ঢাকা-৬

শেষ মুহূর্তে বড় পরিসরে প্রচারণা, আচরণবিধি লঙ্ঘন

আশিকুজ্জামান
আশিকুজ্জামান আশিকুজ্জামান , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:০৭ পিএম, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের বাসায় তার সঙ্গে আলাপ করছেন জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মো. আব্দুল মান্নান

 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারণা আগামীকাল মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টায় শেষ হচ্ছে। এর আগে, শেষ দিনে আজ সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা-৬ আসনে প্রধান দুই প্রার্থীর পক্ষে পৃথক বড় কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

দিনভর পুরান ঢাকায় বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে প্রচারণার শেষ পর্ব সম্পন্ন করবেন প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। কর্মসূচিগুলোর মধ্যে রয়েছে বড় জমায়েত। যার একটিতে আবার যোগ দেবেন বিএনপির দলীয় প্রধান। প্রচারণার শেষ সময়ে এসব কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এলাকায় রাজনৈতিক তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া নির্বাচনি প্রচারণা ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে শেষ করার বিধান রয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সারাদেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সে অনুযায়ী আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সব ধরনের রাজনৈতিক প্রচার-প্রচারণা বন্ধ হয়ে যাবে।

jagonews24.com

ঢাকা-৬ আসনের বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচন পরিচালনা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী সোমবার বিকেলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান একটি জনসভায় বক্তব্য দেবেন। পুরান ঢাকার ধূপখোলা মাঠে এই জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। এ কর্মসূচিকে ঘিরে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি দেখা গেছে।

আরও পড়ুন

অন্যদিকে, প্রচারণার শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর পক্ষে একটি গণমিছিলের আয়োজন করা হয়। সোমবার সকালে ইত্তেফাক মোড় থেকে গণমিছিলটি বের হয়।

যেমন ছিল দুই প্রার্থীর প্রচার ব্যস্ততা

আসনটিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাতজন প্রার্থী অংশগ্রহণ করছেন। তবে মাঠে প্রচারণায় সক্রিয় আছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দুই প্রার্থী।

গতকাল রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল মান্নান নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ওয়ারী, ফরাশগঞ্জ, শ্যামবাজার ও কোতোয়ালি এলাকায় নির্বাচনি গণসংযোগ করেন। এ সময় তিনি ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং সমর্থন চান।

jagonews24.com

প্রচারণা শুরুর পর থেকেই প্রায় প্রতিদিন এই প্রার্থী গণসংযোগ ও পথসভায় ব্যস্ত ছিলেন।

গত ২৫ জানুয়ারি দুপুরে পুরান ঢাকার ধূপখোলা মাঠে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ও ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য সমর্থিত ঢাকা-৬ আসনের এই প্রার্থীর সমর্থনে আয়োজিত এক জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিয়েছিলেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। সেদিন জামায়াত আমির বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে পুরান ঢাকাকে সোনা বানাবো হবে।

ছাদ কৃষিকে উৎসাহ, আধুনিক সরকারি হাসপাতাল স্থাপন, পার্কে প্রাথমিক চিকিৎসা সুবিধা, নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে বিশেষ প্রণোদনা, পুরান ঢাকার সার্বিক ইতিহাস ঐতিহ্য রক্ষার প্রতিশ্রুতিসহ ঢাকা-৬ আসনের সার্বিক উন্নয়নে ১৪ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেন জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল মান্নান।

আরও পড়ুন

গত বৃহস্পতিবার ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে প্রার্থী আব্দুল মান্নান জাগো নিউজকে বলেন, এটি প্রস্তুতের সময় এলাকার সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের চাহিদা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়েই এই ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংসদ সদস্যদের জন্য স্থায়ী কার্যালয় স্থাপন এবং প্রতি তিন মাসে অন্তত একবার থানা পর্যায়ে জনগণের সামনে কাজের হিসাব উন্মুক্ত করার অঙ্গীকারও করেন এই প্রার্থী।

গত শনিবার তার সমর্থনে যুবসমাজের অংশগ্রহণে একটি যুব পদযাত্রাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

অন্যদিকে, আসনটিতে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনকে। যিনি অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও সাবেক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা সাদেক হোসেন খোকার জ্যেষ্ঠ সন্তান। ইশরাক হোসেনও গত ২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ ঢাকার নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল ২০২০ সালের নির্বাচনের ভিত্তিতে তাকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ঘোষণা করেন।

jagonews24.com

তবে সংশ্লিষ্টরা সেই সময় মেয়াদ শেষ হয়েছে, দাবি করে তাকে শপথ পড়ানো থেকে বিরত থাকে।

আসন্ন নির্বাচনে আসনটিতে ইশরাক হোসেনের গণসংযোগ ও পথসভা ছিল উল্লেখযোগ্য। এই প্রার্থীও নাগরিক সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন। দিচ্ছেন সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি।

গত শুক্রবার অনুষ্ঠিত এক জনসভায় ইশরাক হোসেন জানান, ভোটারদের দ্বারে তিনি যখনই যাচ্ছেন, তাদের নানা সমস্যার কথা জানতে পারছেন। সমস্যার মধ্যে গ্যাস, পানি পরিবেশসহ নানা বিষয় রয়েছে। এগুলোর দ্রুত সমাধানে পদক্ষেপ নেবেন বলেও জানান ইশরাক হোসেন।

