ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্পের গলার কাঁটা, নাকি নাভিশ্বাস?

মহসীন হাবিব | প্রকাশিত: ১০:১৬ এএম, ৩১ মার্চ ২০২৬

না, যুদ্ধটা যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা মাফিক শেষ হলো না। যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা ছিল, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশ মিলে ইরানে ব্যাপক বোমা হামলা চালালে এবং এর শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা গেলে ইরান সরকারের মনোবল ভেঙে যাবে এবং ইরানের অভ্যন্তরে যারা সরকার বিরোধী আছে, তাদের দিয়ে রেজিম চেঞ্জ করে ফেলবে। সেকথা পরিষ্কারভাবেই বলেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তারও আগে বলেছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। এরকম হলে যুক্তরাষ্ট্রের দুটো লক্ষ্য পূরণ হতো।

প্রথমত, ইরানে বসিয়ে দেওয়া নতুন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুতে পরিণত হতো এবং ইরানের বিপুল তেলের বাণিজ্য যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে আসতো, অন্যদিকে ইসরায়েল পরিপূর্ণভাবে নিরাপদ রাষ্ট্রে পরিণত হতো, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে আর উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু থাকতো না। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলি ইসরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করে নিয়েছে। এমনকি অনেকগুলো দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কও তৈরি হয়েছে। কিন্তু ইরান, হিজবুল্লাহ এবং হুতি মিলিশিয়ারা ইসরায়েলকে মেনে নেয়নি। 

দ্বিতীয়ত, ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী যুদ্ধ এক সপ্তাহের মধ্যে শেষ করা গেলে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বব্যাপী আরো বেশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব সুদৃঢ় হতো। তারা অদ্বিতীয় শক্তি হিসাবে বিশ্বব্যাপী অস্ত্র বিক্রি, ডলারের একক আধিপত্য টিকিয়ে রাখবে পারতো। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, হাজার হাজার বোমা ফেলেও ইরানকে নিষ্ক্রিয় করা যায়নি চার সপ্তাহ পরেও। যুদ্ধের ৩০তম দিনেও ইরান ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছে। এবং ইরানের উপকূল বয়ে যাওয়া হরমুজ প্রণালীকে ইরানের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা যায়নি।

এই লেখায় কোনো ধারাবাহিক আলোচনা পাওয়া যাবে না। কারণ, যুদ্ধে ফোড়ার মুখের মত এত মুখ বের হয়েছে যা একটি একটি করে আলোচনা করা দরকার। এ যুদ্ধের বহু রকম দিক রয়েছে যা একটির সঙ্গে আরেকটিকে মেলানো যায় না।

সামরিক শক্তির কথাই বলি। খালি চোখে দেখলে মনে হবে, ইরান এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ যুদ্ধে পরাজয়ের মুখে। ইরানের আকাশ মুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল। যদিও ইরানের এয়ারপাওয়ার বলতে বিশেষ কিছুই ছিল না। ইরান সামরিক কৌশল হিসাবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নির্ভর হয়ে উঠেছে। ফলে ইচ্ছামতো আকাশপথে ইরানের হাজার হাজার স্থাপনা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ধ্বংস করে দিয়েছে। ইরানের প্রথম সারির প্রায় সব শীর্ষ নেতাকে বিমান হামলা চালিয়ে হত্যা করেছে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন হিসাব। অক্ষত নেই যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল অথবা তাদের ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলো। 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা বারবার বলছেন, এ যুদ্ধে আমরা জিতে গেছি। ইরান আমাদের কাছে ভিক্ষা মাঙ্গছে যুদ্ধ বিরতির জন্য- ইত্যাদি। অথচ কয়েক সপ্তাহ পার করেও যখন ইরানের আঘাত সইতে হচ্ছে, তখন ট্রাম্প, তার বিদেশ মন্ত্রী রবিও এবং যুদ্ধমন্ত্রী হেগসেথের বক্তব্য বিবৃতিকে হাস্যকর বলে মনে করছে খোদ পশ্চিমা বিশ্লেষকরাই। 

