সালামের ফজিলত ও আদব
সালামের ফজিলত ও আদব
ইলিয়াস মশহুদ
মানুষ সামাজিক জীব, তাই সামাজিক বন্ধন ও ভ্রাতৃত্ববোধ অটুট রাখার জন্য ইসলাম একে অপরের প্রতি সম্ভাষণ জানানোর এমন চমকপ্রদ বাক্য ও পদ্ধতি শিখিয়েছে, যা অপরিচিত মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের সেতুবন্ধন রচনা করে; আর পরিচিত ব্যক্তির সম্পর্ককে করে অধিকতর সুদৃঢ়। শুধু তা-ই নয়, ইসলামের এই অভিবাদন পদ্ধতি পারস্পরিক মনোমালিন্য ও শত্রুতার মনোভাব দূর করে সম্প্রীতি ও বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে। সালামের মাধ্যমে সমাজে ছড়িয়ে পড়ে শান্তি-সম্প্রীতির আলো। সর্বোপরি ইসলামের রীতি মোতাবেক পারস্পরিক যে সালাম বিনিময় হয়, তা গতানুগতিক ও অন্তঃসারশূন্য কোনো বাক্য নয়; বরং সালাম হচ্ছে একে অপরের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা কামনায় বিশেষ দোয়া, যাতে রয়েছে আল্লাহ তাআলার কাছে অবারিত শান্তি, অফুরন্ত রহমত ও বরকত লাভের আবেদন।
সালামের গুরুত্ব ও ফজিলত
পবিত্র কোরআন এবং হাদিসে সালামের গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, যারা আমার আয়াতসমূহে ইমান আনে, তারা যখন আপনার কাছে আসে, তখন আপনি তাদের বলুন, সালাম অর্থাৎ তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। (সুরা আনআম: ৫৪)
এ আয়াতে রাসুলকে (সা.) সম্বোধন করে উম্মতকে এ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, যখন এক মুসলিম অপর মুসলিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তখন শান্তি ও রহমত কামনার মাধ্যমে উভয়েই বন্ধুত্ব ও আনন্দ প্রকাশ করবে।
আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেন, লোকসকল, তোমরা সালামের প্রচার করো, ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়াও, আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখো এবং লোকে যখন (রাতে) ঘুমিয়ে থাকে, তখন নামাজ পড়ো। তাহলে তোমরা নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (সুনানে তিরমিজি: ২৪৮৫)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেন, তোমাদের কেউ যখন নিজের কোনো মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, তখন সে যেন তাকে সালাম করে। এরপর যদি তাদের মধ্যে গাছ, প্রাচীর কিংবা পাথরের আড়াল পড়ে যাওয়ার পর পুনরায় সাক্ষাৎ হয়, তাহলে যেন আবারও তাকে সালাম দেয়। (সুনানে আবু দাউদ: ৬৭৮)
ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.) বলেন, একবার নবীজির মজলিসে এসে একব্যক্তি ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে সালাম দিলে নবীজি তার সালামের উত্তর দিলেন। লোকটি তখন মজলিসে বসে পড়ল। তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘দশ’ (অর্থাৎ তুমি ১০ নেকি পেলে)। এরপর আরেকজন এসে ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ বলে সালাম দিল। রাসুল (সা.) তার সালামের উত্তর দিলেন। লোকটি তখন মজলিসে বসে পড়ল। এবার রাসুল (সা.) বললেন, ‘বিশ’ (অর্থাৎ, তুমি ২০টি নেকি পেলে)। এরপর তৃতীয় আরেকজন এসে ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু’ বলে সালাম দিল। রাসুল (সা.) তার সালামের উত্তর দিলেন। লোকটি তখন মজলিসে বসে পড়ল। এবার তিনি বললেন, ‘ত্রিশ’ (অর্থাৎ, তুমি ৩০টি নেকি পেলে)। (সুনানে আবু দাউদ: ৫১৯৫)
দুইজন মুসলমানের দেখা হলে প্রথম যে সালাম দেয়, সে বেশি সওয়াব লাভ করে। রাসুল (সা.) আগে সালাম দেওয়ার প্রশংসা করে বলেন, যে আগে সালাম দেয়, সে অহংকার থেকে মুক্ত। (শুআবুল ইমান লিল বায়হাকি: ৮৪০৭)
রাসুল (সা.) ছোট-বড় সবাইকে আগে আগে সালাম দিতেন। এমন কি নিজের মেয়ে ফাতেমাকেও তিনি আগে সালাম দিতেন। এখন অনেকে সালাম নেওয়ার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে থাকেন। বয়সে বা মর্যাদায় ছোটদের সালাম করাকে মর্যাদাহানি বলে মনে করে। অথচ হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সালাম দেওয়ার ক্ষেত্রে ছোট-বড়, ধনী-গরিব কোনো ভেদাভেদ নেই। সমগ্র সৃষ্টিকুলের শ্রেষ্ঠ ও সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী রাসুল (সা.) ছোট-বড় সবাইকে আগে সালাম দিয়ে সেই শিক্ষাই দিয়েছেন।
সালাম বিনিময়ে কৃপণ ব্যক্তি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, মানুষের মধ্যে সবচেয়ে অক্ষম ওই ব্যক্তি, যে দোয়া করতে অক্ষম হয়। আর মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কৃপণ ওই ব্যক্তি, যে সালাম প্রদানে কার্পণ্য করে। (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪৪৬৫)
সালাম দেওয়ার আদব
- কথার আগেই সালাম দেওয়া; এটিই উত্তম।
- পথচারীকে আরোহী ব্যক্তি, দাঁড়ানো ব্যক্তিকে পথচারী, অবস্থানকারীকে আগন্তুক, বেশিসংখ্যককে কমসংখ্যক এবং বেশি বয়সীকে কম বয়সীর আগে সালাম দেওয়া উত্তম।
- একাধিক ব্যক্তি সম্মিলিতভাবে অবস্থানকালে একজন সালাম দিলে সকলের পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যাবে।
- সম্মিলিতভাবে অবস্থানরতদের উদ্দেশ্যে সালাম দিলে তাদের একজন জবাব দিলে সকলের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে।
- সালামের জবাব সালামদাতাকে শুনিয়ে দেওয়া।
- সালাম বিনিময়ের সময় হাত কপালে না ঠেকানো এবং মাথা না ঝুঁকানো।
- খালি ঘরে প্রবেশকালে ‘আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল বাইত’ পড়া।
সালাম শান্তি ও নিরাপত্তার দোয়া। কেউ যখন ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ’ বলে, সে সামনে থাকা ব্যক্তির জন্য তিনটি দোয়া করে; ১. তোমার ওপর শান্তি নাজিল হোক, ২. তোমার ওপর রহমত নাজিল হোক, ৩. তোমার ওপর বরকত নাজিল হোক। যদি একবারের সালামও কোনো মুসলমানের ব্যাপারে আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়, তাহলে তার জীবনটাই স্বার্থক হয়ে যায়।
সালাম শান্তি ও বন্ধুত্বের বার্তা। দুইজন মানুষের সাক্ষাতের সময় যে জিনিসটি বেশি কাঙ্ক্ষিত তা হলো, পরস্পরের নিরাপত্তা, একজন অপরজনকে কষ্ট না দেওয়া। সাক্ষাতের সময় সালামের মাধ্যমে এ বার্তা দেওয়া হয় যে, আমি তোমার জন্য নিরাপদ, ক্ষতিকর বা কষ্টদায়ক নই।
ওএফএফ