ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. ধর্ম

ওয়াহিদুদ্দিন খান (রহ.)

বরকতের মাস রমজান

ইসলাম ডেস্ক | প্রকাশিত: ০৪:২২ পিএম, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

রমজান মাস সব ধরনের কল্যাণ ও বরকতের মাস। এ মাসে রোজাদার একদিকে যেমন শারীরিক সুস্থতা লাভ করে, তেমনই আরেকদিকে রুহানি পবিত্রতা, অর্থনৈতিক প্রশস্ততা এবং নানান প্রকারের বরকত লাভ করে। আল্লাহমুখী মানুষের জন্য রমজানের আগমন অনেকটা বসন্তের আগমনের মতো—যেখানে নতুন প্রাণ, নতুন সম্ভাবনা এবং নতুন সমৃদ্ধির সূচনা ঘটে।

হাদিসে আছে, আল্লাহর রাসুল (সা.) যখন রমজানের চাঁদ দেখতেন, তিনি এই দোয়া করতেন, হে আল্লাহ, তুমি ওই চাঁদকে আমাদের ওপর উদিত করো নিরাপত্তা, ইমান, শান্তি ও ইসলামের সাথে। (হে চাঁদ) আমার ও তোমার প্রতিপালক আল্লাহ। (রিয়াযুস সালেহিন: ১২২৮)

এ থেকে বোঝা যায়, রমজানের মূল উদ্দেশ্য মানুষের অন্তরে ইমান, ইসলাম, শান্তি ও নিরাপত্তাবোধ জাগিয়ে তোলা। রোজার প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে মানুষের ভেতরে আধ্যাত্মিক ও মানবিক গুণাবলি জাগ্রত করা হয় যাতে সে সারা বছর এমন জীবনযাপন করতে পারে, যেখানে একদিকে আল্লাহর সাথে তার ইমানি সম্পর্ক দৃঢ় থাকবে, আর অন্যদিকে মানুষের মাঝে সে শান্তি ও নিরাপত্তার উৎস হয়ে উঠবে। অর্থাৎ সে আল্লাহর উত্তম বান্দা এবং সমাজের দায়িত্বশীল সদস্য উভয়ই হতে পারবে।

হাদিসে সেহরি খাওয়ার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, তোমরা সেহরি খাও, কেননা সেহরিতে বরকত আছে। (সহিহ বুখারি: ১৯২৩)

ফজরের আগে জাগ্রত হওয়া, রোজার নিয়ত করা এবং শেষ আহার হিসেবে সেহরি গ্রহণ করা গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। এগুলো আসলে রোজার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। আধুনিক ভাষায় বলা যায়—এ যেন মাইন্ডের প্রোগ্রামিং। এর ফলে মানুষ মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে যায়, যাতে সকাল থেকে সন্ধ্যা রোজার কষ্ট সহজে সহ্য করতে পারে। সাধারণ দিনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খাবার না পেলে মানুষ অস্থির হয়ে পড়ে; কিন্তু রমজানে সে পুরো মাস এই অবস্থাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারে কারণ তার মন আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে যায়।

হাদিসে বলা হয়েছে, রোজা (মন্দকাজের বিরুদ্ধে) ঢালের মতো। (সহিহ বুখারি, ১৯০৪) অধিকাংশ অন্যায়ের মূল কারণ মানুষের ভেতরের কয়েকটি রিপু। (যাকে ষড়রিপু বলা হয়) কেউ যদি একটু উল্টা-পাল্টা কথা বলে, মানুষ তখন রাগ প্রকাশ করে তার প্রতিক্রিয়া দেখায়। রোজা এই প্রবণতার বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণ সৃষ্টি করে। ক্ষুধা ও সংযমের অভিজ্ঞতা মানুষের নফসকে দুর্বল করে এবং ইবাদতের পরিবেশ তার আত্মিক শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। ফলে মানুষ প্রতিক্রিয়াশীল মনোভাব থেকে বাঁচতে শেখে; রাগের কারণ উপস্থিত থাকলেও রাগে বিস্ফোরিত হয় না। রমজানের খাদ্যসংযম তাকে বছরের বাকি সময়ের জন্য নৈতিক সংযমশীল মানুষে পরিণত করে।

দিনভর নামাজ, সদকা, দোয়া, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির ও আল্লাহর স্মরণে সময় অতিবাহিত করে রোজাদার সন্ধ্যায় ইফতার করে। এই ইফতার যেন রোজার ওপর আল্লাহর তাৎক্ষণিক পুরস্কার। সারাদিনের সংযমের পর খাদ্য ও পানীয় লাভের যে আনন্দ, তা আখেরাতে আল্লাহর চিরস্থায়ী পুরস্কার লাভের বৃহত্তর আনন্দের প্রতীক।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রোজার সময় মানুষের আমলের সওয়াব সাধারণ সময়ের তুলনায় অধিক বৃদ্ধি পায়। কারণ রোজার অবস্থায় মানুষের আত্মিক অবস্থা উন্নত হয়। সে যে আমলই করে, তা গভীর অনুভূতি ও আন্তরিকতার সাথে সম্পন্ন হয়। আর আমলের মান যত উন্নত হয়, তার প্রতিদানও তত বৃদ্ধি পায়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বভাবগতভাবেই অত্যন্ত দানশীল ছিলেন; কিন্তু রমজান মাসে তার দানশীলতা আরও বৃদ্ধি পেত। এখান থেকেই রোজার প্রকৃত স্পিরিট বোঝা যায়। রোজা মানুষের মধ্যে কষ্টের অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করে যাতে সে অভাবগ্রস্ত মানুষের কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। অন্যকে সহায়তা করা ইসলামের মৌলিক দায়িত্ব, আর রোজা মানুষের ভেতরে সেই দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে।

নিজেকে অভাবী অবস্থায় রাখার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে এই অনুভূতি জেগে উঠে যে যারা অভাবগ্রস্ত, না জানি তাদের প্রতিদিন ক্ষুধায় কত কষ্ট হয়। ফলে রমজানে মানুষ অধিক উৎসাহে দান-সদকা করতে থাকে। এভাবে রমজান শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মাস নয়; বরং পুরো সমাজের জন্য অর্থনৈতিক বরকতের মাসে পরিণত হয়। সমাজ থেকে দারিদ্র্যের চাপ অনেকাংশে লাঘব হয়।

রোজার বরকত প্রথমে রমজান মাসেই প্রকাশ পায়। এরপর তার প্রভাব বছরের বাকি মাসগুলোতেও জারি থাকে। রমজান সরাসরি বরকতের মাস, আর বছরের অন্য মাসগুলো পরোক্ষভাবে সেই বরকতের ধারাবাহিক ফল ভোগ করে।

তর্জমা: মওলবি আশরাফ

ওএফএফ

আরও পড়ুন