ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

কেন হামুদুর কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশে আপত্তি পাকিস্তানের?

ফারাজী আজমল হোসেন | প্রকাশিত: ১২:৪৮ পিএম, ০৭ জুলাই ২০২২

একাত্তরের লজ্জাজনক পরাজয়ের পর সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত করে পাকিস্তানের জুলফিকার আলি ভুট্টো এবং এই পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধানে তৎকালীন দেশটির প্রধান বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে গঠন করা হয় এই কমিশন। পরবর্তীতে এটি হামুদুর রহমান কমিশন নামে পরিচিতি পায়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধানের জন্য এই কমিশনকে দায়িত্ব দেয়া হলেও এর প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান জুড়ে ছিল ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তান সেনা বাহিনীর বিভিন্ন কার্যক্রম ও ভূমিকা। খুব সম্ভবত এ কারণে ২০০ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেয়া শেষে ১৯৭২ সালের ১৫ জুলাই প্রকাশিত হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্টের ১২ কপিই নষ্ট করে দেয়া হয়।

হামুদুর রহমান কমিশনের বাকি দুই সদস্য ছিলেন পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এস আনোয়ারুল হক ও বেলুচিস্তানের প্রধান বিচারপতি তোফায়েল আলী আবদুর রহমান। তিন দশক ধরে হামুদুর কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে গোপনীয়তা রক্ষা করে পাকিস্তান। তবে ২০০০ সালে ভারতীয় ও পাকিস্তানি গণমাধ্যমে রিপোর্টের আংশিক তথ্য প্রকাশিত হয়। ২০০১ সালে ভ্যানগার্ড বুকস গোপন করে রাখা রিপোর্টের একটি কপি প্রকাশ করে। জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি-র সিকিউরিটি স্টাডিজ সেন্টারের অধ্যাপিকা সি ক্রিস্টিন ফেয়ার সম্প্রতি আলোকপাত করেছেন হামুদুর কমিশনের রিপোর্টের ওপর।

ক্রিস্টিনের মতে, ভুট্টোর তদন্তের নির্দেশটাই ছিল একজন ডাকাতের নিজের কৃতকর্ম সম্পর্কে পুলিশকে তদন্ত করতে বলার মতো রহস্যজনক। কারণ হিসেবে তিনি সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতার থেকে দূরে রাখতে পাকিস্তানি সেনাকর্তাদের ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করেছেন।

৩০০ কেন্দ্রের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬২ কেন্দ্রে জিতলেও তাদের সরকার গড়তে দেয়া হয়নি। গ্যারি বাস এবং শ্রীনাথ রাঘবনের বইয়ের উল্লেখ করে পাকিস্তানি সেনার বর্বরতার পাশাপাশি রিপোর্ট থেকে পূর্ব পাকিস্তানে সেনাকর্তাদের ব্যাঙ্ক লুট এবং নানা ধরনের অবৈধ কাজকর্মের উল্লেখ করেছেন ক্রিস্টিনি।

কমিশনের তরফ থেকে কয়েক জন সেনাকর্তার কোর্ট মার্শালের সুপারিশ করা হলেও পাকিস্তান কিছুই করেনি। গণশুনানির সুপারিশও মানেনি পাকিস্তান। ক্রিস্টিনের মতে, ক্ষমতা ধরে রাখতে সেনাবাহিনীকে চটাতে চাননি ভুট্টো থেকে শুরু করে অন্যান্য সামরিক ও অসামরিক রাষ্ট্রপ্রধানরা। কারণ তারা জানতেন, পাকিস্তানে সেনাকে চটিয়ে গদি আগলে রাখা অসম্ভব। তাই কমিশনের রিপোর্টে সেনাকর্তাদের বিরুদ্ধে সবরকম নৈতিক অধঃপতনের উল্লেখ থাকলেও পাকিস্তানি রাষ্ট্রপ্রধানরা ভয়ে সে বিষয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করেননি বলে তিনি মনে করেন।

হামুদুর কমিশনের রিপোর্টে উঠে আসে পাকিস্তানী সেনাদের অত্যাচার, নির্যাতন, লুটপাট, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন, বিনা বিচারে বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের আটক এবং হত্যার বহু ঘটনা। নিয়াজি ও তার অধীনস্ত অফিসারদের অপদার্থতার কথাও উঠে আসে তদন্তে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৈতিক অবক্ষয়কেও পরাজয়ের জন্য দায়ী করা হয়।

ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে প্রচুর অভিযোগ উঠে আসে কমিশনের রিপোর্টে। পাকিস্তানকে যুদ্ধে নামতে বাধ্য করার জন্য তাকেই দায়ী করা হয়। বলা হয় ইয়াহিয়া খানের ঔদ্ধত্য এবং অদূরদর্শিতা দেশকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। সেনাপ্রধান হামিদ খানকেও একাত্তরের যুদ্ধের জন্য দায়ী করেছে কমিশন। কমিশনের রিপোর্টের বিস্তারিত উল্লেখ করে ক্রিস্টিনি তার প্রতিবেদনে একাত্তরের যুদ্ধের জন্য ফের পাকিস্তানকে কাঠগড়ায় তুলেছেন।

হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট থেকে তিনি উল্লেখ করেন সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানী সেনাদের মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দিকটি। রাজনৈতিক সমাধানের পথে না হেঁটে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল পাকিস্তানকে। আর সেই যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের সৈন্যরা মানবতার বিরুদ্ধে লাগাতর অপরাধ করেছে।

পাকিস্তানি সেনার কৃত অপরাধ এবং সেনা অফিসারদের অপকর্মকে আড়াল করতেই হামুদুর কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনা হয়নি বলে মনে করেন ক্রিস্টিনা। তিনি তার লেখায় তুলে ধরেছেন সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে লক্ষ লক্ষ নারীর ইজ্জত লুণ্ঠনের বিষয়টিও। হামুদুর কমিশনের রিপোর্টেই মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বর্বরতার প্রমাণ রয়েছে।

ক্রিস্টিনার মতে, ভুট্টো চেয়েছিলেন এই রিপোর্টকে হাতিয়ার করে অধস্তন সেনা কর্মকর্তাদের ভয় দেখাতে। তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশে তার আগ্রহ ছিল না। তাই তদন্ত করালেও তিনি রিপোর্ট প্রকাশে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখাননি। বরং চেয়েছিলেন হামিদুর কমিশনের রিপোর্টকেই নষ্ট করে ফেলতে। সেই চেষ্টাও তিনি করেছিলেন। ক্রিস্টিনিক মতে, আসলে মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজেদের কুকর্মের বোঝা টানতে চায়না পাকিস্তান। ইতিহাসকে আড়াল করতে চাইছে তারা। তাই লোক দেখানো তদন্ত হলেও সেই তদন্তের রিপোর্ট দেশবাসীকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি পাকিস্তানের শাসককুল।

প্রথম ধাপে ২১৩ জনের সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছিল হামুদুর কমিশন। দ্বিতীয় ধাপে উচ্চপদস্থ কূটনীতিক এবং মুক্তিযুদ্ধের রণক্ষেত্রে সরাসরি যুক্ত থাকা সামরিক কর্মকর্তাসহ ৭৩ জনের জবানবন্দি নেওয়া হয়। জেনারেল ইয়াহিয়া খান থেকে শুরু করে নৌ, সেনা, বিমান বাহিনীর প্রধান, মন্ত্রী, আমলা আর বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাদের সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল হামুদুর কমিশনের রিপোর্টের প্রথম ভাগ। দ্বিতীয় ভাগে ভারতের কারাগার থেকে ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দীর মধ্যে থেকে ৭৩ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়।

জেনারেল নিয়াজির আত্মসমর্পণে পাকিস্তান জুড়ে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। সেই ক্ষোভ সামলাতেই ভুট্টো তড়িঘড়ি তদন্তের নির্দেশ দেন বলে ক্রিস্টিনা মনে করেন। হামুদুর কমিশনের তদন্ত রিপোর্টের প্রথমেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়। সেখানে অবিভক্ত পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করলেও তাকে ক্ষমতা না ছাড়ার প্রসঙ্গটি উল্লেখ করা হয়। সেই সঙ্গে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের দমনমূলক ও বৈষম্যমূলক আচরণের কথাও উঠে আসে রিপোর্টে। কাঠগড়ায় তোলা হয় একাত্তর সালে পাকিস্তানের সামরিক কৌশলকেও।

রয়েছে যুদ্ধ চলাকালে সামরিক বাহিনীর চূড়ান্ত বর্বরতার পাশাপাশি সামরিক কর্মকর্তাদের মারাত্মক নৈতিক অধঃপতনের কথা। একাধিক যৌন ও অর্থ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাদের কোর্ট মার্শাল থেকে শুরু করে অনেকের শাস্তিরও সুপারিশ করেছিল কমিশন। তাই সেই সুপারিশ প্রকাশ করে সেনাকর্তাদের চটিয়ে নিজের গদি খোয়ানোর বদলে রিপোর্টটিকেই গুম করতে চেয়েছিলেন ভুট্টো।

