কুমিল্লা-৪
বিএনপির রাজ্যে হাসনাতের পথ আটকাতে মাঠে ট্রাক
মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহ (বাঁয়ে) ও গণঅধিকার পরিষদের মো. জসিম উদ্দিনের মধ্যে/ফাইল ছবি
দেবিদ্বার উপজেলা নিয়ে গঠিত কুমিল্লা-৪। গোমতী নদীর তীরে এবং কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এই সংসদীয় এলাকা ১৯৯১ থেকে টানা ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপির দখলে ছিল। পরে তা ঘুরেফিরে আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে যায়।
সেই দেবিদ্বারে এবার ভোটের মাঠে সরাসরি থাকার সুযোগ পাচ্ছে না বিএনপি। দলটির টিকিটে এখানে চারবার সংসদ সদস্য (এমপি) হওয়া মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী আইনি জটিলতায় পড়ে এরই মধ্যে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অযোগ্য ঘোষিত হয়েছেন। এতে সংসদে যাওয়ার দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মনোনীত ও জামায়াতসহ ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য সমর্থিত প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ। তবে তার পথ আটকাতে ট্রাক প্রতীক নিয়ে মাঠে আছেন গণঅধিকার পরিষদের মো. জসিম উদ্দিন। তাকে সঙ্গ দিচ্ছেন স্বয়ং মঞ্জুরুলসহ বিএনপির নেতাকর্মীরা।
জেলা শহর থেকে ২৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাণিজ্যিক ও কৃষিপ্রধান অঞ্চল হিসেবে পরিচিত দেবিদ্বারের আয়তন ২৪৩ বর্গকিলোমিটার। এবারের নির্বাচনে সেখানে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ছিলেন মঞ্জুরুল। তবে হাসনাতের আপিলের জেরে ঋণখেলাপি হওয়ার অভিযোগে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। পরে উচ্চ আদালতে গিয়েও কোনো লাভ হয়নি মঞ্জুরুলের। এ অবস্থায় দেবিদ্বারে বিএনপির আর কোনো প্রার্থী না থাকায় তাদের জোটসঙ্গী গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জসিমকে এখানে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

মঞ্জুরুল বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে উপজেলার গুনাইঘরে নিজ বাসভবনের ‘শহীদ জিয়া অডিটোরিয়ামে’ দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে আয়োজিত এক বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে জসিমকে সমর্থন দেন এবং নেতাকর্মীদের ট্রাকের পক্ষে মাঠে কাজ করার আহ্বান জানান। পরদিন থেকে স্থানীয় বিএনপির নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে জসিমের পক্ষে মাঠে নামেন। এদিন মঞ্জরুল ও তার ভাই জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এ এফ এম তারেক মুন্সী, বেলজিয়াম বিএনপির সভাপতি সাইদুজ্জামান লিটন এবং গুলশান থানা বিএনপির নেতা আবদুল আউয়াল খান এলাকায় নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করে কর্মপরিকল্পনা ঠিক করেন। সেখানে নির্ধারণ হয়, তারা গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা করবেন।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাক প্রতীকের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন মঞ্জুরুল।

উপজেলার সেখানকার জাফরগঞ্জ, বারেরা, ফুলগাছতলা, পৌর এলাকার নিউ মার্কেট ও পান্নারপুল ঘুরে দেখা গেছে, প্রচারণার ব্যানার-ফেস্টুনে তুলনামূলক এগিয়ে আছেন হাসনাত। কিছু কিছু জায়গায় গণঅধিকার পরিষদের পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীদের প্রচারণাও চোখে পড়েছে।
আরও পড়ুন
কুমিল্লা-১০: দলীয় কোন্দলে দুর্বল বিএনপির ঘাঁটি, শক্ত অবস্থানে জামায়াত
কুমিল্লা-৫: আসন পুনরুদ্ধার চাইবে বিএনপি, জামায়াতের সামনেও প্রথম সুযোগ
কুমিল্লা-১১: ‘দিনরাত মাদক আর চিনি আসে বর্ডার দিয়ে, এসব বন্ধ হওয়া দরকার’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গণঅধিকারের প্রার্থী জসিমের জনবল, পরিচিতি ও অর্থ তেমন নেই। তবে এখন বিএনপির সমর্থন পাওয়ায় পরিস্থিতি ঘুরেও যেতে পারে। কিন্তু কথা হলো- বিএনপি তাকে কতটুকু টেনে তুলবে।
দেবিদ্বার জিরো পয়েন্টে কথা হয় রেস্তোরাঁর কর্মী বনকোট গ্রামের বাসিন্দা ইব্রাহিমের (৪৬) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রামে রাজী মোহাম্মদ ফখরুল ও মঞ্জরুল আহসান মুন্সী দুজনের বাড়ি। যে-ই প্রার্থী হয়ে আসতো, বিএনপি-আওয়ামী লীগ চাইতাম না, তারেই ভোট দিতাম। এবার তো তারা কেউ নাই। কেন্দ্রে যাবো কি না, জানি না। গেলে হাসনাতরেই ভোট দিমু। হাসনাত ব্যক্তি ভালো। এমপি হলে এলাকার উন্নয়ন হবে।’
ইব্রাহিম জানান, তাদের এলাকায় নির্বাচনি আমেজ নেই। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নির্বাচনি মাঠে নেই। এনসিপি আর জামায়াত আছে। বাকিদের তো লোকবল নেই।

পৌর এলাকার চেয়ারম্যান বাড়ির হানিফ সরকার বলেন, ‘আমাদের এখানে হাসনাত আবদুল্লাহ যাবে। সে ছেলে ভালো, বিপুল ভোটে জিতবো। সে পাস করলে দেবিদ্বারের উন্নতি হইবো।’
এলাকার সমস্যা নিয়ে তিনি বলেন, ‘সমস্যার তো শেষ নেই। এখন কইলে তো শত্রু বাড়বে। মাদক ও চাঁদাবাজির অত্যাচার আছে। যিনিই আসবেন, হয়তো সমাধান করবেন। তারা জানেন বিষয়গুলো।
আরেক বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের আসনের মৌলিক সমস্যা যানজট। রাস্তাঘাটের অবস্থা খারাপ। মাদক ও কিশোর গ্যাং ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গোমতীর মাটি চুরি হয়, এতে প্রতিরক্ষা বাঁধ ও ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা এসব সমস্যার সমাধান চাই।’
কুমিল্লা-৪ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৪৫৪ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫ হাজার ৮৪৮ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৯৪ হাজার ৬০৩ জন। পোস্টাল ভোটার ১০ হাজার ১০৫ জন। এ আসনে ভোটকেন্দ্র ১১৬টি। এর মধ্যে পুলিশের কাছে ঝুঁকিপূর্ণের তালিকায় আছে ৭০টি।
ভোটের মাঠে আছেন মোট পাঁচ প্রার্থী। তারা হলেন এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহ, গণঅধিকার পরিষদের মো. জসিম উদ্দিন, খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ মজিবুর রহমান, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের আরফানুল হক সরকার ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আব্দুর করিম।
এসইউজে/একিউএফ