জাল হাদিস চেনা যায় যেভাবে
জাল হাদিস চেনা যায় যেভাবে ছবি: ফ্রিপিক
রায়হান আল ইমরান
ইসলামে আহকাম বা শরঈ বিধানের অন্যতম উৎস হলো নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত সুন্নাহ বা হাদিস। কোনো কথা হাদিস হিসেবে বলা হলেই তা নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য—এমনটি নয়। নবীজি (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের পরের যুগ থেকেই কিছু লোক অসৎ উদ্দেশ্যে মনগড়া বাণী হাদিস হিসেবে প্রচার করেছে, যেগুলোকে বলা হয় মাওজু বা জাল হাদিস। প্রশ্ন হলো, কীভাবে বোঝা যায় কোনটি জাল আর কোনটি নির্ভরযোগ্য হাদিস?
জাল হাদিস যথাযথভাবে নিরূপণ করা মূলত মুহাদ্দিস ও বিশেষজ্ঞ আলেমদের কাজ। তারা সনদ ও মতন বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারেন কোন হাদিসটি বানোয়াট বা জাল। তাই জাল হাদিসের চর্চা ও এর ওপর আমল করা থেকে বাঁচতে সাধারণ মুসলমানদের জন্য সহজ ও কার্যকর উপায় হলো নির্ভরযোগ্য আলেমদের থেকে বা নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ থেকে হাদিস গ্রহণ করা, অনির্ভরযোগ্য উৎস থেকে হাদিস শুনলেই সেটাকে হাদিস মনে করা থেকে বিরত থাকা, বরং নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই করে নেওয়া।
এরপরও হাদিস যাচাইয়ের নিম্নোক্ত পদ্ধতি ও জাল হাদিস চেনার উপায়গুলো জানা থাকলে সাধারণ মুসলমানরাও জাল হাদিস সামনে পড়লে অন্তত সন্দেহে পড়বেন এবং নির্ভরযোগ্য উৎস যাচাই করার চেষ্টা করবেন। সাধারণ পাঠকদের জন্য মুহাদ্দিসগণের জাল হাদিস চেনার কিছু পদ্ধতি সহজ ভাষায় তুলে ধরলাম।
হাদিসের সনদ বিশ্লেষণ
কোনো হাদিস যাদের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে অর্থাৎ নবীজির (সা.) যুগ থেকে পরবর্তী যুগসমূহে যাদের থেকে যারা হাদিসটি শুনেছেন, পরবর্তীদের শুনিয়েছেন তাদের নামের তালিকাকেই বলা হয় সনদ। হাদিসের সনদ বিশ্লেষণ জাল হাদিস চেনার অন্যতম উপায়। যদি দেখা যায় হাদিসের সনদে অনির্ভরযোগ্য, দুর্বল স্মৃতিশক্তির অধিকারী বা মিথ্যাবাদী কোনো ব্যক্তি রয়েছেন, তার সময়ে শুধু তার সূত্রেই হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে, তাহলে বর্ণনাকারীর অবস্থা অনুযায়ী হাদিসটিকে দুর্বল, অতি দুর্বল বা জাল গণ্য করা হয়। (আল ওয়াজউ ফিল হাদিস)
হাদিসের মতন বিশ্লেষণ
শুধু সনদ যাচাই যথেষ্ট নয়; হাদিস গ্রহণ করার জন্য মুহাদ্দিসরা মতন বা বক্তব্যও যাচাই করেন। যদি কোনো হাদিসের বক্তব্য কোরআনের সুস্পষ্ট শিক্ষার বিরোধী হয়, মুতাওয়াতির হাদিসের বিপরীত হয়, উম্মাহর ঐকমত্যের (ইজমা) বিরুদ্ধে যায়, ইসলামের মৌলিক কোনো নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হয় না। (নুজহাতুন নজর)
যেমন একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘পৃথিবীর বয়স সাত হাজার বছর এবং আমরা সপ্তম হাজারে অবস্থান করছি।’ মুহাদ্দিসগণ এ হাদিসটি গ্রহণ করেননি। কারণ এ ধরনের কথা কোরআনের সেই আয়াতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যেখানে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই কেয়ামতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে।’ (সুরা লোকমান: ৩৪)
জালকারীর স্বীকারোক্তি
