ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. রাজনীতি

নির্বাচনের দিন সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের শিকার বিএনপি ও তারেক রহমান

জাগো নিউজ ডেস্ক | প্রকাশিত: ১০:১৮ এএম, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • নির্বাচনের দিন অপতথ্য শনাক্ত ১০৪টি
  • সব মিলিয়ে নির্বাচন ঘিরে অন্তত ১০২৪টি অপতথ্য শনাক্ত
  • ১৮ জন প্রার্থীর সরে দাঁড়ানোর ভুয়া দাবি
  • ভুয়া ফটোকার্ডে অপপ্রচার বেশি
  • সেনাবাহিনী-পুলিশ ক্রমাগত অপতথ্যের লক্ষ্যবস্তু

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই ১০৪টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার। সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের শিকার হয়েছে বিএনপি ও দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই নির্বাচন সংক্রান্ত অন্তত ১০২৪টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।

রাতের ভোট আতঙ্ক ছড়িয়ে অপতথ্য

‘দিনের ভোট রাতে নেওয়া হচ্ছে’- ক্যাপশনে এমন সমালোচনা করে একটি ভিডিও নির্বাচনের আগের রাতে বেশ ভাইরাল হয়। রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখে, এটি ২০২৪ সালের এক উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জাল ভোট দেওয়ার দৃশ্য।

আবার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ব্যালটে সিল মারা হচ্ছে। দাবি একই, রাতে ভোট হয়ে যাচ্ছে। যাচাই করে রিউমর স্ক্যানার নিশ্চিত হয় যে এটি এআই ভিডিও। ভিডিওটির ক্রিয়েটরকেও খুঁজে বের করা হয়েছে।

ভোটের আগের রাতেই শুরু, দিনভর ছিল অপতথ্যের বন্যা

বাংলাদেশের নির্বাচনি সংস্কৃতিতে রাতের ভোট নামের টার্মটি আলোচনায় আসে ২০১৮ সালে। সে বছর নির্বাচনে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র থেকে আগের রাতেই সাংবাদিকদের কাছে ভোট দিয়ে ব্যালট বাক্স ভরে রাখার অভিযোগ আসছিল। বিবিসি বাংলাসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম সে সময় বিষয়টির সত্যতাও পায়। পরের অর্থাৎ, ২০২৪ সালের নির্বাচনেও প্রাসঙ্গিক ছিল টার্মটি। এবার এটিকে কাজে লাগায় অপতথ্যের প্রচারকারীরা। অন্তত আটটি ভিডিও নির্বাচনের আগের রাতে ছড়িয়েছে যেগুলোতে রাতেই ব্যালটে সিল মারা হচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছিল। যাচাই করে দেখা যায়, এগুলো হয় আগের, নয় তো এআই কিংবা পোস্টাল ব্যালটে সিল দেওয়ার ভিডিও।

কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা বনাম মহড়ার ভিডিও

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত-সহিংসতার খবর না এলেও দেশের কয়েকটি স্থানে হামলা-পাল্টা হামলা ও সংঘর্ষ হয়েছে। এসবের মধ্যে অন্তত চারটি ভিডিও পাওয়া গেছে, যেগুলো প্রচার করে বলা হচ্ছিল ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স চুরির মতো ঘটনা ঘটছে। অথচ, অনুসন্ধানে দেখা যায় ভিডিওগুলো ১২ ফেব্রুয়ারিরই নয়। মূলত, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর মহড়ার ভিডিওকে উক্ত দাবিগুলোতে প্রচার করা হয়েছে।

ভোটের আগের রাতেই শুরু, দিনভর ছিল অপতথ্যের বন্যা

আবার, একটি ভিডিওতে দাবি করা হচ্ছিল, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে ভোটকেন্দ্র দখল চেষ্টায় ককটেল বিস্ফোরণ এবং সংঘর্ষের ঘটনার দৃশ্য এটি। রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখে, এটি ২০২১ সালের ভিডিও।

