ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য: শহর ও গ্রামের ব্যবধান কেন বাড়ছে?

ড. হারুন রশীদ | প্রকাশিত: ১০:১০ এএম, ০৭ এপ্রিল ২০২৬

রাকিব কুড়িগ্রামের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের নবম শ্রেণির ছাত্র। তার স্কুলে কোনো বিজ্ঞানাগার নেই, লাইব্রেরি বলতে কয়েকটি পুরোনো বই। বর্ষাকালে স্কুলে যেতে হলে তাকে কাদা আর পানির মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেতে হয়। শিক্ষক সংখ্যা কম থাকায় অনেক সময় ক্লাস হয় না। বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকলেও তা নিয়মিত নয়, আর স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটের সুযোগ তার নেই। পড়াশোনার পাশাপাশি তাকে পরিবারের আর্থিক সহায়তার জন্য কাজ করতে হয়। সে ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়, কিন্তু তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ অনিশ্চয়তায় ভরা।

অন্যদিকে ঢাকার একটি স্বনামধন্য ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছাত্র আরিয়ান সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতায় বেড়ে উঠছে। তার স্কুলে রয়েছে স্মার্ট ক্লাসরুম, আধুনিক ল্যাব, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষক। সে নিয়মিত অনলাইন কোর্স করে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে পরিকল্পনা করতে পারে। তার পরিবার তাকে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করে, ফলে সে পড়াশোনায় পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে।

এই দুই শিক্ষার্থীর মধ্যে পার্থক্য শুধু সুযোগ-সুবিধার নয়; এটি একটি কাঠামোগত বৈষম্যের প্রতিফলন। একজন যেখানে মৌলিক শিক্ষার জন্য সংগ্রাম করছে, অন্যজন সেখানে উন্নত সুযোগের মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে।

শিক্ষা ব্যবস্থায় শহর ও গ্রামের বৈষম্য একটি গভীর জাতীয় সংকট, যা কেবল শিক্ষার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতার প্রশ্ন। একটি দেশ তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হতে পারে, যখন তার প্রতিটি শিশু সমান সুযোগ পায়। আজকের এই বৈষম্য যদি আমরা কমাতে না পারি, তাহলে ভবিষ্যতে একটি বিভক্ত সমাজ গড়ে উঠবে—যেখানে একদল মানুষ সব সুযোগ পাবে, আর আরেকদল পিছিয়ে থাকবে। তাই এখনই সময় বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার, যাতে শহর ও গ্রামের এই ব্যবধান কমিয়ে একটি সমতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়।

নীতিগত সীমাবদ্ধতাও এই ব্যবধান বৃদ্ধির একটি বড় কারণ। শিক্ষানীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে অনেক সময় গ্রামীণ বাস্তবতা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। বাজেট বরাদ্দ ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে শহরকেন্দ্রিক প্রবণতা দেখা যায়। ফলে গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত থাকে। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবও একটি বড় সমস্যা।

দুই.
বাংলাদেশে শিক্ষা খাতকে দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্বাধীনতার পর থেকে সরকার প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, উপবৃত্তি প্রদান এবং নারী শিক্ষার প্রসারে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এসব উদ্যোগ দেশের সামগ্রিক সাক্ষরতার হার বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির মাঝেও একটি গভীর ও ক্রমবর্ধমান সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠছে—শহর ও গ্রামের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে। এই বৈষম্য শুধু শিক্ষার মান বা সুযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে।

শহরের একটি আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা যে সুযোগ-সুবিধা পায়, তা গ্রামীণ এলাকার অনেক শিক্ষার্থীর কাছে কল্পনাতীত। উন্নত অবকাঠামো, ডিজিটাল ক্লাসরুম, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, সহশিক্ষা কার্যক্রম—সব মিলিয়ে শহরের শিক্ষার্থীরা একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে বেড়ে ওঠে। অন্যদিকে, গ্রামের অনেক বিদ্যালয়ে এখনও মৌলিক সুবিধার অভাব রয়েছে। এই বৈষম্য একটি দ্বৈত শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে একই দেশের শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতায় বড় হচ্ছে।

শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য: শহর ও গ্রামের ব্যবধান কেন বাড়ছে?

