোই ফৌজদারি অপরাধের বিকল্প বিচার নয়। আইন তার নিজস্ব গতিতে, নিরপেক্ষভাবে চলতে হবে। তদন্তে কোনো প্রভাব, রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপ, কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নিশ্চিত করা যে ভুক্তভোগী পরিবার নিরাপত্তা পাবে, সাক্ষীরা সুরক্ষা পাবে, এবং বিচার দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হবে।

নরসিংদীর এই কিশোরীর পরিবার যেন দ্বিতীয়বার ভিকটিমাইজেশনের শিকার না হয়; এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। আমরা যদি এই ঘটনার পরও কেবল ক্ষোভ প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকি, তবে ভবিষ্যতে আরও এমন সংবাদ আমাদের সামনে আসবে। কিন্তু যদি আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে পারি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত নিশ্চিত করতে পারি, এবং নারী-শিশুর নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দিই তবে এই নির্মম মৃত্যুর ভেতর থেকেও পরিবর্তনের শক্তি জন্ম নিতে পারে।

ধর্ষণকে অনেক সময় ‘নৈতিক অবক্ষয়’ বা ‘ব্যক্তিগত বিকৃতি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু এটি মূলত ক্ষমতার অপব্যবহার। নারীদেহকে নিয়ন্ত্রণের বস্তু হিসেবে দেখার যে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, তা পরিবার, শিক্ষা ও সমাজের নানা স্তরে পুনরুৎপাদিত হয়। যখন কোনো কিশোরী বিচার চাইতে গিয়ে হুমকির মুখে পড়ে, তখন আমরা বুঝতে পারি, সমস্যাটি কেবল অপরাধীর নয়; এটি সামাজিক কাঠামোর গভীরে প্রোথিত।

এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি বিষয় জরুরি। প্রথমত, থানায় অভিযোগ গ্রহণে কোনো প্রকার অনীহা বা বিলম্ব বরদাস্ত করা যাবে না। পুলিশকে জেন্ডার-সংবেদনশীল প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং প্রতিটি থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত ডেস্ক কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ধর্ষণ মামলার তদন্ত ও বিচার নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের জন্য কার্যকর সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করতে হবে। চতুর্থত, স্থানীয় সালিশ ব্যবস্থাকে আইনের পরিপন্থি আপসের হাতিয়ার হতে দেওয়া যাবে না; বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ বিষয়ে কড়া নজরদারি করতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় জেন্ডার সমতা, সম্মতি ও মানবাধিকারের বিষয়গুলো বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। পরিবার ও সমাজে কন্যাশিশুকে দায় বা বোঝা হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে। গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে; সংবেদনশীলতা বজায় রেখে রিপোর্ট করা, ভুক্তভোগীর পরিচয় রক্ষা করা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর নজর রাখা।

মানবাধিকার কর্মী হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, ন্যায়বিচার কেবল আদালতের রায়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি প্রক্রিয়া, যা শুরু হয় অভিযোগ গ্রহণের মুহূর্ত থেকে এবং শেষ হয় পুনর্বাসন ও সামাজিক স্বীকৃতিতে। নরসিংদীর এই কিশোরীর পরিবার যেন দ্বিতীয়বার ভিকটিমাইজেশনের শিকার না হয়; এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। আমরা যদি এই ঘটনার পরও কেবল ক্ষোভ প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকি, তবে ভবিষ্যতে আরও এমন সংবাদ আমাদের সামনে আসবে। কিন্তু যদি আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে পারি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত নিশ্চিত করতে পারি, এবং নারী-শিশুর নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দিই তবে এই নির্মম মৃত্যুর ভেতর থেকেও পরিবর্তনের শক্তি জন্ম নিতে পারে।

আজ প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট বার্তা: ধর্ষণ, অপহরণ ও হত্যার মতো অপরাধে কোনো আপস নয়, কোনো সামাজিক সালিশ নয়, কোনো রাজনৈতিক ছত্রছায়া নয়। আইন সবার জন্য সমান- এই নীতি বাস্তবে প্রমাণ করতে হবে। কেবল তখনই আমরা বলতে পারব, আরেকটি কিশোরীর জীবন আমাদের উদাসীনতার কাছে হারিয়ে যাবে না।

লেখক : ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েট এন্ড কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ (বাংলাদেশ), আইএসএইচআর।

এইচআর/জেআইএম