বাংলাদেশের নতুন সরকার: অর্থনীতির গতি ফেরানোর লড়াই
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। দলটি এমন এক সময় দায়িত্ব নিচ্ছে যখন অন্তর্বর্তী সরকার হাসিনা আমলে খাদে পড়া অর্থনীতিকে টেনে তুলেছে। রিজার্ভ, ডলারের দাম ও রেমিট্যান্স প্রবাহকে রেখে যাচ্ছে স্বস্তিদায়ক অবস্থায়। এখন অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল করার দিকেই মনোযোগী হতে হবে নতুন মন্ত্রিপরিষদকে।
সেক্ষেত্রে মোটা দাগে কয়েকটি ইস্যুতে চ্যালেঞ্জের মুখে থাকবে নতুন সরকার। এর মধ্যে আছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান তৈরি, রাজস্ব আয় ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অর্থপাচার রোধ, রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখা, জনশক্তি ও পণ্য রপ্তানি বাড়ানো, রিজার্ভ ও মুদ্রা বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন করা।
ইতোমধ্যে অর্থনীতির চ্যালেঞ্জের কথা বিজয়ের পরদিনই এক সংবাদ সম্মেলনে স্বীকার করেছেন ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শনিবারের সংবাদ সম্মেলনেও একই কথা বলেছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
সাধারণত নতুন সরকারের কাছে জনগণের বড় চাওয়া থাকে জীবনযাত্রার ব্যয় বা মূল্যস্ফীতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। বর্তমানে এই হার ৮ শতাংশের ঘরে নামলেও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এখনও সর্বোচ্চ। এমনকি পাকিস্তানের চেয়েও বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি বেশি। এই হার ৭ শতাংশে নামিয়ে না আনা পর্যন্ত সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি ধরে রাখার কথা বলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
তবে রাজনৈতিক সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর বিনিয়োগে আগ্রহ বাড়বে তাই বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে ৮ শতাংশের বেশি ধরেছেন গভর্নর। যদিও এখন তা ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে তথা ৬ শতাংশের ঘরে আছে। নতুন সরকারকে কর্মসংস্থান বাড়াতে বিনিয়োগের দিকেই সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে।
এজন্য বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন খুব জরুরি। এক্ষেত্রে ব্যবসা শুরুর খরচ কমিয়ে আনতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে আনা, দক্ষতা বাড়ানো, হয়রানি বন্ধ করা, দুর্নীতি প্রতিরোধে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া কিছু সংস্কার অব্যাহত রাখা।
বিদ্যুৎ নিয়েও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে নতুন সরকার। কারণ, দায়িত্ব নেয়ার মাসখানেক পরই শুরু হবে গরমকাল। সম্প্রতি বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কেন্দ্রের মালিকরা জানিয়েছেন, সরকারের কাছে তাদের পাওনা ১৪ হাজার কোটি টাকা। এটি পরিশোধ না করলে গরমে বিদ্যুৎ সংকটের আশঙ্কা আছে। এছাড়া ভারতের আদানির কাছেও সরকারের পাওনা আছে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার।
এক্ষেত্রে বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ড বা বিডার নীতিগত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও চুক্তির ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। বিএনপির ইশতেহারেও বিনিয়োগ নিয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তবে সরকার গঠন করার পর বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে যেন আমলাতন্ত্রের বাধা হয়ে না দাঁড়ায় সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
নতুন সরকারের সামনে সরকারি কর্মচারিদের পে-স্কেল বাস্তবায়ন অন্যতম আরেকটি চ্যালেঞ্জ। এর জন্য অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার জোগান দিতে হবে নতুন অর্থবছরের বাজেটে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার এই অর্থ রেখে যাওয়ার কথা বলেছে। যদি সেটা না হয় তাহলে এই পরিমাণ রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে।
এছাড়া ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ সামাজিক নিরাপত্তা খাতের জন্য ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে বাড়তি অর্থ লাগবে। এজন্য বাজেটের আকার বাড়াতেই হবে। সেক্ষেত্রে নতুন সরকারের নতুন বাজেট ১০ লাখের ঘরেও যেতে পারে। প্রতিশ্রুতি পূরণের এই বাজেটের জন্য বাড়াতে হবে রাজস্ব সংগ্রহ।
কিন্তু বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের মধ্যে একেবারে নীচের দিকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই হার মাত্র ৬.৮ শতাংশ। তাই নতুন সরকারকে দায়িত্ব নিয়েই রাজস্ব বাড়ানোর দিকে হাত দিতে হবে। লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজন পড়বে করফাঁকি ও করজাল সম্প্রসারণ করা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির গবেষণায় দেখা যায়, কর ফাঁকি বন্ধ ও নতুন করদাতা বাড়াতে পারলে বছরে অন্তত ২ থেকে আড়াই লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব।
