ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের নীরবতা ও দ্বিমুখী বিশ্বরাজনীতি

ফারুক যোশী | প্রকাশিত: ০৬:২৮ পিএম, ০৮ এপ্রিল ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই আমাদের সামনে এক জটিল বাস্তবতা উন্মোচিত হয়— যেখানে ক্ষমতা, ধর্ম, অর্থনীতি এবং সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ এক অদ্ভুত জটিল জালে আবদ্ধ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ, প্রার্থনার আবেগ, আন্তর্জাতিক নীরবতা এবং কৌশলগত শক্তির প্রদর্শন— সব মিলিয়ে আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছে এক গভীর প্রশ্ন: এই বিশ্ব কি সত্যিই শান্তি চায়?

একথাতো অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, মধ্যপ্রাচ্যের বহু রাষ্ট্রে ধর্মীয় শাসনের বাতাবরণে যুগ যুগ ধরে চলমান গণতন্ত্রহীনতা দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। ইরান–এর রাজনৈতিক কাঠামোও দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর ধর্মীয় শাসনের ছায়ায় পরিচালিত। নাগরিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা নারীর স্বাধীনতা— এসব প্রশ্ন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বারবার আলোচনা হয়েছে। কিন্তু একইভাবে প্রশ্ন উঠতে পারে, শুধুই কি ইরান? বাস্তবে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলেই রাজতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের ছাপ স্পষ্ট। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং কুয়েত— সব জায়গাতেই রাজনৈতিক কাঠামো জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের বাইরে নির্মিত।

এই বাস্তবতায় আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো আন্তর্জাতিক শক্তির ভূমিকা। বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্ব এই অঞ্চলের কর্তৃত্ববাদী শাসন নিয়ে খুব কমই উচ্চকণ্ঠ হয়। বরং বাস্তবতা হলো— তেল, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বিনিময়ে এই শাসনগুলো টিকে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে সামরিক ঘাঁটি, অস্ত্র ব্যবসা এবং যুদ্ধের আতঙ্ক— সব মিলিয়ে এক ধরনের স্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ যেন এখানে শুধু সংঘাত নয়, বরং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত এক শিল্পে পরিণত হয়েছে।

এই দ্বিমুখী নীতির সবচেয়ে নির্মম প্রতিফলন দেখা যায় গাজা সংকটে। গাজা–এর মানুষ বছরের পর বছর ধরে অবরোধ, হামলা এবং মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। বিশ্বজুড়ে মানুষ রাস্তায় নেমে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন করেছে। লন্ডন, নিউইয়র্ক, প্যারিস— সব জায়গায় সাধারণ মানুষ শান্তির দাবি তুলেছে। কিন্তু রাষ্ট্রগুলো? তাদের কণ্ঠস্বর ছিল অনেকটাই নিস্তব্ধ।

যুক্তরাজ্য–এর মসজিদগুলোতে দেখা গেছে এক অদ্ভুত দৃশ্য— গাজার জন্য কান্না আছে, প্রার্থনা আছে; কিন্তু বৃহত্তর যুদ্ধ থামানোর জন্য ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক এমনকি সামাজিক অবস্থান নেই। এই আবেগময় প্রতিক্রিয়া বাস্তব রাজনীতিকে খুব কমই প্রভাবিত করেছে। একই সময়ে ইসরাইল–এর সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক সমর্থনের ছায়ায় অব্যাহত থেকেছে। মানবাধিকার প্রশ্নে উচ্চকণ্ঠ বিশ্বশক্তিগুলো এখানে যেন কৌশলগত নীরবতা বেছে নিয়েছে।

আরও হতাশাজনক বিষয় হলো মুসলিম বিশ্বের প্রতিক্রিয়া। গাজার প্রতি সহানুভূতি থাকলেও বাস্তব পদক্ষেপ প্রায় অনুপস্থিত। রাজনৈতিক সমর্থন, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কিংবা যুদ্ধ বন্ধের জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগ— কোনোটাই প্রত্যাশিত মাত্রায় দেখা যায়নি। শিয়া–সুন্নি বিভাজন, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ক্ষমতার রাজনীতি মানবিক সংকটকে ছাপিয়ে গেছে।

