ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. ধর্ম

শবে কদর

যে রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম

ইসলাম ডেস্ক | প্রকাশিত: ১২:৩৮ পিএম, ১৩ মার্চ ২০২৬

আহমাদ সাব্বির

রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এই মাসের মধ্যেই এমন একটি মহিমান্বিত রাত রয়েছে, যা আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য অগণিত কল্যাণ ও বরকতের উৎস হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। সেই রাত হলো লাইলাতুল কদর—একটি রাত, যা কোরআনের ঘোষণা অনুযায়ী হাজার মাস চেয়েও উত্তম। এই রাতের মর্যাদা ও তাৎপর্য এতই মহান যে, কোরআনুল কারিমে একাধিক স্থানে এর আলোচনা এসেছে এবং বিশেষভাবে একটি পূর্ণ সুরা—সুরা কদরের—মাধ্যমে এ রাতের মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে।

কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী লাইলাতুল কদর হলো একটি বরকতময় রাত। সুরা দুখানে আল্লাহ তাআলা বলেন, এই রাতে প্রতিটি প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় নির্ধারণ করা হয় এবং মানুষের কল্যাণের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহ অবতীর্ণ হয়। (সুরা দুখান: ৩-৫) অর্থাৎ এই রাত কেবল ইবাদতের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং মানব ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণকারী এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবেও তা বিবেচিত।

সুরা কদরে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি লাইলাতুল কদরে। তুমি কি জানো লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হাজার মাস থেকে উত্তম। এ রাতে ফেরেশতাগণ ও জিবরাইল তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে প্রতিটি বিষয় নিয়ে অবতরণ করেন। আর এ রাত ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত শান্তিময়।’ (সুরা কদর: ১-৫) এই আয়াতগুলো থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, লাইলাতুল কদর এমন এক রহস্যময় ও মহিমান্বিত সময়, যার প্রকৃত মর্যাদা মানুষের উপলব্ধিরও ঊর্ধ্বে।

এই রাতের সর্বোচ্চ মর্যাদার অন্যতম কারণ হলো—এ রাতেই কুরআন অবতরণের সূচনা হয়েছিল। মানব ইতিহাসের এক মহিমান্বিত মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য পথনির্দেশিকা হিসেবে কোরআন নাজিল করা শুরু করেন। সেই সময় প্রথম যে আয়াত নাজিল হয়েছিল তা ছিল মানুষের চিন্তা ও বিবেককে জাগ্রত করার আহ্বান—‘পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা আলাক: ১) এই আহ্বান ছিল মানুষের দীর্ঘ অজ্ঞানতা ও গাফলতের ঘুম ভাঙানোর আহ্বান। এভাবে পৃথিবীর সঙ্গে আসমানের যোগাযোগ শুরু হয় এবং পরবর্তী তেইশ বছর ধরে তা অব্যাহত থাকে।

এই দীর্ঘ সময় ছিল রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দাওয়াতি জীবনের সময়। এ সময়ের মধ্যে কোরআন মানুষের জন্য সঠিক আকীদা-বিশ্বাস, ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা এবং উন্নত নৈতিকতার শিক্ষা প্রদান করে। কোরআনের মাধ্যমে মানুষের জীবনে এমন সব নীতি প্রতিষ্ঠিত হয় যা মানবসমাজে ন্যায়বিচার, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করে। তাই বলা যায়, লাইলাতুল কদর মানবসভ্যতার এক নতুন যুগের সূচনালগ্ন।

সাহাবায়ে কেরাম এই মহিমান্বিত সময়ের গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইন্তেকালের পর একদিন হজরত আবু বকর (রা.) হযরত ওমরকে (রা.) নিয়ে উম্মে আইমানের কাছে গেলেন। সেখানে গিয়ে তারা দেখলেন, উম্মে আইমান কাঁদছেন। তারা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, আল্লাহর কাছে যা আছে তা রাসুলের জন্য উত্তম। তখন উম্মে আইমান বললেন, তিনি রাসুলের ইন্তেকালের কারণে কাঁদছেন না; বরং কাঁদছেন এই কারণে যে, এখন আসমান থেকে ওহি অবতরণের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। এ কথা শুনে আবু বকর ও ওমরও (রা.) আবেগে আপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলেন। এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, ওহি অবতরণের মুহূর্তগুলো কতটা মূল্যবান ছিল এবং তা মানুষের হৃদয়ে কত গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

