হাদিসের গল্প
ওপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম
ছবি: জেমিনি এআই
হাকিম ইবনে হিজাম (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একবার আমি রসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কাছে সম্পদ চাইলাম। তিনি আমাকে কিছু দিলেন। আমি আবার চাইলে তিনি আবার দিলেন। তারপর তিনি আমাকে বললেন, এই ধন-সম্পদ সবুজ-শ্যামল ও সুস্বাদু। যে ব্যক্তি তা নিস্পৃহ মনে (লোভ ছাড়া) গ্রহণ করে, তাতে তাকে বরকত দেওয়া হয়। আর যে ব্যক্তি তা লালসার সাথে গ্রহণ করে, তাতে তাকে বরকত দেওয়া হয় না; তার অবস্থা ওই ব্যক্তির মত, যে খাবার খায় কিন্তু পেট ভরে না। মনে রাখবেন, ওপরের হাত অর্থাৎ দানকারীর হাত নীচের হাত বা দান গ্রহণকারীর হাতের চেয়ে অনেক উত্তম।
আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! ওই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যের বাণী দিয়ে পাঠিয়েছেন, আপনার পর পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার আগে আমি আর কারো কাছ থেকে কিছুই গ্রহণ করব না।
পরবর্তীতে আবু বকরের (রা.) খেলাফতকালে তিনি হাকিমকে (রা.) কিছু দেওয়ার জন্য ডাকলে তিনি তা নিতে অস্বীকার করতেন।
ওমরের (রা.) খেলাফতকালে তিনি তাকে কিছু দেওয়ার জন্য ডাকলে তিনি তাও নিতে অস্বীকৃতি জানান। তখন ওমর (রা.) উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমি আপনাদের সাক্ষী রাখছি, আমি তার প্রাপ্য গণিমতের সম্পদ তাকে দিচ্ছি, কিন্তু তিনি তা নিতে অস্বীকার করছেন।
এরপরও হাকিম ইবনে হিজাম (রা.) ওমরের (রা.) কাছ থেকে কোনো সম্পদ নেননি। নবীজির (সা.) ওফাতের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হাকিম (রা.) আর কারো কাছ থেকে কিছুই গ্রহণ করেননি। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
এই হাদিস থেকে যে শিক্ষাগুলো আমরা পাই:
১. অল্পে তুষ্টি ও আত্মমর্যাদাবোধ
অভাব না থাকলে অন্যের কাছে হাত পাতা না পেতে নিজের কাছে যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা এবং অন্যের সম্পদের প্রতি লোভ না করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
২. দুনিয়ার মোহ থেকে বাঁচতে হবে
দুনিয়ায় বেঁচে থাকা ও জীবনধারণের জন্য সম্পদ প্রয়োজনীয় জিনিস। তাই বৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জন করার চেষ্টা নিষিদ্ধ নয়, বরং নিজের ফরজ দায়িত্বগুলো পালন করার জন্য অনেক ক্ষেত্রে সম্পদ উপার্জন করা ফরজ। কিন্তু দুনিয়ার সম্পদের মোহে পড়া যাবে না। সম্পদের পেছনে পড়ে আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদত থেকে গাফেল হওয়া যাবে না। অবৈধ বা অনৈতিকভাবে সম্পদ লাভের চেষ্টা করা যাবে না।
৩. যে সম্পদে বরকত দান করা হয়
মানুষ যখন দুনিয়ায় চলার উপায় হিসেবে নিজে পরিশ্রম করে সম্পদ উপার্জন করে, আল্লাহ তাআলা সেই সম্পদে বরকত দান করেন। অল্প সম্পদেই তার প্রয়োজন পূরণ হয় এবং সে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে। কিন্তু যে ব্যক্তি সম্পদের মোহে পড়ে যায়, যে কোনো ভাবে শুধু সম্পদ বৃদ্ধি করার চেষ্টা করে, তার সম্পদ থেকে বরকত উঠে যায়। যত বেশি সম্পদই লাভ করুক, সে অতৃপ্ত ও অভাবী থেকে যায়, অভাবী মানুষের মত আচরণ করে।
৪. ওপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘ওপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম।’ অর্থাৎ, অন্যের কাছে হাত পাতার চেয়ে অন্যের সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দেওয়া বা দান করা অনেক বেশি উত্তম কাজ। তাই একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো, নিজে পরিশ্রম করে সম্পদ উপার্জন করে নিজের প্রয়োজন পূরণ করা এবং সাধ্যানুযায়ী দান-সদকা করা। পরিশ্রম করে উপার্জনের সামর্থ্য বা সম্পদ থাকার পরও মানুষের কাছে হাত পাতা মুসলমানের কাজ হতে পারে না।
৫. নেক কাজের দৃঢ় সংকল্প
হাকিম ইবনে হিজাম (রা.) থেকে আমরা শিখি, সত্য উপলব্ধি করার পর তা জীবনে বাস্তবায়নের জন্য কঠোর সংকল্প করা উচিত। তিনি নবীজির (সা.) উপদেশ শুনে আমৃত্যু আর কারো কাছে কিছু না চাওয়ার যে শপথ করেছিলেন, তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন।
ওএফএফ