অন্যদিকে, যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের নানা দেশে লাখো মানুষ যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। এটি প্রমাণ করে— রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে জনগণের মানবিক অবস্থান সবসময় এক নয়। যুদ্ধের রাজনীতি রাষ্ট্র চালায়, কিন্তু যুদ্ধের ক্ষত বহন করে মানুষ।

আজকের পৃথিবীকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যুদ্ধবিরতি নয়— যুদ্ধের সমাপ্তি। যুদ্ধবিরতি সাময়িক স্বস্তি দেয়, কিন্তু স্থায়ী শান্তি এনে দিতে পারে না। স্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, দ্বিমুখী নীতির অবসান এবং মানবিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। যুদ্ধের রাজনীতি আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো— শান্তি কখনোই নিজে থেকে আসে না; তাকে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। আর সেই দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয়, মানুষেরও। যখন বিশ্বজুড়ে মানুষ একসঙ্গে শান্তির দাবি তুলবে, তখনই হয়তো যুদ্ধের ভাষা বদলাতে শুরু করবে।

যুদ্ধের আরেকটি নির্মম সত্য হলো— এটি শক্তির প্রদর্শন। সামরিক সক্ষমতা, কৌশলগত অবস্থান এবং প্রযুক্তিগত আধিপত্য— সবকিছু মিলিয়ে যুদ্ধকে এক ধরনের ক্ষমতার ভাষায় রূপান্তর করা হয়েছে। প্রার্থনা, আবেগ কিংবা মানবিক আহ্বান— এসব যুদ্ধের কৌশলগত বাস্তবতাকে খুব কমই বদলাতে পারে। এই বাস্তবতা যতই কঠিন হোক, অস্বীকার করার উপায় নেই। ধর্মীয় আবেগও এখানে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী যুদ্ধের সময় আবেগঘন ভাষণ দিলেও বাস্তবে তাদের অবস্থান প্রায়শই আন্তর্জাতিক শক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। ফলে জনগণের আবেগ এবং রাষ্ট্রের কৌশল— এই দুইয়ের মধ্যে তৈরি হয় গভীর ফাঁক।

এই প্রেক্ষাপটে আমাদের নিজেদের দিকেও তাকাতে হবে। বাংলাদেশ–সহ বিশ্বের বহু দেশে যুদ্ধবিরোধী অবস্থান আবেগের স্তরে সীমাবদ্ধ থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ, প্রার্থনা বা বিবৃতি থাকলেও বাস্তব রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির উদ্যোগ খুব কম দেখা যায়। অথচ শান্তির দাবি শুধু আবেগ দিয়ে নয়— রাজনৈতিক সচেতনতা, কূটনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক সংহতির মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

আজকের পৃথিবীকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যুদ্ধবিরতি নয়— যুদ্ধের সমাপ্তি। যুদ্ধবিরতি সাময়িক স্বস্তি দেয়, কিন্তু স্থায়ী শান্তি এনে দিতে পারে না। স্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, দ্বিমুখী নীতির অবসান এবং মানবিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। যুদ্ধের রাজনীতি আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো— শান্তি কখনোই নিজে থেকে আসে না; তাকে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। আর সেই দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয়, মানুষেরও। যখন বিশ্বজুড়ে মানুষ একসঙ্গে শান্তির দাবি তুলবে, তখনই হয়তো যুদ্ধের ভাষা বদলাতে শুরু করবে।

যুদ্ধবিরতি নয়— যুদ্ধ বন্ধ হোক। পৃথিবী আবার শান্তির ভাষা শিখুক।

লেখক : বৃটেনপ্রবাসী কলামিস্ট।

এইচআর/জেআইএম