আরেকটি ভিডিওতে, জামালপুরে ভোট দিতে কেন্দ্রে না যাওয়ায় পুলিশের পাহারায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ঘর-বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর লোকজন — এমন দাবি ছিল। তবে ভিডিওটি এর এক সপ্তাহ আগে থেকেই অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে৷

ডিপফেক ভিডিওতে সরে দাঁড়ানোর দাবি

নির্বাচন থেকে প্রার্থীদের নানা কারণে সরে দাঁড়ানো একটি সাধারণ বিষয়। কিন্তু যে সরে দাঁড়ানোর ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীই ওয়াকিবহাল নন, সেটি নিঃসন্দেহে একটি অপতথ্য এবং ভোটের হিসাবেও তা স্পষ্ট প্রভাব রাখার ঝুঁকি তৈরি করে দেয়। এবারের নির্বাচনে এই ধরনের অপতথ্যের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন ১৮ জন প্রার্থী। এর মধ্যে বিএনপির চারজন, জামায়াতে ইসলামীর দুইজন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দুইজন এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একজন রয়েছেন। তবে এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি, ১০ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর নাম এসেছে। কখনও ফেসবুক পোস্ট, কখনও ভুয়া ফটোকার্ড কখনওবা এআই-ডিপফেকের ব্যবহার করে এসব প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছিল।

ভোটের আগের রাতেই শুরু, দিনভর ছিল অপতথ্যের বন্যা

পটুয়াখালী-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা হাসান মামুন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন এমন একটি দাবিও ছড়ায় ভোট গ্রহণের সময়। এই অপতথ্যটি এই আসনে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে প্রচার করতে দেখা যায় তার ফেসবুক পোস্টে।

৪৫ জন প্রার্থী ভোটের মাঠে অপতথ্যের শিকার

নির্বাচনের দিন ভোটের মাঠে ৪৫ জন সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী বিভিন্ন ধরনের অপতথ্যের শিকার হয়েছেন, তাদের জড়িয়ে মোট ৫৯টি অপতথ্যের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ প্রার্থীরা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছেন, সংখ্যায় ৪৩ জন। তারা মোট ৫৫টি অপতথ্যের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচনে লড়া তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সর্বাধিক ১২টি অপতথ্য পাওয়া গেছে। নারী প্রার্থীদের মধ্যে ২ জন প্রার্থী ৪টি অপতথ্যের সম্মুখীন হয়েছেন, যেখানে ফরিদপুর-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী শামা ওবায়েদ ইসলাম সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের শিকার হয়েছেন (৩টি)।

ভোটের আগের রাতেই শুরু, দিনভর ছিল অপতথ্যের বন্যা

অপতথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ফটোকার্ড সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে (৩৯টি), যা সহজেই বিভ্রান্তি তৈরি করতে সক্ষম ছিল নির্বাচনের মৌসুমে। এছাড়া এআই-ডিপফেক (৭টি), ভুয়া ও সম্পাদিত বক্তব্য (১৮টি), নির্বাচনি সহিংসতা সম্পর্কিত অপতথ্য (৭টি), পুরোনো ছবি বা ভিডিও (১২টি) এবং মহড়ার ভিডিও (৪টি) ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের অপতথ্য দেখা গেছে। মোটামুটি, ফটোকার্ড এবং ভিডিও কন্টেন্ট নির্বাচনি অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে।