অনেক সময় হাদিস যিনি বানিয়েছেন, তিনি নিজেই স্বীকার করেন যে তিনি হাদিসটি বানিয়েছেন। এ ধরনের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতেও অনেক সময় মুহাদ্দিসরা কোনো হাদিসকে জাল সাব্যস্ত করেছেন। (মুকাদ্দিমাতু ইবনিস সালাহ)
ভাষার অস্বাভাবিকতা
রাসুলুল্লাহর (সা.) ভাষা ছিল সহজ, প্রাঞ্জল ও গভীর অর্থবহ। নবীজির (সা.) কথায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা, অতিরঞ্জন বা কৃত্রিম অলংকার থাকতো না। তাই কোনো হাদিসে যদি অস্বাভাবিক শব্দচয়ন বা অতিরঞ্জন দেখলে মুহাদ্দিসগণ ওই হাদিসকে জাল হাদিস বলে সন্দেহ করতেন এবং সনদ ও অন্যান্য লক্ষণ যাচাই করে জাল সাব্যস্ত করতেন। (মুকাদ্দিমাতু ইবনিস সালাহ)
বর্ণনাকারীর দাবির অসংগতি
কিছু হাদিসে বর্ণনাকারীর বক্তব্যের মধ্যে অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়। যেমন তিনি এমন কারো কাছ থেকে হাদিস বর্ণনার দাবি করেন, যিনি তার জন্মের আগেই ইন্তেকাল করেছেন, অথবা যার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই। এ ধরনের অসঙ্গতি হাদিসের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কারণ সনদে প্রত্যেক বর্ণনাকারীর মধ্যে বাস্তব ও প্রমাণযোগ্য সংযোগ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সনদে এ রকম ত্রুটিসহ অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতেও মুহাদ্দিসগণ হাদিসকে দুর্বল, অতি-দুর্বল বা জাল সাব্যস্ত করেছেন। (আল ওয়াজউ ফিল হাদিস)
প্রাচীন প্রামাণ্য গ্রন্থে অনুপস্থিতি
কোনো হাদিসের প্রচুর প্রয়োগক্ষেত্র ও সনদ থাকার পরও যদি নির্ভরযোগ্য ও প্রাচীন হাদিস ও ফিকহের গ্রন্থসমূহে হাদিসটির উল্লেখ না পাওয়া যেত, তাহলে মুহাদ্দিসগণ ওই হাদিসকে জাল বলে সন্দেহ করতেন এবং অন্যান্য লক্ষণ ও প্রমাণ পাওয়া গেলে দুর্বল বা জাল সাব্যস্ত করতেন। কারণ গুরুত্বপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হাদিস সাধারণত মুহাদ্দিস ও ফকীহদের গ্রন্থগুলোতে পাওয়া যেত। (আল ওয়াজউ ফিল হাদিস)
সূত্রহীন বর্ণনা
হাদিসের বিশ্বাসযোগ্যতার মূল ভিত্তি হলো সনদ বা সূত্র। যদি কোনো হাদিস সম্পূর্ণভাবে সনদবিহীন বর্ণিত হয়, তাহলে মুহাদ্দিসরা ওই হাদিসকে অগ্রহণযোগ্য ও জাল সাব্যস্ত করতেন।
যেমন একটি বর্ণনায় এসেছে, ‘আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি গুপ্ত ভাণ্ডার ছিলাম; আমার ইচ্ছে হলো পরিচিত হওয়ার। তাই আমি মাখলুকাত সৃষ্টি করলাম, যেন আমি (তাদের মধ্যে) পরিচিতি হই।’
এই বর্ণনা সম্পর্কে প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, এই হাদিসের শক্তিশালী বা দুর্বল কোনো ধরনের সনদ পাওয়া যায়নি। (আল ওয়াজউ ফিল হাদিস)
অপ্রতিসম সওয়াব বা শাস্তির ঘোষণা
জাল হাদিসে প্রায়ই দেখা যায়, অতি সামান্য আমলের জন্য অস্বাভাবিক বড় পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, অথবা খুব ছোট ভুলের জন্য অত্যন্ত কঠোর শাস্তি ঘোষণা করা হয়। এসব বর্ণনা অনেক সময় মানুষের আবেগকে প্রভাবিত করার উদ্দেশে তৈরি করা হয়ে থাকে। মুহাদ্দিসগণ এ ধরনের বর্ণনা বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করতেন এবং অন্যান্য লক্ষণ ও প্রমাণ পাওয়া গেল দুর্বল বা জাল সাব্যস্ত করতেন। (আল ওয়াজউ ফিল হাদিস)
ওএফএফ