ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. ধর্ম

ওয়াহিদুদ্দিন খান (রহ.)

রোজার প্রকৃত মর্ম ও উদ্দেশ্য

ইসলাম ডেস্ক | প্রকাশিত: ০৬:৫৫ পিএম, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

তর্জমা: মওলবি আশরাফ

রাসুল (সা.) বলেন, ইসলামের ভিত্তি হচ্ছে পাঁচটি: (১) এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল। (২) নামাজ কায়েম করা। (৩) জাকাত আদায় করা। (৪) হজ পালন করা। (৫) রমজান মাসে রোজা রাখা। (সহিহ বুখারি: ৮)

এই হাদিস অনুযায়ী ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি। একটি ভবন যেমন কয়েকটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তেমনই একজন মুসলমানের জীবনও এই পাঁচটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। সাদা চোখে এগুলো নির্দিষ্ট কিছু আমলের নাম—কয়েকটি বাক্য উচ্চারণ করা, রুকু-সেজদা করা, নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ প্রদান করা, কাবাঘরে গিয়ে এক ধরনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা, রমজানে সারাদিন পানাহার থেকে বিরত থাকা। কিন্তু প্রতিটি আমলের আড়ালে একটি মর্ম ও উদ্দেশ্য আছে। আল্লাহ আমাদের কাছে কেবল বাহ্যিক আমল চান না, বরং সেই মর্ম ও উদ্দেশ্য সমেত প্রকৃত আমল চান।  

দুনিয়ার প্রতিটি জিনিসেরই দুটো দিক আছে, একটি বাহ্যিক, আরেকটি নিগূঢ়। উদাহরণ হিসেবে মোবাইল ফোনের কথা ধরা যায়। মোবাইল ফোনের একটি বাহ্যিক রূপ আছে—যেটি হাতে ধরা যায়। কিন্তু তার উদ্দেশ্য শুধু হাতে থাকা নয়; বরং যোগাযোগ স্থাপন। আপনি যদি বলেন, ‘আমার হাতে একটি মোবাইল ফোন আছে’, এর মানে আপনার যোগাযোগ করার ক্ষমতা আছে, দূরের কোনো মানুষের সাথে চাইলে আপনি কথা বলতে পারেন।

ইসলামের এই পাঁচ ভিত্তির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এগুলো তখনই প্রকৃত অর্থে ইসলামের ভিত্তি হবে, যখন এর বাহ্যিক রূপের সাথে মর্ম ও উদ্দেশ্য যুক্ত হবে। কেননা আত্মাহীন প্রাণ জড়বস্তু ছাড়া অন্যকিছু নয়।

যেমন প্রথম ভিত্তি ঈমানের কথাই যদি বলি, এর বাহ্যিক রূপ হলো কালেমা উচ্চারণ করা। কিন্তু এর স্পিরিট হলো হৃদয়ের গভীর থেকে থেকে এই স্বীকৃতি দেওয়া যে—আল্লাহ তাআলাই একমাত্র উপাস্য, তার প্রতিটি গুণবাচক নাম সত্য, এবং হজরত মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ নবী ও রাসুল। যখন এই সত্য হৃদয়ে প্রবেশ করে, তখন মানুষের চিন্তা ও চরিত্র বদলে যায়। কিন্তু একজন মুখে কালেমা বলল, কিন্তু হৃদয় দিয়ে তা বিশ্বাস করল না, এবং তার চিন্তা ও চরিত্রেও পরিবর্তন এলো না, তাহলে তাকে কি মুসলমান বলা যায়?

একইভাবে রোজার একটি দিক হলো সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাওয়া, পান করা ও যৌনকাজ থেকে বিরত থাকা। কিন্তু কেবল এই কাজগুলোই রোজা নয়। বরং রোজা সব নিষিদ্ধ কাজ থেকে বেঁচে থাকা এবং নিজের ভেতরে সহিষ্ণুতা তৈরি করা—অপ্রিয় বিষয় সহ্য করা, অভিযোগ উপেক্ষা করা, সংযমী থাকা। প্রকৃত রোজাদার তিনিই, যার চরিত্রে ধৈর্য স্থায়ী গুণে পরিণত হয়।

যারা রোজাকে শুধু বাহ্যিকভাবে গ্রহণ করে, তারা নির্দিষ্ট সময় বা নির্দিষ্ট রীতিতে আমল করবে, কিন্তু জীবনের অন্য ক্ষেত্রে এর প্রভাব দেখা যাবে না। তারা কালেমা পড়বে, কিন্তু বাস্তবে সত্য সামনে এলে তা মেনে নিতে পারবে না—কারণ হৃদয়ে ইমানের স্পিরিট নেই। তারা মসজিদে নামাজ পড়বে, কিন্তু মানুষের সাথে আচরণে বিনয় দেখাবে না—কারণ নামাজের রুহ তাদের মধ্যে প্রবেশ করেনি। তারা জাকাত দেবে, কিন্তু লেনদেনে স্বচ্ছতা থাকবে না—কারণ তাদের মাঝে আমানতদারিতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠার মানসিকতা জন্মায়নি। তারা হজ করবে, কিন্তু মানুষের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে ঐক্য বজায় রাখতে প্রস্তুত হবে না—কারণ হজের শিক্ষা হৃদয়ে পৌঁছায়নি। তারা রোজা রাখবে, কিন্তু সামান্য কারণেই ধৈর্য হারাবে—কারণ রোজার আসল উদ্দেশ্য অর্জিত হয়নি।

যে ব্যক্তি ইসলামের এই পাঁচ ভিত্তিকে গ্রহণ করে, সে মুসলমান হিসেবে গণ্য হয় এবং আল্লাহর রহমতের আশা করতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে—এই ভিত্তিগুলো কেবল বাহ্যিকভাবে নয়, তার মর্ম ও উদ্দেশ্য সহকারেই চাওয়া হয়েছে। যে সওয়াব ও পুরস্কারের ওয়াদা দেওয়া হয়েছে, তা পরিপূর্ণভাবে আদায় করলে দেওয়া হবে; আধাআধি আদায় করলে দেওয়া হবে না।

ওএফএফ

আরও পড়ুন