মিজানুর রহমান আজহারী
ইসলামে সম্প্রীতির অনন্য বার্তা
মিজানুর রহমান আজহারী
জনপ্রিয় আলেম ও ওয়ায়েজ ড. মিজানুর রহমান আজহারী সম্প্রতি তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ‘ইসলামে সম্প্রীতির অনন্য বার্তা’ শিরোনামে নিজের আলোচনার একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন।
ওই আলোচনায় মিজানুর রহমান আজহারী বলেন:
আমরা মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, পাহাড়ি, নৃগোষ্ঠী, মিলেমিশে একাকার। আমরা সবাই মিলে বাংলাদেশ। আমাদের পারস্পরিক সম্প্রীতি, ভালোবাসা, সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ, বোঝাপড়া বেশ মজবুত। তবে মাঝে মাঝে আমাদের এই সম্প্রীতির ভেতরে অনেকে ফাটল ধরাতে চায়। আমরা যে সুখে আছি, শান্তিতে আছি, এটা অনেকের ভালো লাগে না। দুর্বৃত্তদের ব্যাপারে আমাদের সাবধান থাকতে হবে। আমরা সঙ্গবদ্ধ থাকবো।
আমাদের দেশে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে পিসফুল কো-এক্সিস্টেন্স বা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান রয়েছে। যে দিন হিন্দুদের পূজা অনুষ্ঠান আমরা ওই দিন তাফসীর মাহফিল করি না। যে দিন আমাদের তাফসীরুল কোরআনের প্রোগ্রাম ওই দিন আমাদের হিন্দু ভাইরা ডিস্টার্ব করে না। হিন্দুদের পূজা অনুষ্ঠানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি মাদ্রাসার ছাত্ররাও গিয়ে পাহারা দেয়। গোটা পৃথিবীতে এ রকম দৃষ্টান্ত আপনি কম পাবেন।
রাব্বুল আলামীন বলেন, ‘ও আমার ইমানদার বান্দারা শোন, ও আমার বিশ্বাসী বান্দারা, আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা যেসব দেব-দেবীর পূজা করে, তোমরা খবরদার তাদের গালি দিও না। যদি ওই দেবতাদেরকে গালি দাও, তাহলে ভুলবশত শত্রুতাবশত তারা তোমাদের রব আল্লাহকে গালি দেবে।’ সুতরাং কোনো ধর্মকে ছোট করা যাবে না। অন্য ধর্মকে ছোট করা মানে ইসলামকে ছোট করা। আর অন্য ধর্মের দেবতাকে যদি আপনি গালি দেন, ওরা ইসলাম থেকে দূরে সরে যাবে। যারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল, তারা আর কোনো দিন ইসলামের ধারে কাছে আসবে না।
আমরা তো মুসলমান-মুসলমান মিলেমিশে থাকতে পারি না। আমরা দুই মুসলিম ভাই একসাথে বসে চা খেতে পারি না, গল্প করতে পারি না। অথচ বিশ্বনবী (সা.) মুশরিকদের সঙ্গে সন্ধি করেছেন—হুদাইবিয়ার সন্ধি। মদিনায় হিজরতের পর তিনি সবা ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে 'মদিনা চার্টার' বা মদিনা সনদ করলেন। ইসলাম অন্য ধর্মের প্রতি সহনশীলতা শিক্ষা দেয়। অন্য ধর্মের প্রতি সহনশীলতার উত্তম দৃষ্টান্ত যদি আপনি দেখতে চান, তবে ইসলামের নবী বিশ্বনবীর দিকে তাকান।
আমরা তো সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করার জন্য কত আইন বানাই, কত বৈঠক করি, কত সংবাদ সম্মেলন করি। বিশ্বনবী (সা.) সংখ্যালঘুদের অধিকারের ব্যাপারে যে কথা বলেছেন, শুনলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন। তিনি বলেন, ‘খবরদার জেনে রেখো, কেউ যদি কোনো সংখ্যালঘুর ওপর অত্যাচার করে, কষ্ট দেয়, কোনো সংখ্যালঘুকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, কিংবা কোনো সংখ্যালঘুর সম্পদ যদি কেউ জোর করে কেড়ে নেয়, আমি কেয়ামতের দিন ওই সংখ্যালঘুর পক্ষে আর অত্যাচারী মুসলমানের বিপক্ষে বাদী হয়ে দাঁড়াবো।’
আপনি নামাজি, আপনি মুসল্লি, আপনি হাজি সাহেব, তাহাজ্জুদ পড়তে পড়তে কপালে দাগ ফেলে দিয়েছেন; আর আপনার প্রতিবেশী হিন্দু দেখে ভাবছেন আমার তো পাওয়ার আছে, ওর জমিটা দখল করি! বিশ্বনবী (সা.) বলেন, কেয়ামতের দিন ওই হিন্দুর পক্ষে তোর বিরুদ্ধে আমি বাদী হয়ে দাঁড়াবো।