এ যুদ্ধকে ইরান দীর্ঘায়িত করে দিয়েছে। ইরান ইসলামিক রিপাবলিকান গার্ডকে বিশাল আয়তনের দেশটিতে ছড়িয়ে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় কমান্ড ভেঙে প্রতিটি অঞ্চলের কমান্ডারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নিজেদের মত সিদ্ধান্ত নিতে। অর্থাৎ একক কোনো ব্যক্তির হাতে ইরানের ক্ষমতা নেই, যাকে হত্যা করলেই সবকিছু শেষ হয়ে যাবে।

যুদ্ধ গোটা বিশ্বকেই এক জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন করেছে। কবে শেষ হবে তা বোঝা যাচ্ছে না। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যে নেতারা বসেছিলেন তা খুব ফলপ্রসূ হয়নি। একদিকে আলোচনার কথা বলে অন্যদিকে আমেরিকা কয়েক হাজার সেনা নামাতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা অচিরে খার্গ আইল্যান্ড দখল করে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে আজও যদি এ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে তাহলেও বিশ্বব্যাপী যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষত কাটিয়ে উঠতে কয়েক বছর লেগে যাবে। কিন্তু যুদ্ধটা কোথায় গিয়ে থামবে তা বলা খুবই কঠিন।

অন্যদিকে ইরান এ পর্যন্ত ড্রোন, মিসাইল হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যে ক্ষতি করেছে তা অবিশ্বাস্য। ইরান প্রযুক্তিগতভাবে বেশ কয়েক বছর ধরেই আধুনিক হয়ে উঠেছে। মনে আছে ২০১৯ সালে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ১১০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি অত্যাধুনিক আরকিউ-৪ এ ড্রোনকে প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাটিতে নামিয়ে ফেলেছিল। তখনই যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞরা ইরান যে সক্ষম হয়ে উঠেছে তা জানিয়ে দিয়েছিল। এখন এই যুদ্ধের সময় ইরানের সব ধরনের ইন্টারসেপ্টর ভেদ করে উপসাগরীয় দেশগুলিতে এবং ইসরায়েলে আঘাত হানা বিষয়ে পশ্চিমা প্রচারমাধ্যম ও যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্বশীলরা পর্যন্ত বলছেন, ইরানকে রাশিয়া প্রযুক্তি সহায়তা দিচ্ছে।

ইসরায়েলে যেহেতু মিডিয়া ব্লাকআউট চলছে তাই সঠিক ক্ষয়ক্ষতির সংবাদ জানা যায় না। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার কোনো কোনো সূত্র বলছে ইসরায়েলের ৫ শতাধিক সেনা নিহত হয়েছে এবং তেলআবিব, হাইফা, বুশেহেরসহ বিভিন্ন শহরে ব্যাপক ধ্বংস হয়েছে। গত বছর যখন ইরানের যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল হামলা চালায় তখন ইরান সাইবার সহায়তার জন্য ব্যবহার করতো জিপিএস। কিন্তু সেই সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের পর ইরান মার খেয়ে বুঝতে পেরেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস তাদের কোনো সহায়তা করবে না। তারা চিনের বেদু-৩ ব্যবহার করতে শুরু করে। এই বেদু-৩ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইরান সুনির্দিষ্ট স্থানে হামলা করতে সক্ষম হয়ে উঠেছে।

ইরানের হামলাকে এখন আর খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের। যুক্তরাষ্ট্রের অপরাজেয় নৌবহর এয়ারক্রাফট কেরিয়ার কয়েকটি ডেস্ট্রয়ারসহ সুয়েজ চ্যানেল পার হয়ে গ্রিসের বন্দরে রয়েছে ‘মেরামতের’ জন্য। সত্য ঘটনা আমরা জানি না। লোকে বলে ইরান সফলভাবে প্রায় দুর্ভেদ্য কেরিয়ারে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতি করেছে। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনও আরব সাগরে দূরে অবস্থান নিয়েছে। গত কয়েক তিন সপ্তাহে কুয়েতে তিনটি এফ-১৫-ই, একটি এফ-৩৫ এবং অন্তত ৫টি জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ড্যামেজ হয়েছে, যার মূল্য বিলিয়ন ডলারের উপরে। সামরিক হিসাবে জানা গেছে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ২০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে।      

