ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

রাজহাঁসের সোনার ডিম ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ

মোস্তফা হোসেইন | প্রকাশিত: ০৯:৩৯ এএম, ০৫ এপ্রিল ২০২৬

জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশ পরিচালনায় কখনো সংবিধানকে মানা হয়েছে, কখনো সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ মাধ্যমে আইন করা হয়েছে।অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর ভিতরেই।দু’টি পক্ষ শুরু থেকেই ছিল। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ক্ষুদ্র কিছু দল জুলাই সনদের অপেক্ষায় ছিল। তাদের ভাবনায় ছিল,ঐকমত্যের ভিত্তিতে তাদের গৃহীত আইনি ব্যবস্থাগুলো সবই সংসদে পাস করিয়ে নেবে।বিএনপি ও কিছু দল সংবিধানকে প্রাধান্য দেওয়ার পক্ষে ছিল।

জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি ৭২ এর সংবিধানের পরিবর্তে নতুন সংবিধান রচনাকেই আন্দোলনের নির্দেশনা হিসেবে মনে করেছে। যাকে তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদ মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা বলে এসেছে। এই বিষয়ে বিএনপি গোড়া থেকেই ভিন্নমত পোষণ করে আসছে। যা শেষ পর্যন্ত ৩১ মার্চ মুলতবি প্রস্তাব পর্যন্ত গড়ায়। তবে মুলতবি প্রস্তাবটি স্পিকার ইচ্ছা করলে বাতিল করে দিলেও পারতেন,যেভাবে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাব আনতে দেননি বিএনপি থেকে নির্বাচিত স্পিকার জমিরুদ্দীন সরকার।সেই বিবেচনায় ৩১ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের স্পিকার উদারতার প্রমাণ দিয়েছেন মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করার মাধ্যমে।

আলোচনার সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও সরকারি দল উদারতা দেখিয়েছে। কারণ স্পিকার ইচ্ছা করলে সরকারি দলের অধিক সংখ্যক আলোচককে এবং বিরোধী দলকে আনুপাতিক হারে সময় দিতে পারতেন। দেখা গেছে সরকারি দল থেকে ৩জন আলোচক থাকলেও বিরোধী দল থেকে সুযোগ পেয়েছেন ৮জন। আবার সময়ের বেলাতেও সরকারি দলের সমান পেয়েছেন বিরোধী দলীয় সদস্যগণ।

বিরোধী দলকে সময় এবং বক্তব্য দেওয়ার যতই সুযোগ দেওয়া হোক না কেন মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনার পর বিষয়টি সুরাহা হয়নি। এবং স্পিকার ভোটেও দেননি। ভোটে দিলে হয়তো ওইদিনই আইনগত ফয়সালা হয়ে যেতো। কিন্তু এর রেশ থেকে যেতো। বিরোধী দল বলার সুযোগ পেতো যে,সরকার সংখ্যাগরিষ্টতার বলে পাস করিয়ে নিয়েছে।ফয়সালার জন্য উভয়পক্ষের রুদ্ধদ্বার কক্ষের আলোচনার দিকে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিষয় হওয়ায় বিস্তারিত আলোচনা-পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলতে হবে।

সালাহউদ্দিন সাহেবের প্রস্তাব ছিল সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে উভয়পক্ষকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হোক। তারা সংসদে প্রস্তাব উত্থাপন করবে এবং সেই অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে বিরোধী দল উভয় পক্ষের সদস্যসংখ্যা সমান সমান চেয়েছে। যা নিয়ে হয়তো আলোচনা হতে পারে। সম্ভাবনা আছে সরকারি দল সেটা নাও মানতে পারে। কারণ সমান সংখ্যক সদস্য হলে আসলে কমিটির মধ্যে ভোটের প্রয়োজন হলে ফয়সালায় পৌঁছানো সম্ভব হবে না।

সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের বিতর্কের মধ্যে কিছু বক্তব্য আগামীদিনেও বিতর্ককে টেনে নিয়ে যাবে। এটা উভয়ের ক্ষেত্রেই ঘটবে।যেমন সরকারি দলের সিনিয়র নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন,‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল’। তিনি সংসদে বলেছেন,‘আমি রাষ্ট্রপতির কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তিনি এমন আদেশ জারি করতে পারেন কি না। রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন,“আমি তো পারি না। আমাকে পারাচ্ছে।” রাজহংসকে জোরপূর্বক স্বর্ণের ডিম পাড়তে বাধ্য করার মতো ঘটনা। এখন সেটা অবৈধ ডিম্ব হয়েছে।’একইসঙ্গে তিনি বলেছেন,‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বিরোধী দলীয় এমপিদের শপথবাক্য সরবরাহ করে সিইসি সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন’।

বিএনপি যখন ইশতেহার বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেবে বিরোধী দল তখন গণভোটের রায়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করবে।বিরোধী দলের এই ঢালকে পরাস্ত করতে সরকারি দল তাদের ইশতেহারের পক্ষে জনরায়ের কথা বলবে এটা স্বাভাবিক।তাহলে ফয়সালাটা কি? উভয়পক্ষ আলোচনার ভিত্তিতে সুরাহা হতে পারে। কিন্তু জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভাগুলোতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের চেষ্টাতেও সব বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হয়নি। সংসদীয় নির্বাচনের পরও তারাই নির্বাচিত হয়ে এসেছেন।প্রশ্ন হচ্ছে, এবার কি তারা ঐকমত্যে আসতে পারবেন?

