সুন্দরবননির্ভর খুলনা-৬
বিএনপির জন্য অগ্নিপরীক্ষা, টিকে থাকতে চায় জামায়াত
খুলনা-৬ এ হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বিএনপির এস এম মনিরুল হাসানের (বাপ্পী) সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর মো. আবুল কালাম আজাদের, ছবি: জাগো নিউজ
কয়রা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজেলা। কয়রা ও পাইকগাছা নিয়ে গঠিত খুলনা-৬ নির্বাচনি আসন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হয় এই আসনের সুন্দরবননির্ভর শ্রমজীবী মানুষকে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে উপকূলবাসীর উন্নয়নই প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সংখ্যালঘু ও নারীদের নিরাপত্তা, নদীভাঙন রোধে টেকসই বাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন বিকাশের বিষয়গুলোও রয়েছে ভোটারদের মুখে মুখে।
আসনটিতে চলছে ভোটযুদ্ধের তীব্র লড়াই। বিশেষ করে বিএনপির জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা আর জামায়াতে ইসলামীর জন্য টিকে থাকার লড়াই। কেননা বিগত নির্বাচনগুলোতে জোটবদ্ধভাবে বিএনপি ও জামায়াত নির্বাচন করেছে এখানে। এবার তারা একে অপরের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। তাই ভোটের মাঠে চিত্র এবার ভিন্ন।
ভোটার-সমর্থক ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আসনটিতে বিএনপি যদি পরিবর্তন আনতে পারে, সেটি হবে কেবল তাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার ফল। জামায়াতের যদি প্রত্যাবর্তন হয় তবে সেটি হবে বিএনপির অনৈক্যের কারণেই। তবে আসনটি থেকে আওয়ামী লীগের ভোটার ও হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটার যিনি টানতে পারবেন তিনি এগিয়ে থাকবেন, বলছেন তারা।
এই আসনে প্রার্থী যারা
খুলনা-৬ আসনটি জামায়াতে ইসলামীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই আসন থেকে দলটি এর আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হয়েছে। এ আসন থেকে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পাঁচজন। তারা হলেন- বিএনপির এস এম মনিরুল হাসান (বাপ্পী), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মো. আবুল কালাম আজাদ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রশান্ত কুমার মণ্ডল, ইসলামী আন্দোলনের মো. আছাদুল্লাহ ফকির এবং জাতীয় পার্টির মো. মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর।

বিগত নির্বাচনের হিসাব
১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এম. এ. বারী, ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ মুসলিম লীগের খান-এ-সবুর, ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির মোমেন উদ্দিন আহমেদ, ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জহরুল হক সরদার, ১৯৯১ সালে জামায়াতে ইসলামীর শাহ মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস, ১৯৯৬ সালের জুনে আওয়ামী লীগের শেখ মো. নূরুল হক ও ২০০১ সালে জামায়াতে ইসলামীর শাহ মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস নির্বাচিত হন। এরপর টানা চারটি নির্বাচনে জয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা।
ভোটের মাঠের চিত্র
পুরোনো আসন উদ্ধারে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ নেমেছেন সর্বশক্তি নিয়ে আর সেই চ্যালেঞ্জ বুক পেতে ঠেকাতে চুল পরিমাণ ছাড় না দেওয়ার দৃঢ় অবস্থানে ধানের শীষের প্রার্থী এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পীর। অনেকটা মুখোমুখি লড়াইয়ে উত্তাল পুরো আসন। এর বাইরে লাঙলের প্রার্থী মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর, কাস্তে প্রতীকের প্রশান্ত কুমার মণ্ডল এবং হাতপাখার প্রার্থী আছাদুল্লাহ ফকির লড়াইয়ে থাকলেও ভোটের উত্তাপ ও হিসাব-নিকাশ ঘুরছে মূলত ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার চারপাশে।

