‘মেলবোর্নের আবহাওয়া বনাম বাংলাদেশের রাজনীতি’
ছবি-এআই দিয়ে বানানো
গত সপ্তাহে মেলবোর্নে তাপমাত্রা ছুঁয়েছিল ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পরে জানা গেলো, কোথাও কোথাও তা ৪৭-৪৮ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠেছিল। অসহনীয় গরম দিনে তবে সূর্য ডুবলেই গরম কমে যায়। তার পরদিনই তাপমাত্রা নেমে এলো ২৬ ডিগ্রিতে, সঙ্গে ফুরফুরে বাতাস। এরপর থেকে কয়েক দিন একদমই স্বাভাবিক, সহনীয় তাপমাত্রা।
হঠাৎ গতকাল আবার একটু গরম গেলো, তবে বিকেলে ঝিরঝিরি বৃষ্টি ছিল। আজ আবার বেশ ঠান্ডা, সঙ্গে দমকা ঝড়ো বাতাস- যেন সবকিছু উড়িয়ে নিয়ে যাবে! এই হলো মেলবোর্নের আবহাওয়া; ক্ষণে ক্ষণে বদলে যায়, কখনো একদিনেই চার-পাঁচ রকম রূপ। ঠিক যেন এখনকার বাংলাদেশের রাজনীতি। কখন যে কোন দিকে রূপ নেয়, বোঝা বড়ই মুশকিল।
ছোটবেলায় শুনতাম, ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই।’ আরেকটু বড় হয়ে শুনেছি; ‘রাজনীতি আর আগের মতো নেই, এতে পলিটিক্স ঢুকে গেছে।’ আজ বড়বেলায় এসে মনে হচ্ছে, এই কথাগুলো শুধু কথার কথা ছিল না, বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি ছিল। বরং এখন মনে হয়, এর সঙ্গে আরেকটা বাক্য যোগ করা যায়: ‘বাংলাদেশের রাজনীতি মেলবোর্নের আবহাওয়ার মতোই; ক্ষণে ক্ষণে বদলায়।’
পহেলা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, রোববার। ভাষার মাস। এই মাসে মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়ে শহীদ হয়েছেন বাংলার মানুষ। এই মাসে বইমেলা হয়, রঙিন মাস ফাল্গুন আসে, ভালোবাসা দিবস উদযাপিত হয়। এ বছর এই মাসেই পবিত্র শব-ই-বরাত এবং সিয়াম সাধনার মাস রমজান শুরু হবে। এসবের পাশাপাশি এই মাসে, ১২ ফেব্রুয়ারি, অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের বহুল আকাঙ্ক্ষিত জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন, প্রত্যাশা এবং উৎকণ্ঠা; কোনোটাই কম নয়। কে জানে, কী আছে বাংলাদেশের ভাগ্যে!
দক্ষিণ এশিয়ার এই ছোট্ট দেশটি মাথাপিছু আয়ে স্বল্প, গড়পড়তা আটপৌড়ে জীবনে অভ্যস্ত, অত্যন্ত আবেগপ্রবণ এবং প্রবল হুজুগে জাতি হিসেবে পরিচিত। এই জাতি ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে’ ভালোবাসে এবং নিজের ক্ষতি করে হলেও অন্যের ভালো কখনো মন্দ, দুটোই করতে বেশ ওস্তাদ।
এমন এক বাস্তবতায় নির্বাচনে দাঁড়ানো প্রার্থীরা কতটা সুবিধায় আছেন বা কতটা চাপে, তা দূরে বসে বোঝা কঠিন। তবে অনুমেয়; পরিস্থিতি মোটেই সহজ নয়।
তবে এসবের মাঝে সবচেয়ে বড় দোটানায় পড়েছেন কারা, বলুন তো?
‘দেশের আপামর জনগণ।’
তারাই পড়েছেন মহাবিপদে। কারণ, অপশনের গোলকধাঁধা! আপনারা আসলে কাকে ভোট দেবেন? চিরাচরিত স্রোতে গা ভাসাবেন, নাকি নিজের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেশটাকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন? ভোটটা কার বাক্সে যাবে?
যেখানে সমাজের অপেক্ষাকৃত বুদ্ধিমানরাই নির্বাচন নিয়ে গোলমেলে অবস্থায়, সেখানে দেশের সাধারণ জনগণ কী করবেন?
সাধারণ মানুষ কাকে ভোট দেবেন? মুখোশের আড়ালে থাকা সন্ত্রাসীকে? চাঁদাবাজকে? যোগ্যতাহীন পরিবারতন্ত্রকে জিইয়ে রাখা রাজনীতিকে? ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা দলকে? প্রবীণ ধ্যানধারণা পোষণকারী বয়স্ক রাজনৈতিক নেতাকে? প্রত্যেক নির্বাচনের সময় ভোল পাল্টানো সুবিধাভোগীকে? দোষ-গুণে ভরা উচ্ছল তরুণ প্রার্থীকে? দল ছেড়ে আসা বা দলবিমুখ স্বতন্ত্র প্রার্থীকে? প্রকৃত ধার্মিক, যিনি ধর্মের ন্যায়, শান্তি ও সমতা সমাজে বাস্তবায়ন করতে চান; তাকে? নাকি হুট করে লাইমলাইটে আসা কোনো ‘ভাইরাল সেলিব্রিটি’কে, যার সঙ্গে রাজনীতির কোনো দূরতম সম্পর্কও নেই!!
নির্বাচন এলেই একটি কথা খুব করে শোনা যায়- ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি দেব।’ কথাটা ঠিক। কিন্তু এর সঙ্গে আরেকটা লাইন যোগ করা মনে হয় জরুরি: সেটা হলো ‘আমার ভোট আমি দেব, এলাকার সবচেয়ে যোগ্য মানুষকে দেব।’
প্রতিটি ভোট অমূল্য। কোনো দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়, কোনো ব্যক্তির প্ররোচনাও নয়, হুজুগেও নয়। আপনার বিবেচনায় এলাকায় যিনি সবচেয়ে যোগ্য, শিক্ষিত, বিচক্ষণ, ভদ্র এবং সুনামসম্পন্ন প্রার্থী; যিনি সংসদে গেলে দেশের উপকার হবে, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে; কোনো প্রাথীর প্রতি আপনার হৃদয়ে যদি এমন বিশ্বাস জন্মায়, আপনার ভোটটা তাকেই দিন। যিনি সংসদে গেলে আপনার এলাকার কথা বলবেন, দেশের হয়ে কথা বলবেন, দেশের পতাকা হাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শিক্ষিত, সচেতন ও যোগ্য মানুষের অংশগ্রহণ আজ অত্যন্ত জরুরি। এর কোনো বিকল্প নেই। সেই প্রার্থী যে দলেরই হোক বা স্বতন্ত্র হোক, মূল্যায়নটা হোক মানুষ দেখে।
মনে রাখবেন, দলের চেয়ে দেশ বড়। রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশ ভালোভাবে চললে, দেশের মানুষ এমনিতেই ভালো থাকবেন। তাই, ‘দল দেখে নয়, মানুষ দেখে ভোট দিন।’
ভোট দেওয়ার সময় বিচক্ষণতার পরিচয় দিন। তাতে নিজের অন্তরে শান্তি পাবেন, পাশাপাশি সমাজেও দায়িত্বশীলতার চর্চা বাড়বে। আবেগ নয়, বিবেক দিয়ে ভোট দিন। ভোট প্রদানে আপনার এই বিচক্ষণতাই দিনশেষে আপনাকে মানসিক শান্তি দেবে।
এমআরএম/এমএস