অন্যদিকে বিরোধী দলীয় নেতা ডা.শফিকুর রহমান সংসদে বলেছেন,তারা জনগণের অভিপ্রায়কে সন্মান জানাতে সংসদে গিয়েছেন। প্রশ্ন আসে,অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৩৩টা অধ্যাদেশের বাকিগুলো সম্পর্কে তাদের বক্তব্য কি? জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ যদি অন্তহীন প্রতারণা হয়ে থাকে তাহলে বাকিগুলো কি প্রতারণা নয়? আর রাষ্ট্রপতিকে চাপ দিয়ে যদি অধ্যাদেশ জারি করানো হয়ে থাকে,তাহলে বাকি অধ্যাদেশগুলোও চাপের ফসল এটা বলতে হয়। তাহলে কি রাষ্ট্রপতি শপথ ভঙ্গ করেছেন? শুধু চাপে নত হওয়াই নয়,জনগণের অভিপ্রায় নামে সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন ও শপথ গ্রহণও কি প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত হবে?

সালাহউদ্দিন আহমেদ যদিও সিইসির সমালোচনাকালে বলেছেন সিইসি উপস্থিত থাকলে তিনি এমনটা বলতে পারতেন। কিন্তু অলরেডি তা বলা হয়ে গেছে। হয়তো সংসদীয় বিধান অনুযায়ী সিইসির অনুপস্থিতির কারণে তিনি সরাসরি মন্তব্য করেননি। এটা আইনগত বিষয় কিন্তু মর্মকথা হচ্ছে সিইসির পদক্ষেপগুলোকে বিএনপি মেনে নিতে পারছে না। সেক্ষেত্রে সংবিধান লঙ্ঘনকারী হিসেবে সিইসির বিরুদ্ধে সংসদে আলোচনা হবে কিংবা তার বিরুদ্ধে কি সংসদ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে কি না। আর জামায়াতে ইসলামীর জনগণের অভিপ্রায় এর সীমানা নিয়েও ভবিষ্যতে আলোচনা হবে।

সংসদে বিরোধী দলের মুলতবি প্রস্তাবের ভিত্তিতে সরকারি দল ও বিরোধী দলের আলোচনার পরও যখন সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হয়নি,তখন প্রশ্ন জাগে জুলাই সনদে উল্লেখিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের কি মৃত্যু ঘটলো? এর আগে নির্বাচিত এমপিদের শপথ অনুষ্ঠানকালে বিএনপি ও জোটসঙ্গীরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেয়ার পর আঁচ করা যাচ্ছিল,সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।কিন্তু ১৫ মার্চ শপথ গ্রহণের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর এবং ৩১ মার্চ সংবিধান সংশোধনে কমিটি গঠনের প্রস্তাবের পর আরও স্পষ্ট হয়ে যায়,আসলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ জন্মের আগেই গত হয়ে গেলো।

সরকারি দলের প্রস্তাব অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব তৈরির জন্য হয়তো উভয়পক্ষের সদস্যদের নিয়ে কমিটিও গঠিত হতে পারে।বিরোধী দলও অংশ নিতে পারে এই কমিটিতে।আন্দোলনে যাওয়ার ধমক দিলেও এই পর্যন্ত বিরোধী দলের ইতিবাচক ভূমিকা দেখে মনে হতে পারে,তারা অন্তত সংবিধান সংশোধনীর দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু কমিটি গঠন ও উভয়পক্ষ সেখানে অংশ নিলেও বিরোধী দলের অন্যতম দাবি প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষে সদস্য মনোনয়নের বিষয়টি উভয়পক্ষকে ভোগাবে এটা সহজেই অনুমান করা যায়। জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম জোটসঙ্গী এনসিপি এবং জামায়াতে ইসলামীর চাহিদা ভোটের অনুপাতে সদস্য কিন্তু বিএনপি চায় পার্লামেন্টে নির্বাচিত সদস্যদের অনুপাতে উচ্চকক্ষে সদস্য মনোনয়ন।বিপরীতমুখী এই চাওয়ার ফয়সালা কিভাবে হবে এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। তবে বিতর্কটি সহজে যে শেষ হবে না তাও অনুমান করা যায়।

শুধু সংবিধান সংস্কার পরিষদই নয় ওইদিনের আলোচনায় গণভোট অধ্যাদেশটিও অবৈধ হিসেবে গণ্য হওয়ার মতো অবস্থায় পড়েছে।এই মুহূর্তে গণভোটের রায় ও নির্বাচনি ইশতেহারের পক্ষে জনরায় হওয়ায় দুটিই প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে যাবে। গণভোটের ব্যালটে নোট অব ডিসেন্ট যুক্ত না থাকার কারণে বিএনপি তাদের ইশতেহার অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে যেমন বাধার মুখে পড়তে পারে আবার গণভোটেও জনরায় আছে সেটিও বাধার মুখে পড়তে পারে।

বিএনপি যখন ইশতেহার বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেবে বিরোধী দল তখন গণভোটের রায়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করবে।বিরোধী দলের এই ঢালকে পরাস্ত করতে সরকারি দল তাদের ইশতেহারের পক্ষে জনরায়ের কথা বলবে এটা স্বাভাবিক।তাহলে ফয়সালাটা কি? উভয়পক্ষ আলোচনার ভিত্তিতে সুরাহা হতে পারে। কিন্তু জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভাগুলোতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের চেষ্টাতেও সব বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হয়নি। সংসদীয় নির্বাচনের পরও তারাই নির্বাচিত হয়ে এসেছেন।প্রশ্ন হচ্ছে, এবার কি তারা ঐকমত্যে আসতে পারবেন? তবে সবকিছুই রাজহাঁসের স্বর্ণডিম্ব পারার মতো হয় না।কঠিন কাজও সহজ হয়ে যায় আন্তরিকতায়।আপাতত সেটুকুই আশা করা যায়।

লেখক : সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।

এইচআর/এমএস