এলাকাজুড়ে মিছিলের গর্জন, স্লোগানের প্রতিধ্বনি, সভা-সমাবেশ আর ফ্যাস্টুন-লিফলেটের ঝড়ে ভোটের মাঠ টগবগ করছে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এই আসনে যে লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হবে, তা নিশ্চিত। এলাকাবাসীর কথা শুনে মনে হয়েছে, ভোটের ব্যবধান খুব বেশি হবে না।
সাধারণ ভোটাররা যা বলছেন
কয়রার মহেশ্বরীপুর এলাকার স্বপন কুমার সরকার জাগো নিউজকে বলেন, এখানে সকালে এক প্রার্থী জনসংযোগ করছেন, বিকেলেই সেখানে দেখা যাচ্ছে আরেক প্রার্থীর বহর। দুই পক্ষই মাঠে নেমেছে পুরো শক্তি নিয়ে। কেউ কাউকে ছাড় দেবে না, সেই সুযোগ নেই এখানে। এই আসনে হিন্দু ভোটার যার পক্ষে থাকবে সেই বিজয়ী হবে।
কয়রা এলাকার ৭০ বছর বয়সী পঞ্চানন দাশ নামের একজন বলেন, এবার প্রার্থীরা যে পরিমাণ ভোট চাইছেন, তা আমার ৭০ বছর জীবনে চোখে দেখিনি। এটা ভালো লাগছে যে সবাই আমাদের কাছে আসছেন, আমাদের হিন্দু সমাজের কথা শুনছেন।
উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগেও এমপিরা প্রতিশ্রুতি দিতেন। কিন্তু ভোটের পর আর কাউকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল ছিল। এবারও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, প্রার্থীরা বলছেন ভোটের পরেও তারা এলাকায় আসবেন। দেখা যাক, সময় হলেই বোঝা যাবে।

কয়রা এলাকার বাসিন্দা বাহারুল ইসলাম বাহার জাগো নিউজকে বলেন, এখানকার প্রতিটি মানুষকে অনেক সংগ্রাম আর পরিশ্রম করে টিকে থাকতে হয়। এলাকার সমস্যার কথা বলে শেষ করা যাবে না। নদীভাঙন, পানির সংকট ও চিকিৎসা সেবার উন্নয়ন দরকার। আওয়ামী লীগ আমলে খুব বেশি উন্নয়ন হয়নি।
আসনটি থেকে জয়ী হতে হলে আওয়ামী লীগের ভোট ফ্যাক্টর বলে মনে করেন পাইগগাছা পৌর এলাকার বাসিন্দা শামীম লস্কর। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আওয়ামী লীগের লোকেরা এবার ভোটে আসেনি। অনেকে পালিয়ে গেছে। তবে তাদের একটি বড় ভোটব্যাংক রয়েছে এলাকায়। বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের ভোটারদের টানতে অনেক চেষ্টা করছেন।
ভোটের মাঠে বিএনপি প্রার্থীর অবস্থান
বিএনপির প্রার্থী মনিরুল হাসান বাপ্পী নতুন মুখ হলেও খুব অল্প সময়ে নির্বাচনি এলাকায় সক্রিয়তা দেখিয়েছেন বলে জানান স্থানীয়রা। শুরু থেকেই বড় বহর নিয়ে মাঠে আছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে নিয়মিত গ্রামে গ্রামে ঘুরে ভোট চাইছেন। উঠান বৈঠক, পথসভা, হেঁটে হেঁটে কুশলবিনিময় সব মিলিয়ে তার প্রচারণা কৌশল বেশ আক্রমণাত্মক ও দৃশ্যমান। ধানের শীষের পক্ষে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়ার কর্মসূচি প্রতিদিন চলছে।
বিএনপির স্থানীয় নেতারা বলছেন, উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার বার্তা নিয়ে তারা মানুষের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। এই অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। টেকসই উন্নয়ন ছাড়া এই এলাকার প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

