ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. খেলাধুলা

তবে কি ইতালির সাফল্যের সূর্য অস্ত গেল?

আরিফুর রহমান বাবু | প্রকাশিত: ০৭:০৩ পিএম, ০১ এপ্রিল ২০২৬

যেহেতু এবার নিয়ে টানা তৃতীয়বার ইতালি বিশ্বকাপের বাইরে, তাই কেউ কেউ এটাকে খুব বড় খবর মানতে নারাজ। তাদের কথা- যত সোনালি ইতিহাসই থাকুক না কেন, এক সময়ের ‘সুপার পাওয়ার’ই হোক না কেন, যে দল এক নাগাড়ে তিনটি বিশ্বকাপ খেলতে পারে না, তাদের বিশ্বকাপ কোয়ালিফাই করতে না পারা নিয়ে কেন এত হইচই?

বর্তমান প্রজন্মের অনেকের মনেই এমন ধারণা আছে। সেটাকে অযৌক্তিক বলা যাবে না, বরং যুক্তিযুক্ত বলাই সঠিক। তবে যারা ৭০-এর দশকের শেষ থেকে ৮০-এর দশক হয়ে ৯০-এর দশক এবং বর্তমান শতাব্দীর প্রথমভাগের বিশ্ব ফুটবলকে পাখির চোখে দেখেছেন, তাদের কাছে ইতালির বিশ্বকাপে না থাকা মোটেই সাধারণ ঘটনা নয়- এটি অনেক বড় ঘটনা। ইতালির মতো দেশের বিশ্বকাপে না থাকাই বড় খবর, এবং ফুটবল ও ফুটবলভক্তদের জন্য তা রীতিমতো হতাশাজনক।

সেটা এবার নিয়ে টানা তৃতীয়বার হোক কিংবা প্রথমবার- ব্যাপারটি একই রকম গুরুত্ব বহন করে। যারা ৭০ ও ৮০-এর দশক থেকে ফুটবল দেখেন (তখন তো এখনকার মতো এত স্পোর্টস চ্যানেল বা স্যাটেলাইট চ্যানেল ছিল না; বাংলাদেশ টেলিভিশন মাঝে মধ্যে ‘ওয়ার্ল্ড সকার’ দেখাত, ইংলিশ লিগটাই বেশি দেখা যেত), তাদের কাছে ইতালি ছিল এক অন্যরকম দল।

কেমন সেই অন্যরকম? এক কথায় বলা কঠিন। এর উত্তর খুঁজতে হলে পিছনে তাকাতে হবে। পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ব্রাজিলের পর সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব আছে দুটি দলের—ইতালি ও জার্মানি। ইউরোপের এই দুই দেশ সমান চারবার করে বিশ্বকাপ জিতেছে। আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের আছে দুটি করে শিরোপা, উরুগুয়েরও দুটি, আর ইংল্যান্ডের একটি। অর্থাৎ বিশ্বকাপ ইতিহাসে ইতালি যৌথভাবে দ্বিতীয় সফল দল।

এক সময় বিশ্ব ফুটবলে ব্রাজিলের পাশাপাশি ইউরোপে জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ইংল্যান্ডের সঙ্গে সমানতালে লড়াই করে ইতালি কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মন জয় করেছিল। তাদের সেমি-ডিফেন্সিভ ও দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাকভিত্তিক ফুটবল অনেকেরই প্রিয় ছিল। আরও একটি কারণে ইতালির সমর্থকসংখ্যা ছিল বেশি- বিশেষ করে নারী ভক্তদের মধ্যে। কারণ প্রায় প্রতিটি ইতালিয়ান দলে থাকত দুই-তিনজন অত্যন্ত সুদর্শন ফুটবলার- ওয়াল্টার জেঙ্গা, পাওলো মালদিনি, রবার্তো ব্যাজিও, ফ্রান্সেসকো টট্টি, দেল পিয়েরোর মতো তারকারা ছিলেন দৃষ্টিনন্দন ব্যক্তিত্বের অধিকারী।

কিন্তু সেই ইতালি এবারও ভক্তদের হতাশ করে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ। গত এক যুগ ধরে বিশ্বকাপের মূল পর্বে নেই তারা। ফলে বর্তমান প্রজন্মের কাছে বিষয়টি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের কাছে ইতালি যেন বাছাইপর্বেই আটকে পড়া এক দল।

কিন্তু যারা তিন থেকে চার দশক ধরে বিশ্বকাপ দেখছেন, তাদের কাছে দিনো জফ, পাওলো রোসি, এসশিলাচি, জেঙ্গা, ফ্রাঙ্কো বারেসি, পাওলো মালদিনি, রবার্তো ব্যাজিও, ফ্রান্সেসকো টট্টিদের দেশ ইতালির অনুপস্থিতি গভীর হতাশার।

