ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

৬৫০ টাকায় গরুর মাংস : দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিকে স্বস্তির হাওয়া

মো. সামছুল আলম | প্রকাশিত: ১০:২০ এএম, ১০ মার্চ ২০২৬

বর্তমান বিশ্বের যুদ্ধাবস্থা, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, সিন্ডিকেট বা অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি, দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা এবং পরিবহন খরচের কারণে বাংলাদেশে বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিশেষকরে প্রাণিজ প্রোটিন—যেমন- মাংস, ডিম, দুধ ও মাছের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে অসহনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে, যা জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে। প্রায়শ দেখা যায়, রমজান বা ঈদুল ফিতরের আগে নিত্য পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট অবৈধ উপায়ে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করে। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্যপণ্যের পেছনে ব্যয় হওয়ায় তারা সঞ্চয় করতে পারে না, এমনকি পুষ্টিকর খাবার কেনাও কমিয়ে দেয়।

অন্যান্য বছরের ন্যায় এবারও রমজান মাসে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট অবৈধ উপায়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়েছে বলে ভোক্তাদের অভিযোগ রয়েছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, শাকসবজি, ডিম, দুধ ও ব্রয়লার মুরগিসহ বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ইফতার ও সাহরির প্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষ, বিশেষকরে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের পুষ্টি চাহিদাপূরণ এবং সকলের জন্য প্রাণিজ আমিষের বাজার সহনশীল রাখতে সারাদেশে পবিত্র রমজান মাসে সুলভ মূল্যে প্রাণিজ আমিষ সরবরাহের লক্ষ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশক্রমে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর গত ৪ বছর ধরে ভ্রাম্যমাণ বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

এই কার্যক্রমের অংশ হিসাবে এবারও ডেইরি ও পোল্ট্রি উৎপাদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং অ্যাসোসিয়েশনের সহযোগিতায় রমজান মাসে ঢাকা শহরে ২৫টি স্থানে দুধ, ডিম ও মাংসের ভ্রাম্যমাণ বিপণন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, এমপি বলেন, নির্বাচনে বিএনপি রাষ্ট্র মেরামতের যে ৩১ দফার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে- পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়ন করা হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড এবং স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা ও খাদ্য নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়গুলোকে সরকার বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

এছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে অসহায় হতদরিদ্র মানুষগুলোর জীবন-মান উন্নয়নে সরকার সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিবে। অসহায় মানুষগুলো যাতে সুলভ মূল্যে দুধ ডিম ও মাংস নিতে পারে এবং রমজানে প্রোটিনের বাজার যাতে নিয়ন্ত্রণে থাকে সেজন্যই প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এ উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে পর্যায়ক্রমে সব জেলাতেই দুধ ডিম ও মাংস বিক্রির এ উদ্যোগটি নেয়া হবে। যাতে মানুষ তার খাদ্যের তালিকায় যে প্রোটিনের প্রয়োজন সে প্রোটিনের অভাব পূরণ করতে পারে। এ বিষয়ে সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করছে।

বর্তমান সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী এবার পবিত্র রমজানে প্রাণিজ পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখা ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতকরণে ঢাকা শহরসহ অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা শহরে নিম্ন আয়ের মানুষকে স্বস্তি প্রদানের লক্ষ্যে রমজানের আগের দিন হতে ২৫ রমজান পর্যন্ত মোট ২৬ দিন ব্রয়লার, দুধ, ডিম ও গরুর মাংস সুলভ মূল্যে ভ্রাম্যমাণ বিক্রয় কেন্দ্রে বিক্রয় করা হচ্ছে। এ বছর ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় নির্ধারিত সুলভ মূল্য তালিকা: ক) প্রতি কেজি ড্রেসড ব্রয়লারের মাংস ২৪৫ টাকা; খ) পাস্তুরিত দুধ প্রতি লিটার ৮০ টাকা; গ) ডিম প্রতি ডজন - ৯৬ টাকা এবং ঘ) গরুর মাংস প্রতি কেজি ৬৫০ টাকা। এছাড়া বিভাগীয় পরিচালক ও জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা অন্যান্য বিভাগীয় শহরে জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে সুলভ মূল্যে দুধ, ডিম, মাংস ও ব্রয়লার ভ্রাম্যমাণ বিপণনের উদ্যোগ গ্রহণ করছে। স্থানীয় বাজার মূল্যের সাথে সমন্বয়পূর্বক সুলভ মূল্যের দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এ মহৎ উদ্যোগ প্রান্তিক পর্যায়ে বছরব্যাপী চলমান থাকলে, বছরজুড়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ সুলভ মূল্যে প্রাণিজ আমিষ গ্রহণ করতে পারবে। এতে করে একদিকে মানুষ পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টি গ্রহণের সুযোগ পাবে, অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতিজনিত ভীতি কাটিয়ে মানুষ স্বস্তির বাতাস পাবে।