লাইলাতুল কদরের মাধ্যমে মানবজীবনের প্রকৃত পথনির্দেশনা শুরু হয়। এই রাতের মাধ্যমে মানুষের মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে সুস্পষ্ট ঘোষণা আসে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।’ (সুরা বনী ইসরাইল: ৭০) অর্থাৎ ইসলাম মানুষের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্থানে উন্নীত করেছে। ইসলাম ঘোষণা করেছে যে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব কোনো বংশ, বর্ণ বা জাতিগত পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না; বরং প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভর করে তাকওয়া ও আল্লাহভীতির ওপর। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই বেশি সম্মানিত যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।’ (সুরা হুজুরাত: ১৩)

লাইলাতুল কদরের অর্থ সম্পর্কে ইমাম মুহাম্মদ আবদুহু (রহ.) বলেন, ‘কদর’ শব্দটি হয়তো তাকদির অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, কারণ এই রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর দ্বীন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা শুরু করেন। আবার ‘কদর’ শব্দের অর্থ হতে পারে মর্যাদা ও সম্মান, কারণ এই রাতে নবুয়তের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মর্যাদা উচ্চকিত করা হয়। যে অর্থই গ্রহণ করা হোক না কেন, এ রাত যে অসাধারণ মর্যাদার অধিকারী—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

অনেক আলেমের মতে লাইলাতুল কদর সাতাশে রমজানের রাত হতে পারে। তবে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে এ রাত অনুসন্ধান করতে হবে। এতে একটি বিশেষ হিকমত রয়েছে। যদি নির্দিষ্টভাবে একটি রাত নির্ধারিত হয়ে যেত, তাহলে মানুষ হয়ত কেবল সেই রাতেই ইবাদতে মনোযোগ দিত। কিন্তু এখন শেষ দশকের বহু রাতেই মানুষ ইবাদতের জন্য জেগে থাকে।

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেও রমজানের শেষ দশককে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। তিনি এই সময় অধিক ইবাদত করতেন, রাত জেগে থাকতেন এবং পরিবারকেও ইবাদতের জন্য জাগিয়ে তুলতেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, যখন রমজানের শেষ দশক শুরু হতো, তখন নবীজি (সা.) অন্য সব ব্যস্ততা বাদ দিয়ে সম্পূর্ণভাবে ইবাদতে আত্মনিয়োগ করতেন।

সাহাবায়ে কেরামও এই রাতকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতেন। অনেক ধনী সাহাবি গোপনে দরিদ্রদের সাহায্য করতেন। তারা কখনো কখনো রাতে ছদ্মবেশে দরিদ্র পরিবারের দরজায় খাবার, পোশাক ও অর্থ রেখে আসতেন, যাতে সাহায্যপ্রাপ্ত ব্যক্তি লজ্জা অনুভব না করে। এটি ইসলামের এক মহান আদর্শ—দান এমনভাবে করা যাতে দাতার পরিচয় প্রকাশ না পায় এবং গ্রহীতার সম্মান অক্ষুণ্ণ থাকে।

লাইলাতুল কদর মানুষের আত্মিক উন্নতি, নৈতিক শুদ্ধি এবং সামাজিক কল্যাণের এক মহান প্রেরণা। এই রাত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে আল্লাহর নুর পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছিল মানুষের পথপ্রদর্শনের জন্য। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত এই রাতের গুরুত্ব উপলব্ধি করা, ইবাদত-বন্দেগি ও মানবকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করা।

ওএফএফ

আরও পড়ুন