অনেকে হয়তো বিশ্বাসই করতে চাইবেন না- ম্যারাডোনার আবির্ভাবের আগে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় ইতালির জনপ্রিয়তা আর্জেন্টিনার চেয়েও বেশি ছিল। এর কারণও আছে। ১৯৭৪ ও ১৯৭৮ বিশ্বকাপ বাংলাদেশে সরাসরি সম্প্রচার হয়নি। ১৯৮২ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশিরা সরাসরি বিশ্বকাপ দেখার সুযোগ পায়- স্পেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ। আর সেই বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ছিল ইতালি।

১৯৮২ বিশ্বকাপে ব্রাজিল ছিল ফেভারিট। জিকো, সক্রেটিস, ফ্যালকাওদের দুর্দান্ত দলকে হারিয়ে ইতালি সেমিফাইনালে ওঠে। সেই ম্যাচে পাওলো রোসির হ্যাটট্রিক এখনও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা। পরে সেমিতে পোল্যান্ডকে হারিয়ে এবং ফাইনালে জার্মানিকে ৩-১ গোলে পরাজিত করে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে ইতালি।

এরপর ৯০-এর দশকজুড়ে এবং ২০০০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত ইতালি ছিল বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি। ১৯৯০-এ তৃতীয়, ১৯৯৪-এ রানার্সআপ, ১৯৯৮-এ কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০০৬-এ আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। কিন্তু ২০১০ বিশ্বকাপ থেকেই ছন্দপতন। এরপর ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬- তিনটি বিশ্বকাপেই মূল পর্বে উঠতে ব্যর্থ।

অনেকের মতে, ইতালির ঘরোয়া লিগের মান ও আকর্ষণ কমে যাওয়াই এর অন্যতম কারণ। পাশাপাশি বিশ্বমানের তারকার অভাবও বড় কারণ। ফুটবল দলগত খেলা হলেও কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত মেধা বা ‘ইনডিভিজ্যুয়াল ব্রিলিয়ান্স’ প্রয়োজন হয়- যা একসময় ইতালির ছিল।

পাওলো রোসি, এসশিলাচি, ব্যাজিওদের পর তেমন মানের খেলোয়াড় আর উঠে আসছে না। দিনো জফ, জিয়ানলুইজি বুফন, ফ্যাবিও ক্যানাবারো, ফ্রাঙ্কো বারেসি, পাওলো মালদিনি, আন্দ্রে পিরলো, দেল পিয়েরোর মতো বিশ্বমানের খেলোয়াড়ের অভাব স্পষ্ট।

এখনকার খেলোয়াড়রা গড়পড়তা মানের হলেও দলে অন্তত দুই-তিনজন অসাধারণ খেলোয়াড়ের প্রয়োজন- যা ইতালিতে এখন নেই। ফলে বিশ্ব ফুটবলে তাদের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। ৪৮ দলের বিশ্বকাপেও জায়গা হয়নি তাদের। বসনিয়া হার্জেগোভিনার মত দলের বিপক্ষে ১ গোলে এগিয়ে থাকার পরও জিততে না পারা, টাইব্রেকারে তিন শটের দুটি মিস করে ৪-১ গোলে হেরে যাওয়ার পর প্রশ্ন ওঠে, কোথায়ও ইতালির সেই বিখ্যাত ‘কাতানেচ্চিও’ ডিফেন্স? যে ডিফেন্স ভাঙা এক সময় ছিল সারা বিশ্বের অন্যসব ফুটবল দলের জন্য একটি স্বপ্ন।

এটি নিঃসন্দেহে ইতালির জন্য, সর্বোপরি ফুটবলের জন্য বড় ট্র্যাজেডি। বিশেষ করে যারা ৭০-এর দশক থেকে ফুটবল দেখছেন, তাদের জন্য ইতালির এই পতন অত্যন্ত কষ্টের। এক সময় বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় দল ইতালির পতাকা বিশ্বকাপে উড়বে না- এটা ভাবতেও কষ্ট হয়।

কি দেখেছি, আর কি দেখছি- সেই ইতালি আর এই ইতালি মেলানো সত্যিই কঠিন। কে জানে, কবে আবার জেগে উঠবে আজ্জুরিদের ফুটবল? কবে আবার কোনো ‘রাজকুমার’ এসে ইতালিকে ফিরিয়ে আনবে তার পুরনো গৌরবে?

এআরবি/আইএইচএস