ভ্রাম্যমাণ এই বিক্রয় কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্মসচিবকে আহ্বায়ক করে ১) কেন্দ্রীয় বাস্তবায়ন কমিটি ২) পশু জবাই ও মাংসের মান যাচাই কমিটি ৩) বিক্রয়কেন্দ্র স্থান নির্ধারণ, পল সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও মান নিয়ন্ত্রণ কমিটি ৪) বিক্রয় কেন্দ্র পরিচালনা বাস্তবায়ন কমিটি এবং ৫) বিক্রয়কেন্দ্র মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্যদিকে এ কার্যক্রমে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প (এলডিডিপি) নির্ধারিত ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কেন্দ্রে জনবল সরবরাহ ও কুলভ্যানস অন্যান্য লজিস্টিক সরবরাহ পূর্বক বিক্রয় কেন্দ্র পরিচালনা করছে। পরিচালক (সম্প্রসারণ), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর প্রতিদিন মাংস, দুধ, ডিম বিক্রয়ের তথ্যাদি সংকলিত করছেন।

এবার ঢাকা ও সিটি কর্পোরেশনে প্রস্তাবিত যে ২৬ টি স্থানে এ কার্যক্রম চলছে তা হলো: ১। সচিবালয়ের পাশে (আব্দুল গনি রোড), ২। খামারবাড়ি (ফার্মগেট), ৩। যাটফুট রোড (মিরপুর), ৪। আজিমপুর মাতৃসদন (আজিমপুর), ৫। নয়াবাজার (পুরান ঢাকা), ৬। উত্তরা হাউজ বিল্ডিং, ৭। রামপুরা বাজার, ৮। হাজারীবাগ (শিকশন), ৯। আরামবাগ (মতিঝিল), ১০। কালশী (মিরপুর), ১১। যাত্রাবাড়ী (মানিক নগর গলির মুখ), ১২। শাহজাদপুর (বাচ্চা), ১৩। কড়াইল বস্তি, বনানী, ১৪। কামরাঙ্গীর চর, ১৫। খিলগাঁও (রেল ক্রসিং দক্ষিণে), ১৬। নাখাল পাড়া (লুকাস মোড়), ১৭। সেগুন বাগিচা (কাঁচা বাজার), ১৮। মোহাম্মদপুর (বাবর রোড), ১৯। মোহাম্মদপুর (বসিলা), ২০। কাকরাইল, ২১। বনশ্রী, ২২। মিরপুর ১০, ২৩। কল্যাণপুর, ২৪। তেজগাঁও এবং ২৫। পুরান ঢাকা (বঙ্গবাজার) ২৬। কড়াইল বস্তি।

উল্লেখ্য, ভ্রাম্যমাণ বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে গত বছর (২০২৫ সালে) ২৮ রমজান পর্যন্ত সারাদেশের ৮ বিভাগে সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতায় ৫৯ লক্ষ ৪৮ হাজার ২৩১ টি ডিম, ৪ লক্ষ ১৯ হাজার ৫২৬ লিটার দুধ, ৬০৭ টন ১৭২ কেজি ড্রেসড ব্রয়লার, ২২৬ টন ৫৯৭ কেজি গরুর মাংস এবং খাসির মাংস ১১ টন ৪৪২ কেজি বিক্রয় করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে সারাদেশের ৬,০৮,৬৭৪ জন পুরুষ এবং ৩,৪৩,৩৪১ জন মহিলাসহ মোট ৯,৫১,০১৫ জন উপকারভোগীর মধ্যে সুলভমূল্যে পণ্য বিতরণ করা হয়। ফলশ্রুতিতে সারাদেশে মাংস, ডিম, দুধ ইত্যাদির সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় ছিল।

অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ; আমদানিকারক ও খামারিদের জন্য সহজলভ্য ঋণ ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা; সরকার কর্তৃক ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির পরিধি বাড়ানো; স্মার্ট বাজার ব্যবস্থাপনা এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতি রোধে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। বিশেষ করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এ মহৎ উদ্যোগ প্রান্তিক পর্যায়ে বছরব্যাপী চলমান থাকলে, বছরজুড়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ সুলভ মূল্যে প্রাণিজ আমিষ গ্রহণ করতে পারবে। এতে করে একদিকে মানুষ পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টি গ্রহণের সুযোগ পাবে, অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতিজনিত ভীতি কাটিয়ে মানুষ স্বস্তির বাতাস পাবে।

লেখক : গণযোগাযোগ কর্মকর্তা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

এইচআর/জেআইএম