বিএনপির সমর্থক লিটন মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, এলাকার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা, স্কুল-কলেজ ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে আমাদের অগ্রাধিকার তালিকায়। তরুণ প্রার্থী হিসেবে বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে বাপ্পী ভাই ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন।
জামায়াতের অবস্থান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও প্রচার-প্রচারণায় পিছিয়ে নেই। দলটির মনোনীত প্রার্থী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ জোরালোভাবে মাঠে নেমেছেন। জনসভা, পথসভা ও গণসংযোগের মাধ্যমে তিনি ভোটারদের কাছে নিজের অবস্থান তুলে ধরছেন। আবুল কালাম আজাদ তার বক্তব্যে জানান দিচ্ছেন, দেশের মানুষ দুর্নীতি, দুঃশাসন ও বৈষম্যে অতিষ্ঠ এ কথা উল্লেখ করে ন্যায়বিচার, সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
তিনি বলছেন, অতীতেও জামায়াতে ইসলামী এ জনপদের অধিকার আদায়ে রাজপথে ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। এ অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের জন্য তিনি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষক ও মৎস্যজীবীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর জোর দিচ্ছেন। সংসদে পৌঁছানোর সুযোগ পেলে পাইকগাছা ও কয়রার অবহেলিত জনগোষ্ঠীর ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করার অঙ্গীকারও করছেন তিনি।
জামায়াত সমর্থিত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতীতে এই আসনে জামায়াত দুবার নির্বাচিত হওয়ায় দলটির সাংগঠনিক অবস্থান বেশ শক্ত। প্রচারণায় শৃঙ্খলিত দলীয় কাঠামো ও সংগঠিত কর্মীবাহিনী স্পষ্ট। বিশেষ করে ধর্মপ্রাণ ও নীরব ভোটারদের মধ্যে দাঁড়িপাল্লার সমর্থন টানতে আবুল কালাম আজাদ নিয়মিত গণসংযোগ চালাচ্ছেন। মসজিদকেন্দ্রিক এলাকা, গ্রামীণ জনপদ ও পাড়া-মহল্লায় ছোট ছোট সমাবেশ করে ভোটারদের কাছে নিজের অবস্থান তুলে ধরছেন।

নীরব ভোটারদের দখলে রাখার কৌশল
এই আসনে অন্যতম প্রধান দুই প্রার্থীর কৌশলগত লড়াইও বেশ চোখে পড়ার মতো। বিএনপি যেখানে বড় শোডাউন ও জনসমাগমে শক্তি দেখাতে চাইছে, সেখানে জামায়াত বেশি জোর দিচ্ছে সংগঠিত ও টার্গেটেড প্রচারণায়। এক পক্ষ বড় সমাবেশে বার্তা দিচ্ছে, অন্য পক্ষ ছোট ছোট বৈঠকে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছে। ফলে ভোটের মাঠে সৃষ্টি হয়েছে দ্বিমুখী চাপ। একদিকে দৃশ্যমান জনসমর্থনের প্রদর্শন, অন্যদিকে নীরব ভোটারদের দখলে রাখার প্রতিযোগিতা।
ভোটকেন্দ্র ঘিরেও বিএনপি-জামায়াতের প্রস্তুতি স্পষ্ট। কোন এলাকার কোন কেন্দ্র বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কোথায় কার শক্ত ঘাঁটি, এসব হিসাব কষেই চলছে প্রচারণা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এবার খুলনা-৬ আসনে ফল নির্ধারিত হবে শেষ মুহূর্তের ভোটারের মুড আর মাঠপর্যায়ের সংগঠনের শক্তির ওপর। কারণ, দুই প্রার্থীই সমানভাবে মাঠে সময় দিচ্ছেন এবং কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ।
ভোটের হিসাব-নিকাশ
খুলনা-৬ আসন (পাইকগাছা-কয়রা) ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় নির্বাচনি এলাকা। এই আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ১৫৫টি। নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মোট ভোটার ৪ লাখ ২৩ হাজার ৩৩১। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ১২ হাজার ৮৬৯, নারী ভোটার ২ লাখ ১০ হাজার ৪৬১ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার একজন।
টিটি/এসএনআর/এমএমএআর