এছাড়া অর্থনীতির হৃদপিন্ড হিসেবে খ্যাত ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ধরে রাখাও নতুন সরকারের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিবে। অন্তর্বর্তী সরকার ৫টি ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করেছে। এই ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত বুঝিয়ে দেয়ার পাশাপাশি হাজার হাজার শেয়ার হোল্ডারদের নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে তা নিরসন করতে হবে।
এর বাইরে ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করার উদ্যোগও নিয়ে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও ব্যাংকের মত জটিলতা তৈরি হবে, সেগুলোও দূর করার চাপ পড়বে নতুন সরকারের ওপর। সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতে গেল বছরের সেপ্টেম্বরে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকার যে বিপুল খেলাপি ঋণ (মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ,বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ হার) জমেছে তা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
খেলাপি ঋণের আদায় বাড়ানোতে কোন সফলতা দেখাতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন সরকার কীভাবে খেলাপি কমাবে সেটিও হয়তো আলোচনার জন্ম দিতে পারে। চাইলে খেলাপির সংজ্ঞা পরিবর্তন করে (যেমন-হাসিনা আমলে খেলাপির সময়মীমা ৩ মাস থেকে বাড়িয়ে ৬ মাস করা হয়েছিল) হতে পারে। তবে এটি আন্তর্জাতিক চর্চা বিরুদ্ধ হওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়বে সরকার।
আবার, পুন:তফসিল সুবিধা বাড়িয়ে খেলাপি কমানো যেতে পারে, এটিও সমালোচনার জন্ম দিবে। সেক্ষেত্রে অন্তরবর্তী সরকার যেখানে সফল হয়নি, অর্থাৎ খেলাপি আদায়ে মনোযোগ বাড়াতে হবে। এর পাশাপাশি মামলার কারণে আটকে থাকা ঋণ আদায় বাড়াতে আদালতের সংখ্যা বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে ভালো ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা যেমন ব্যবসা করতে পারেন সেই সুযোগ অবারিত রাখতে হবে।
এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার যে উদ্যোগ নিয়ে রেখেছে অন্তর্বর্তী সরকার তার সঙ্গে ইশতেহারে একমত হয়ে প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে বিএনপি। এখানে নতুন সরকারের কাছে আশাবাদী হবেন সাধারণ জনগণ। কারণ ইশতেহারে বলা হয়েছে অর্থমন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগ বিলুপ্ত করা হবে।
এতে সরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়াও ব্যাংকের বোর্ড গুলোতে পরিবারতন্ত্র বন্ধ করা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ রাখার প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়েছে ইশতেহারে। খাদ থেকে তুলে আনা অর্থনীতিকে গতিশীল করতে হলে ব্যাংক খাতে বিশেষ নজর দেয়ার বিকল্প থাকবে না নতুন সরকারের কাছে।
বিদ্যুৎ নিয়েও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে নতুন সরকার। কারণ, দায়িত্ব নেয়ার মাসখানেক পরই শুরু হবে গরমকাল। সম্প্রতি বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কেন্দ্রের মালিকরা জানিয়েছেন, সরকারের কাছে তাদের পাওনা ১৪ হাজার কোটি টাকা। এটি পরিশোধ না করলে গরমে বিদ্যুৎ সংকটের আশঙ্কা আছে। এছাড়া ভারতের আদানির কাছেও সরকারের পাওনা আছে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার।
এসব পাওনার বাইরে আছে হাসিনা সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা। গেল বছরের জুন পর্যন্ত এর পরিমাণ ২১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। চলতি বছর থেকেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়বে। অন্যান্য মেগা প্রকল্পের ঋণের কিস্তিও পরিশোধের চাপ বাড়বে। গেল অর্থবছরে সরকার বাজেটে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে শুধু মাত্র দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ।
ঋণের চাপ সামাল দিতে প্রয়োজন পড়বে ডলার আয় বাড়ানো। এক্ষেত্রে অর্থপাচার বন্ধ করার মত চ্যালেঞ্জ নিতে হবে নতুন সরকারকে। আর রেমিট্যান্স প্রবাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। এজন্য জনশক্তি রপ্তানি বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। যদিও ইশতেহারে এই প্রতিশ্রুতি দেয়া আছে। আশা করা যাচ্ছে বিষয়গুলো আরও গুরুত্ব পাবে।
এছাড়া রপ্তানি বাড়াতে প্রয়োজন পড়বে বহুমুখীকরণ। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খোলার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও হতে পারে। কারণ চুক্তি এমন কিছু বিষয় আছে সেগুলো পরিপারলন করতে গেলে হয়তো নতুন সংসদের অধিবেশনগুলোতে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে উত্তাপ বাড়তে পারে।
সবশেষ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন। যদিও ব্যবসায়ীদের দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করে এক ফেসবুক পোস্টে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছিলেন, গ্র্যাজুয়েশন পেছানোর পক্ষে তিনি। কারণ বাংলাদেশকে আরও প্রস্তুতি নিতে হবে। চলতি বছরের নভেম্বরে চূড়ান্ত গ্র্যাজুয়েশন হওয়ার কথা।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, স্টার নিউজ।
এইচআর/জেআইএম