ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. ধর্ম

ড. আহমদ আলী

ইসলামে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরা কতটা গ্রহণযোগ্য?

ইসলাম ডেস্ক | প্রকাশিত: ০৩:০৪ পিএম, ২৯ মার্চ ২০২৬

ফেসবুকে বাংলাদেশিদের মধ্যে কাউকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরা নিয়ে চলমান আলোচনা ও বিতর্কের প্রেক্ষাপটে এ বিষয়ে ফেসবুকে নিজের অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসর ইসলামি আইন ও বিচার জার্নালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ড. আহমদ আলী। তার ফেসবুক পোস্টটি জাগো নিউজের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

ড. আহমদ আলী লিখেছেন,

"সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ও আমাদের আলেমসমাজের আলোচনার প্রধান উপজীব্য হয়ে উঠছে। এমনকি এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে একপক্ষ অপর পক্ষের প্রতি কঠোর ও অশোভন সমালোচনায় লিপ্ত হচ্ছেন—যা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত।

সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত এমন একটি বিষয় হলো—কারো পেছন থেকে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরা।

বলার অপেক্ষা রাখে না, ইসলামি শরীয়তে পারস্পরিক সম্পর্কের সৌন্দর্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করার জন্য কিছু প্রতিষ্ঠিত সুন্নত রয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো—সাক্ষাতের সময় এক মুসলিমের অন্য মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে মুসাফাহা করা এবং দীর্ঘ সফর শেষে ফিরে এলে মুআনাকা (আলিঙ্গন) করা।

এসব আচরণ পারস্পরিক ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও আন্তরিকতার উৎকৃষ্ট প্রকাশ। বস্তুত, এটাই হলো সুন্নাহসম্মত ও অধিক প্রচলিত শালীন পদ্ধতি।

তবে সমাজে মাঝে মাঝে এমন কিছু চর্চাও দেখা যায়—বিশেষত ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে—যেখানে হঠাৎ পেছন দিক থেকে এসে কাউকে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসা প্রকাশ করা হয়।

কখনো আবার বন্ধুমহলে এমন খুনসুটির রীতিও দেখা যায় যে, একজন পেছন থেকে এসে অন্য জনের চোখ ঢেকে দেয়। এ ধরনের আচরণ সাধারণত আন্তরিকতা, সখ্য ও হাস্যরসেরই বহিঃপ্রকাশ।

যদিও এগুলো ব্যাপকভাবে প্রচলিত কোনো আনুষ্ঠানিক রীতি নয়, তবুও ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো সরাসরি অবৈধ নয়; বরং কিছু শর্তসাপেক্ষে এগুলো বৈধতার পরিসরের মধ্যেই গণ্য হয়। যেমন—এতে কারও মধ্যে অস্বস্তি বা ভীতির সঞ্চার না হওয়া, শালীনতা বজায় থাকা এবং কোনো প্রকার কামনা-বাসনা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা।

এ প্রসঙ্গে ইসলামী ফিকহের একটি মৌলিক নীতি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক: الأصل في الأشياء الإباحة—অর্থাৎ কোনো বস্তু বা আচরণের মূল বিধান হলো বৈধতা, যতক্ষণ না তার নিষিদ্ধ হওয়ার পক্ষে সুস্পষ্ট দলীল পাওয়া যায়।

এই নীতির আলোকে বলা যায়, পেছন থেকে জড়িয়ে ধরার মতো আচরণও বৈধতার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে যদি তা নিছক ভালোবাসা, বন্ধুত্ব বা স্বাভাবিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ হয় এবং এর সঙ্গে কোনো ধরনের কামনা-বাসনা বা অনৈতিক উদ্দেশ্য জড়িত না থাকে।

এ প্রসঙ্গে মুসনাদ আহমদে বর্ণিত একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা উল্লেখযোগ্য। সাহাবি জাহের (রা.) বাজারে পণ্য বিক্রি করছিলেন। নবী (সা.) তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। একদিন তিনি পেছন থেকে এসে তাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরলেন যে তিনি তাকে দেখতে পাচ্ছিলেন না। প্রথমে সাহাবি বুঝতে না পেরে বললেন, আমাকে ছেড়ে দিন, কে আপনি? পরে যখন তিনি নবীকে (সা.) চিনতে পারলেন, তখন আনন্দে নিজের পিঠ আরও দৃঢ়ভাবে তাঁর বুকে লাগিয়ে দিলেন। তখন নবী (সা.) স্নেহভরে রসিকতার ছলে বললেন, এই বান্দাকে কে কিনবে?—এর মাধ্যমে তিনি তার মর্যাদা ও তার প্রতি স্নেহ প্রকাশ করেন। তারপর নবীজি (সা.) বলেন, তুমি আল্লাহর কাছে অমূল্য। (মুসনাদে আহমদ)

এই হাদিস থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহী দিক স্পষ্ট হয়:

  • প্রথমত, পেছন থেকে জড়িয়ে ধরা মূলত অবৈধ নয়; কারণ নবী (সা.) নিজেই তা করেছেন। এটি ‘আসল ইবাহাহ’ নীতির বাস্তব প্রয়োগ নির্দেশ করে এবং প্রমাণ করে যে, নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে ভালোবাসা প্রকাশের এমন রূপ বৈধ হতে পারে।
  • দ্বিতীয়ত, এটি ছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত ও আবেগপূর্ণ ঘটনা, যেখানে কোনো ভয়, অপমান বা অস্বস্তির উপাদান ছিল না; বরং তা ছিল গভীর স্নেহের প্রকাশ। এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত নিহিত রয়েছে—যদি এমন আচরণে অপর ব্যক্তি ভীত, বিব্রত বা অস্বস্তিতে পড়ে, তাহলে তা আর বৈধতার মধ্যে থাকবে না।
  • তৃতীয়ত, এ হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, পেছন থেকে জড়িয়ে ধরা ভালোবাসার একটি গ্রহণযোগ্য প্রকাশ হতে পারে এবং বিশেষ প্রেক্ষাপটে তা অনুশীলনও করা যেতে পারে—তবে শর্ত হলো, তা সম্পূর্ণভাবে কামনামুক্ত, শালীন এবং পারস্পরিক সম্মতির পরিসরে হতে হবে।
  • চতুর্থত, এ ধরনের আচরণ বৈধ হলেও একে সাধারণ সুন্নাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সঙ্গত নয়। বরং প্রচলিত সুন্নাহ হলো—সামনাসামনি সাক্ষাৎ করা, মুসাফাহা করা এবং ক্ষেত্রবিশেষে আলিঙ্গন করা।”

ওএফএফ

আরও পড়ুন