অবকাঠামোগত দুর্বলতা এই বৈষম্যের অন্যতম প্রধান কারণ। দেশের অনেক গ্রামীণ বিদ্যালয় এখনও জরাজীর্ণ ভবনে পরিচালিত হয়। বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার কারণে অনেক স্কুলে যাতায়াত ব্যাহত হয়, এমনকি অনেক সময় ক্লাস বন্ধ রাখতে হয়। অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই, বেঞ্চ-ডেস্কের সংকট রয়েছে, নিরাপদ পানীয় জল ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের অভাবও প্রকট। এসব কারণে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি ব্যাহত হয় এবং তাদের শেখার আগ্রহ কমে যায়। শহরের শিক্ষার্থীরা যেখানে আরামদায়ক ও নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করে, সেখানে গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা অনেক সময়ই সংগ্রামের সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়।

শিক্ষক সংকট ও মানগত পার্থক্য এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। শহরের স্কুলগুলোতে তুলনামূলকভাবে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকরা কাজ করতে আগ্রহী হন, কারণ সেখানে পেশাগত উন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধা বেশি। কিন্তু গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষকরা নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন—যাতায়াত সমস্যা, প্রশিক্ষণের অভাব, পর্যাপ্ত প্রণোদনার অভাব ইত্যাদি। অনেক ক্ষেত্রে একটি শিক্ষককে একাধিক বিষয় পড়াতে হয়, যা শিক্ষার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে শিক্ষার্থীরা মৌলিক ধারণাগুলো যথাযথভাবে আয়ত্ত করতে পারে না এবং উচ্চশিক্ষায় গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হয়।

প্রযুক্তিগত বৈষম্য বর্তমান সময়ে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার ঘটলেও শহর ও গ্রামের মধ্যে ডিজিটাল বিভাজন স্পষ্ট। শহরের শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেট, অনলাইন ক্লাস, ইউটিউব লেকচার এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক অ্যাপের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে পারছে। অন্যদিকে গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী এখনও স্মার্টফোন বা নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত। করোনাকালে এই বৈষম্য আরও প্রকট হয়ে ওঠে, যখন শহরের শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারলেও গ্রামের একটি বড় অংশ কার্যত শিক্ষার বাইরে থেকে যায়।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এই বৈষম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। গ্রামীণ পরিবারের অনেকেই দারিদ্র্যের কারণে তাদের সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় বহন করতে হিমশিম খায়। ফলে অনেক শিশু অল্প বয়সেই শ্রমে যুক্ত হয়। বিশেষ করে ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষাজীবন অসমাপ্ত রেখেই ঝরে পড়ে।

তিন.
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। প্রথমত, গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গ্রামে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা চালু করতে হবে, যাতে তারা সেখানে কাজ করতে আগ্রহী হন। তৃতীয়ত, ডিজিটাল বৈষম্য দূর করতে গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের জন্য সহজলভ্য ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। চতুর্থত, দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কার্যকর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

শিক্ষা ব্যবস্থায় শহর ও গ্রামের বৈষম্য একটি গভীর জাতীয় সংকট, যা কেবল শিক্ষার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতার প্রশ্ন। একটি দেশ তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হতে পারে, যখন তার প্রতিটি শিশু সমান সুযোগ পায়।

আজকের এই বৈষম্য যদি আমরা কমাতে না পারি, তাহলে ভবিষ্যতে একটি বিভক্ত সমাজ গড়ে উঠবে—যেখানে একদল মানুষ সব সুযোগ পাবে, আর আরেকদল পিছিয়ে থাকবে। তাই এখনই সময় বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার, যাতে শহর ও গ্রামের এই ব্যবধান কমিয়ে একটি সমতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]

এইচআর/এএসএম

আরও পড়ুন