ওই জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ১৯৯১ সালে শেখ হাসিনা সাদেক হোসেন খোকার কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। সেই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় এবারও জনগণ ইশরাক হোসেনকেই পছন্দ করবে। ইশরাক পুরান ঢাকারই সন্তান, তিনি আপনাদেরই মানুষ এবং সবসময় আপনাদের সঙ্গেই থাকবেন।

সম্প্রতি, নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ইশরাক হোসেনকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের একই আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম। ফখরুলকে ইশরাকের বিভিন্ন গণসংযোগেও অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে।

নির্বাচনকে ঘিরে পক্ষপাতমূলক ভূমিকার অভিযোগ তুলে রাজধানীর সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মশিউর রহমানকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন বিএনপি প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। একই সঙ্গে তিনি ভোটকেন্দ্র হিসেবে সূত্রাপুর এলাকার কসমোপলিটন স্কুল অ্যান্ড কলেজকে পরিবর্তনের আবেদন করেছেন।

শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব আখতার আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসব দাবি তুলে ধরেন ইশরাক হোসেন।

সরেজমিনে আসনটির চালচিত্র

jagonews24.com

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসনের মধ্যে রয়েছে পুরান ঢাকার সূত্রাপুর, ওয়ারী, গেন্ডারিয়া ও কোতোয়ালি (আংশিক) থানা। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাতজন প্রার্থী অংশগ্রহণ করছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। তার নির্বাচনি প্রতীক হলো ধানের শীষ। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মো. আব্দুল মান্নান, তার নির্বাচনি প্রতীক হলো দাঁড়িপাল্লা। জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে লাঙল প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আমির উদ্দিন আহমেদ (ডালু)।

বাংলাদেশ মুসলিম লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে হারিকেন প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মো. আক্তার হোসেন, গণফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মাছ প্রতীকে আহমেদ আলী শেখ এবং বাংলাদেশ কংগ্রেস মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ডাব প্রতীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মো. ইউনুস আলী আকন্দ।

ঢাকা-৬ আসনটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৪, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১, ৪২, ৪৩, ৪৪, ৪৫ ও ৪৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। এই আসনে এবার মোট ভোটার সংখ্যা দুই লাখ ৯২ হাজার ২৮৩ জন। যার মধ্যে এক লাখ ৫২ হাজার ৫১৯ জন পুরুষ ভোটার এবং এক লাখ ৩৯ হাজার ৭৬১ জন নারী ভোটার। এছাড়া, আসনটিতে তৃতীয় লিঙ্গের তিনজন ভোটার রয়েছেন। ১০০টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে এই আসনে।

jagonews24.com

গত কয়েকদিন সূত্রাপুর, লক্ষ্মীবাজার, সদরঘাট ও বংশাল এলাকা ঘুরে দেখা, প্রধান সড়কের দুই পাশে লাগানো হয়েছে প্রার্থীদের বড়, ছোট ও মাঝারি সাইজের বিভিন্ন ব্যানার। কিছু স্থানে বানানো হয়েছে নির্বাচনি ক্যাম্প কার্যালয়।

এসব কার্যালয় ও ব্যানারের মধ্যে কয়েকটি স্থানে নির্বাচনি আচরণবিধির সাংঘর্ষিক দৃশ্যও দেখা যায়।

সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের পাশে একটি পার্কিং স্থাপনায় বিএনপি প্রার্থীর ছবি ও পোস্টার লাগানো ক্যাম্প দেখা যায়। এর সামনে নেতাকর্মীদেরও অবস্থান করতে দেখা যায়।

যেখানে সাংগঠনিক পরিচয় হিসেবে উল্লেখ ছিল, জাতীয়তাবাদী ঘাট শ্রমিকদল ফেডারেশনের কথা। তবে উপস্থিত নেতাকর্মীরা বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

আবার ঘাটের প্রবেশ মুখে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের বিপরীত পাশের সড়কে জামায়াত প্রার্থীর একটি অস্থায়ী নিবাচনি কার্যালয় দেখা যায়। তবে সড়ক দখল নিয়ে ক্যাম্প স্থাপনে সমালোচনা হলে পরে তা সরিয়ে নেওয়া হয় বলে জানান স্থানীয়রা।

এছাড়াও সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ব্যানার ব্যবহারের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তাও উপেক্ষা করতে দেখা যায়।

নির্দেশনা বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫ এর বিধি ৭ অনুযায়ী ব্যানার ব্যবহারের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন স্পষ্টীকরণ করেছে। আনুভূমিক ও উলম্ব যেভাবেই হোক, অনধিক ১০ (দশ) ফুট বাই ৪ (চার) ফুট মাপের ব্যানার ব্যবহার করা যাবে। এই নির্দেশনাটি গত ২৯ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

তবে, এলাকাটির বিভিন্ন স্থানে দেখা যায় নির্দেশনা থেকেও বড় মাপের ব্যানার। যেমন, সুরিটোলা স্কুল, ইসলামপুর কলেজিয়েট স্কুল ও কবি নজরুল সরকারি কলেজের সামনে নির্দেশনা দেওয়া আয়তনের থেকেও জামায়াত প্রার্থীর বড় পোস্টার-ব্যানার লাগানো ছিল।

jagonews24.com

একইভাবে কবি নজরুল সরকারি কলেজের প্রধান ফটকের পাশে ও শাঁখারীবাজার মোড় এলাকায় বিএনপি প্রার্থীরও নির্দেশনা দেওয়া আয়তনের চেয়ে বড় পোস্টার-ব্যানার লাগানো ছিল।

স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রার্থীরা নির্দিষ্ট সময়ের পরেও মাইক বাজিয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন।

এমডিএএ/এএমএ/এমএমএআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।