যুদ্ধের নতুন মাত্রা হল, হুতিরা ২৮ মার্চ ইসরায়েলে সফলভাবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলে। যেহেতু ইসরায়েলে মিডিয়া ব্লাকআউট চলছে, সেহেতু ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বোঝা যাচ্ছে না। তার মানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে আরো একটি ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে হবে। তবে এটা পরিষ্কার যে হুতিরা একটু সময় নিয়ে এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল। হয়তো এটা কোনো ইরানি কৌশলের অংশ। শুধু ইসরায়েলে আক্রমণই নয়, ইয়েমেনের হুতিরা তাদের উপকূলের লোহিত সাগর বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এই লোহিত সাগর সুয়েজ ক্যানেলের সঙ্গে সংযুক্ত। বিশ্বের ৮ শতাংশ তেল ও পণ্য এই চ্যানেল দিয়ে পারাপার হয়। বাব আল মানদাব প্রণালী বন্ধ হলে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অবস্থা আরো ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে লেবাননের হিজবুল্লাহরা জড়িয়ে পড়েছে আগেই।

এত গেল যুদ্ধের দৈহিক চেহারা। কিন্তু বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের যে অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে তা আরো ভয়াবহ। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের সষ্টি হয়েছে ইউরোপ এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। জ্বালানি সংকট, পণ্য সংকট বিভিন্ন রীতিমতো দুর্ভিক্ষের আকার ধারণ করেছে। ওদিকে খোদ যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিন মূল্য প্রতি গ্যালন ১ ডলার থেকে ৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে।

রাজনৈতিক দিক দিয়েও চলছে নানা টানাপোড়েন। এ যুদ্ধে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষাভাবে জড়িয়ে পড়েছে ইরাক, ইউক্রেনসহ অনেক দেশ। তবে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইনসহ উপসাগরীয় দেশগুলো। যদিও অভিযোগ আছে, তাদের বেশিরভাগ দেশই যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের পক্ষে, কিন্তু সরাসরি কোনো দেশ ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণে অংশগ্রহণ নেমে পড়েনি। কিন্তু ইরান থেকে ইসরায়েলের দিকে নিক্ষেপ করা বহু মিসাইল ও ড্রোন তারা পথিমধ্যে ইন্টারসেপ্ট করেছে, যা এক রকম যুদ্ধে অংশগ্রহণের শামিল।

অন্যদিকে ইউরোপের সঙ্গেও এ যুদ্ধ নিয়ে টানাপড়েন শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের টেনে আনা যুদ্ধে ইউরোপ সরাসরি অংশগ্রহণ করতে চাচ্ছে না। বিষয়টি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নাখোশ করেছে।

এ যুদ্ধ গোটা বিশ্বকেই এক জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন করেছে। কবে শেষ হবে তা বোঝা যাচ্ছে না। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যে নেতারা বসেছিলেন তা খুব ফলপ্রসূ হয়নি। একদিকে আলোচনার কথা বলে অন্যদিকে আমেরিকা কয়েক হাজার সেনা নামাতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা অচিরে খার্গ আইল্যান্ড দখল করে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে আজও যদি এ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে তাহলেও বিশ্বব্যাপী যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষত কাটিয়ে উঠতে কয়েক বছর লেগে যাবে। কিন্তু যুদ্ধটা কোথায় গিয়ে থামবে তা বলা খুবই কঠিন।

 লেখক : সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।

এইচআর/জেআইএম