এখানেই শেষ নয়, আপনাকে অমুসলিম প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো আচরণ করতে বলা হয়েছে। প্রতিবেশী হিন্দু হলে কি তাকে কষ্ট দেবেন? না, ও তো হিন্দু, ও তো আমার আল্লাহকে ডাকে না—এ কথা বলে তাকে কষ্ট দেওয়া জায়েজ হবে না। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, যে আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস করে সে যেন তার প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো আচরণ করে। প্রতিবেশী আস্তিক হোক বা নাস্তিক হোক, মুসলিম হোক বা অমুসলিম হোক; তারা অসুস্থ হলে একটু আপেল, আঙ্গুর বা কমলা নিয়ে যান। তাদের সাথে ভালো আচরণ করেন। ইসলামের সৌন্দর্য দেখে তারা অবাক হবে। নসিব ভালো হলে কোনো দিন কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যাবে।
ইসলাম অমুসলিম মাতা-পিতার সাথে ভালো আচরণ করতে বলেছে। মাতা-পিতা অমুসলিম হলে তাদের ফেলে দিতে পারবেন না। অনেক হিন্দু ছেলে আমাদের হাতে কালেমা পড়ে মুসলিম হয়, কিন্তু ওর মা-বাবা হয়ত মুসলমান হয় নাই। আল্লাহ বলেন, তোমাদের জন্য দুইটা ভারডিক্ট অবধারিত—এক, আল্লাহর এবাদত করবে এবং দুই, মা-বাবার প্রতি ইহসান করবে। মা হিন্দু বা বৌদ্ধ হোক, তার সাথে ভালো আচরণ করতে হবে। তুমি এখন মুসলিম, তোমার মা-বাবা হিন্দু; এখনই তো সুযোগ ইসলামের সৌন্দর্য দেখানোর। মা-বাবা যদি দেখে যে, ছেলে হিন্দু থাকতে বেয়াদব ছিল, কিন্তু এই ধর্মে আসার পর সে পাল্টে গেছে, অনেক বিনয়ী হয়ে গেছে, তাহলে নসিব ভালো হলে তারাও কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যাবে।
ইসলাম কি ন্যারো-মাইন্ডেড রিলিজিয়ন? না, এটা ব্রড-মাইন্ডেড। বিশ্বনবী (সা.) অমুসলিমদের উপহার গ্রহণ করতেন। সপ্তম হিজরীতে তিনি তৎকালীন সব সুপার পাওয়ারের কাছে চিঠি দিলেন—রোমান সম্রাট, পারস্য অধিপতি, মিশরের অধিপতির কাছে। চিঠির ভাষা ছিল—‘মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহর পক্ষ থেকে মিশরের বাদশার কাছে। ইসলাম গ্রহণ করো, শান্তিতে থাকবে। শান্তি তার জন্য যে হেদায়েতের অনুসরণ করে।’ এই চিঠি অনেকে ভালোভাবে গ্রহণ করেছে এবং জবাবে উপহার পাঠিয়েছে। অমুসলিম কেউ যদি আপনাকে হালাল উপহার দেয়, আপনি তা গ্রহণ করতে পারবেন।
বিশ্বনবী (সা.) অমুসলিমদের সাথে ফিনান্সিয়াল ডিলিংস বা আর্থিক লেনদেনও করেছেন। প্রয়োজনে আপনিও তা করতে পারবেন। বাজারের মিষ্টির দোকান বা নাপিতের দোকান—অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাদের হিন্দু ভাইদের থাকে। আপনি তাদের কাছ থেকে সেবা নিতে পারবেন, দই-মিষ্টি কিনতে পারবেন।
বিশেষ প্রয়োজনে ইসলামের স্বার্থে অমুসলিমদের সাপোর্ট নেয়াও জায়েজ। পলিটিক্যাল সাপোর্ট বা পলিটিক্যাল এসাইলাম নেওয়া জায়েজ। আমাদের অনেক বিশ্ববরণ্য দাঈরা আমেরিকায় এসাইলাম নিয়ে থাকেন। নিজের দেশে গেলে হয়ত ফাঁসি হয়ে যাবে। স্বয়ং বিশ্বনবী (সা.) পলিটিক্যাল সাপোর্ট নিয়েছিলেন অমুসলিমদের কাছ থেকে। তায়েফে দাওয়াত দিতে গিয়ে তিনি যখন রক্তাক্ত হলেন, মক্কায় ঢোকার জায়গা পাচ্ছিলেন না, তখন তিনি জায়েদকে পাঠিয়ে অনেকের কাছে সাহায্য চাইলেন। কেউ তাকে আশ্রয় দিতে রাজি হলো না। শেষে তিনি বললেন—মুতইম ইবনে আদির কাছে যাও।
শত্রুদের ভেতরেও আল্লাহ অনেককে দাঁড় করিয়ে দেন যে তাঁর দ্বীনের জন্য সহায়ক হয়। আল্লাহ মুতইম ইবনে আদির মন নরম করে দিলেন। মুতইম বললেন, মুহাম্মাদ, আমি তোমাকে আশ্রয় দেব। এই মুতইম কিন্তু মুসলিম ছিলেন না, মুশরিক ছিলেন। কিন্তু তিনি যে উপকার করেছেন, তা বিশ্বনবী ভোলেননি। তাই অমুসলিম হলেই কেউ আমাদের শত্রু নয়। আমাদের পুঁজি হচ্ছে ভালোবাসা। ভালোবাসা দিয়ে আমরা বিশ্ব জয় করতে চাই।
ওএফএফ