বিএনপি-তারেক রহমান দিনভর ছিল লক্ষ্যবস্তু

নির্বাচনের দিন দলভিত্তিক অপতথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের শিকার হয়েছে। দলটিকে ঘিরে মোট ৫২টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার ৮৮ শতাংশই নেতিবাচক। ১৪ জন সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীকে লক্ষ্য করে ২৮টি অপতথ্য ছড়ানো হয়। সবচেয়ে বেশি শিকার হন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাকে নিয়ে ১২টি অপতথ্য পাওয়া গেছে, যার ৯২ শতাংশ নেতিবাচক। এসব অপতথ্যের বড় অংশ ফটোকার্ড (২৬টি) ও ভুয়া/সম্পাদিত বক্তব্য (৮টি) ঘিরে, এবং এআই ব্যবহার করে তৈরি কনটেন্টও ছিল ৩টি।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে ২১টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার ৭১ শতাংশ নেতিবাচক। আটজন প্রার্থীকে লক্ষ্য করে আটটি অপতথ্য ছড়ানো হয় এবং বিভিন্ন প্রার্থী (ডা. সুলতান আহমেদ, রেজাউল করিম, সুলতান মাহমুদ জাকারিয়া, দেলাওয়ার হোসেন, মতিউর রহমান, মোঃ মিজানুর রহমান, মাও: আবু তালেব, আবদুল্লাহ আল ফারুখ) প্রত্যেকে একটি করে অপতথ্যের শিকার হন। এখানেও ফটোকার্ড ছিল প্রধান মাধ্যম (১১টি), আর এআই-নির্ভর একটি কনটেন্ট ইতিবাচক ছিল।

এছাড়া, জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) ঘিরে ১০টি অপতথ্য পাওয়া গেছে, যার ৭০ শতাংশ নেতিবাচক। ৫ জন প্রার্থীকে নিয়ে ৬টি অপতথ্য ছড়ানো হয়। সারজিস আলম সবচেয়ে বেশি শিকার হন (২টি)। এই দলের ক্ষেত্রে ভুয়া বা সম্পাদিত বক্তব্য, ফটোকার্ড এবং এআই-সব ধরনের কৌশলই ব্যবহার করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, নির্বাচনের দিন অপতথ্য ছড়াতে ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট ও বিকৃত বক্তব্য ছিল প্রধান মাধ্যম।

ভোটের আগের রাতেই শুরু, দিনভর ছিল অপতথ্যের বন্যা

সেনা বিদ্রোহ আর ডিএমপি কমিশনারের ভোট দিতে না পারা নিয়ে গুজব

নির্বাচনের আগের রাতে ফেসবুকে এক পোস্টে দাবি করা হচ্ছিল, সেনা সদরদপ্তরে উত্তাল পরিস্থিতি, বিদ্রোহ করেছে সেনাবাহিনীর একাংশ। পোস্টটি ৫ হাজারের বেশি এনগেজমেন্ট পায়, কপি-পেস্ট হতে থাকে শেয়ার৷ আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) রিউমর স্ক্যানারকে জানায়, এমন কিছুই ঘটেনি।

আরেকটি বেশ ভাইরাল ভিডিওতে দাবি করা হয়, ডিএমপি কমিশনার এসএম সাজ্জাত আলী অভিযোগ করেছেন তার ভোট ভিন্ন ব্যক্তি দিয়ে দিয়েছেন। অনুসন্ধানে নেমে দেখা যায়, এ সংক্রান্ত তার পুরো বক্তব্যের ভিডিওটি প্রচার না করে ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তির সৃষ্টি করা হয়। মূলত, ডিএমপি কমিশনার বৃহস্পতিবার গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে কথা বলার সময় ২০১৮ সালের নির্বাচনের স্মৃতিচারণ করে জানান, সেসময় তিনি ভোট প্রদান করতে এসে শোনেন তার ভোট ভিন্ন ব্যক্তি দিয়ে দিয়েছেন। ২০১৮ সালের অংশটি কেটে ভিডিওটি এখনও ছড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

নির্বাচনের দিন নিরাপত্তা বাহিনী কেন্দ্রিক অপতথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সর্বাধিক অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিয়ে-মোট ১২টি। সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে নিয়ে ২টি অপতথ্য দেখা গেছে। এছাড়া বাংলাদেশ পুলিশকে কেন্দ্র করে ৪টি এবং শেখ সাজ্জাত আলীকে নিয়ে ১টি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে।

এমএমএআর