শুধু ভুট্টো নন, পাকিস্তানের কোনও শাসকই হামুদুর রহমান কমিশনের তদন্ত রিপোর্টকে ভালোভাবে নেননি। তারা রিপোর্টটিকে ধামাচাপা দিতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন বলে মনে করেন ক্রিস্টিনা। কারণটাও খুব স্বাভাবিক। ৩০ লাখ বাঙালি শহীদের রক্তের দাগ লেগে রয়েছে পাকিস্তানি সেনার গায়ে। তাদের বর্বরতার কাছে ৩ লাখ নারী খুইয়েছেন ইজ্জত।

গণহত্যার এমন উদাহরণ মানব সভ্যতার ইতিহাসে খুব কম রয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে দানবিকতার দলিল পাকিস্তান তাই নষ্ট করতে চেয়েছিল। সব প্রশাসকই যুদ্ধকালীন অপরাধের বিচারের বদলে ভুলিয়ে দিতে ব্যস্ত থেকেছেন। বিশাল নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে গোপন করে রাখা হয়েছিল কমিশনের রিপোর্ট। জেনারেল পারভেজ মুশাররফ অনেকটা বাধ্য হয়েই হামুদুর কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ করেন। সত্য সামনে আসে।

এটা ঠিক, হামুদুর কমিশনের রিপোর্টে পাকিস্তানি বর্বরতার অনেকটাই বর্ণিত রয়েছে। কিন্তু একাত্তরের বর্বরতা ছিল আরও নির্মম। দেশীয় রাজাকার ও আল-বদরদের নিয়ে খান সেনারা যে নির্মম অত্যাচার চালিয়েছে তার বর্ণনা ভাষায় ব্যক্ত করার নয়। ‘পূর্ব পাকিস্তানের কসাই’ টিক্কা খানের নেতৃত্বে অপারেশন সার্চলাইটের নামে একাত্তরে ২৫ ও ২৬ মার্চের গণহত্যা থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবীদের খুঁজে খুঁজে নির্মম ভাবে হত্যা করে একটি জাতিকে শেষ করে দেয়ার যে ষড়যন্ত্রে পাকিস্তান লিপ্ত হয়েছিল তার খানিকটা স্বীকারোক্তি উঠে এসেছে পাকিস্তানিদের তদন্ত রিপোর্টে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পরেও পাকিস্তান দুঃখপ্রকাশ না করে বুঝিয়ে দিয়েছে তারা সেই বর্বরতার জন্য বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত নয়।

এমনকি, নিজেদের অপরাধের কথা নিজেদের দেশের বিচারব্যবস্থার তদন্তে উঠে এলেও সেটিকে মানতে দিতে রাজি নয় তারা। মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের কাছে পরাজয়ের দুঃখ ভুলতে পারছে না পাকিস্তান। তাই আজও তারা মদদ যুগিয়ে চলেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিদের। নিজেদের দেশের উচ্চপদস্থ সেনাকর্তাদের ব্যর্থতা, দুর্নীতি, নৈতিক অধঃপতনের যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ হামুদুর কমিশনের রিপোর্টে থাকলেও নিজেদের সংশোধনে মন নেই পাকিস্তানের। এমনকি, যুদ্ধে পরাজয়ের খলনায়কদের বিচার করতেও নারাজ পাকিস্তান, এমনটাই মনে করেন জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিকিউরিটি স্টাডিজ সেন্টারের অধ্যাপিকা ক্রিস্টিনা।

কিন্তু অপরাধ বোধ নিয়ে কোন জাতি যে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না, বিশ্বের বুকে তার প্রমাণ দিয়ে চলেছে পাকিস্তান। নিজেদের অপরাধ গোপন করতে গিয়ে একের পর এক নতুন অপরাধে জড়িয়েছে দেশটি। বাংলাদেশে গণহত্যা চালিয়ে বিচারের মুখোমুখি না হওয়া পাকিস্তানি সৈন্যরা নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে জড়িয়েছে আরও বড় অপরাধে। আরও কূটকৌশলে তারা হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে বেলুচিস্তান ও সিন্ধু প্রদেশে। এখনো এই নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি।

যতদিন পাকিস্তান তার অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা না চাইবে, যতদিন তার পাপমোচন না করবে, এভাবেই ধুঁকতে থাকবে দেশটি। অর্থনীতিতে এক সময় বাংলাদেশের থেকে ১৬ গুণ এগিয়ে থাকা দেশটি আজ বাংলাদেশ থেকে অনেক পেছনে। নিজ দেশের নাগরিকদের প্রতি এই অপরাধ ঢাকতে নতুন কোন অপরাধে জড়াবে পাকিস্তান!

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

এইচআর/এএসএম

আরও পড়ুন