আবিসিনিয়ায় প্রথম হিজরত
আবিসিনিয়ায় প্রথম হিজরত ছবি: জেমিনি এআই
মক্কা জীবনের একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক অথচ তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হলো মুসলমানদের আবিসিনিয়ায় হিজরত। ইসলামের সূচনালগ্নে যখন মক্কার কোরাইশরা নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাওয়াতকে প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা নিরীহ মুসলমানদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন শুরু করে। এই নির্যাতন কেবল শারীরিক নয়, বরং সামাজিক বয়কট, অর্থনৈতিক নিপীড়ন এবং মানসিক নির্যাতনের এক ভয়াবহ সমষ্টি ছিল। এই কঠিন পরিস্থিতিতে মুসলমানদের ইমান রক্ষা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে। তখন মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর নির্দেশে মুসলমানদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করেন এবং তাদের আবিসিনিয়ায় হিজরত করার অনুমতি দেন।
নবুওয়াতের পঞ্চম বছর অর্থাৎ প্রায় ৬১৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম হিজরতের ঘটনা ঘটে। এই দলে ছিলেন এগারো জন পুরুষ ও চারজন নারী। তারা গোপনে মক্কা ত্যাগ করে শুআইবা বন্দর দিয়ে সমুদ্রপথে আবিসিনিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তাদের মধ্যে ছিলেন ওসমান ইবনে আফফান (রা.) এবং তাঁর স্ত্রী রুকাইয়া (রা.), যিনি ছিলেন নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কন্যা। এ ছাড়াও ছিলেন আবু হুজাইফা, আবু সালামা, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, আব্দুর রহমান ইবনে আওফ, মুসআব ইবনে উমায়েরসহ আরও অনেক সাহাবি। তারা সবাই নিজেদের জন্মভূমি, আত্মীয়স্বজন ও সম্পদ ত্যাগ করে শুধুমাত্র ইমান রক্ষার জন্য এই কঠিন যাত্রা শুরু করেন।
এই হিজরত কেবল একটি ভৌগোলিক স্থানান্তর ছিল না; বরং এটি ছিল বিশ্বাসের স্বাধীনতার জন্য এক সাহসী পদক্ষেপ। মুসলমানরা এমন এক দেশে আশ্রয় নেন, যা ছিল ন্যায়পরায়ণ একজন খ্রিস্টান বাদশাহ নাজাশির শাসনাধীন। নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেই তার ন্যায়পরায়ণতার কথা উল্লেখ করে মুসলমানদের সেখানে যেতে উৎসাহিত করেছিলেন।
সাহাবিরা আবিসিনিয়ায় গিয়ে বসবাস শুরু করার কিছুদিন পর সেখানে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, মক্কার সব মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। এই খবর শুনে কিছু মুসলমান মক্কায় ফিরে আসেন। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন; বরং নির্যাতন আরও বেড়ে গিয়েছিল। ফলে নবুওয়াতের ষষ্ঠ বছরে দ্বিতীয়বারের মতো মুসলমানরা আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। এবার প্রায় ৮৩ জন নারী-পুরুষ এই দলে অংশগ্রহণ করেন। এই দলে নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চাচাতো ভাই হজরত জাফর ইবনে আবি তালিবও (রা.) ছিলেন, যিনি পরবর্তীতে এই হিজরতের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে পরিণত হন।
মক্কার কুরাইশ নেতারা যখন দেখল যে, মুসলমানরা তাদের নির্যাতন থেকে বাঁচতে একটি নিরাপদ আশ্রয় পেয়ে গেছে, তখন তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। তারা চাইল মুসলমানদের আবার মক্কায় ফিরিয়ে এনে শাস্তি দিতে। এজন্য তারা দুইজন চতুর প্রতিনিধি—আমর ইবনে আস ও আব্দুল্লাহ ইবনে আবি রাবিয়াকে—আবিসিনিয়ায় পাঠায়। তারা বাদশাহ নাজাশির দরবারে গিয়ে নানা উপঢৌকন প্রদান করে তাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। শুধু তাই নয়, তারা সেখানকার ধর্মীয় নেতাদেরও উপহার দিয়ে নিজেদের পক্ষে টেনে নেয়।
তারা বাদশাহর কাছে অভিযোগ করে যে, এই মুসলমানরা তাদের পলাতক দাস, যারা নিজেদের ধর্ম ত্যাগ করে নতুন একটি ধর্ম তৈরি করেছে। তারা অনুরোধ করে মুসলমানদের তাদের হাতে ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু ন্যায়পরায়ণ নাজাশি একতরফা সিদ্ধান্ত না নিয়ে মুসলমানদের বক্তব্য শোনার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মুসলমানদের দরবারে ডেকে পাঠান।
এই সংকটময় মুহূর্তে মুসলমানরা হযরত জাফরকে (রা.) তাদের মুখপাত্র হিসেবে নির্বাচিত করেন। জাফর (রা.) অত্যন্ত প্রাঞ্জল, হৃদয়গ্রাহী ও যুক্তিনির্ভর ভাষায় ইসলামের মূল বার্তা তুলে ধরেন। তিনি মক্কার জাহেলি সমাজের চিত্র বর্ণনা করেন—যেখানে মানুষ মূর্তি পূজা করত, অন্যায়-অত্যাচারে লিপ্ত ছিল এবং দুর্বলদের ওপর জুলুম চালাত। এরপর তিনি ইসলামের শিক্ষা ব্যাখ্যা করেন, যা মানুষকে সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা এবং আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করতে শেখায়।
এরপর তিনি সূরা মারইয়ামের কিছু আয়াত তেলাওয়াত করেন, যেখানে হযরত ঈসা (আ.) ও তাঁর মা মারইয়াম (আ.)-এর পবিত্র জীবনের বর্ণনা রয়েছে। এই তিলাওয়াত শুনে বাদশাহ নাজাশি ও তার দরবারের খ্রিস্টান পুরোহিতরা গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হন। বলা হয়, তাদের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে থাকে। নাজাশি বুঝতে পারেন এটা সত্য ও ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত ধর্ম।
ফলে তিনি মুসলমানদের নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং কুরাইশদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এতে কুরাইশ প্রতিনিধিরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং পরের দিন নতুন ষড়যন্ত্র করে। তারা বাদশাহর কাছে অভিযোগ করে যে, মুসলমানরা হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে এমন কিছু বিশ্বাস করে, যা খ্রিস্টানদের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।
আবারও মুসলমানদের দরবারে ডাকা হয়। মুসলমানরা পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেন যে, তারা সত্য গোপন করবেন না। জাফর (রা.) স্পষ্টভাবে বলেন যে, ইসলামের মতে ঈসা (আ.) আল্লাহর বান্দা ও রাসুল, তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত এক বিশেষ রূহ ও কালিমা, যা মারিয়ামের (আ.) গর্ভে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল।
নাজাশি এই বক্তব্য শুনে বলেন, আপনারা যা বলছেন, তা-ই সত্য। ঈসা (আ.) সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাসও এর চেয়ে ভিন্ন নয়। এভবে মুসলমানদের অবস্থান আবিসিনিয়ায় আরও সুদৃঢ় হয় এবং কোরাইশদের ষড়যন্ত্র সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।
এই ঘটনায় হযরত জাফরের (রা.) প্রজ্ঞা, সাহস ও বাগ্মিতা যেমন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তেমনি বাদশাহ নাজাশির ন্যায়পরায়ণতাও ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে স্থান পায়। অন্যদিকে মক্কার মুশরিকদের ষড়যন্ত্র, মিথ্যাচার ও স্বার্থপরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আবিসিনিয়ায় হিজরত আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা—যখন সত্যের পথে চলতে গিয়ে প্রতিকূলতা আসে, তখন ধৈর্য, ত্যাগ ও আল্লাহর ওপর ভরসাই হলো সফলতার চাবিকাঠি। এটি আমাদের শেখায়, ইমান রক্ষার জন্য প্রয়োজনে দেশ, সম্পদ ও আরাম-আয়েশ ত্যাগ করতেও দ্বিধা করা উচিত নয়। একইসঙ্গে এটি আমাদের আশ্বস্ত করে যে, পৃথিবীর কোথাও না কোথাও আল্লাহ এমন মানুষ সৃষ্টি করে রেখেছেন, যারা সত্যকে চিনতে পারে এবং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায়।
ওএফএফ