তোপের মুখে ক্ষমা চাইলো শ্যুটিং ফেডারেশন
দেশকে অনেক সম্মান এনে দেওয়া খেলা শ্যুটিংয়ে এখন খেলার চেয়ে অন্য আলোচনা বেশি। অন্য আলোচনার মধ্যে বেশি আবার নারী শ্যুটারদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির। এটা এখন গোপন কিছু নয়। ভূক্তভোগী নারী শ্যুটাররা রাস্তায় মানববন্ধন করে, ক্রীড়া উপদেষ্টার কাছে লিখিত বিবৃতি দিয়েও বিচার চাইছেন।
স্বাভাবিকভাবেই এসব খবর গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হয়েছে। নারী শ্যুটারদের অভিযোগ, সেগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশের পর সরকার ব্যবস্থা হিসেবে অভিযুক্তকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতিও দিয়েছে। তাতেই চটেছে বাংলাদেশ শ্যুটিং ফেডারেশন। সবকিছুর জন্য গণমাধ্যমকে দায়ী করে বুধবার সংবাদ সম্মেলনে ডেকেছিল শ্যুটিং ফেডারেশন।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ১ জানুয়ারি নানা অভিযোগে অভিযুক্ত ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক জি এম হায়দার সাজ্জাদকে অপসারণ করেছে। তারপরও ফেডারেশেনে যাতায়াত কমিটিতে রয়েছেন অব্যাহতি পাওয়া সাজ্জাদ। অভিযোগ উঠেছে, সরকার তাকে কমিটি থেকে অপসারণ করার পরও নির্বাহী কমিটির সভায় উপস্থিত ছিলেন। এমনকি বুধবার সংবাদ সম্মেলনের সময়ও তিনি ফেডারেশনে ছিলেন।
বিগত কয়েকমাস ধরে গণমাধ্যমে আলোচনায় ছিলো জি এম হায়দার সাজ্জাদের বিরুদ্ধে তিন নারী শ্যুটারের অভিযোগ। ফেডারেশনের বিরুদ্ধে কারো তেমন অভিযোগ ছিল না। তারপরও সাজ্জাদের ঘটনা ফেডারেশন নিজেদের কাঁধে নিয়ে মুখোমুখি হয়েছে সরকারের। সরকারের সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অপাসরিত কর্মকর্তাকে নিয়েই কাজ করছেন সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস আরা খানম।
তারকা শ্যুটার কামরুন নাহার কলি, সাবেক তারকা শ্যুটার শারমিন আক্তার রত্না ও উদীয়মান শ্যুটার এমার আনিত অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ তদন্ত কমিটি গঠন করে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের গঠিত কমিটি এরই মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পেয়ে এই কমিটি সাজ্জাদকে কমপক্ষে ১০ বছরের জন্য শ্যুটিং থেকে বহিস্কারের সুপারিশ করেছে। মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটি কিছুদিনের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে বলে জানা গেছে।
পুরো ঘটনার জন্য শ্যুটিং ফেডারেশন সাংবাদিকদের ওপর অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলনে ডেকেছিল। সেখানে তারা পরিস্কার করে বলেছেন, গণমাধ্যম পরিকল্পিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফেডারেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর প্রোপাগান্ডা, মিথ্যা ও মানহানিকর তথ্য প্রচার করেছে। সংবাদ সম্মেলনের আমন্ত্রণপত্রে গণমাধ্যম অফিসগুলোকে ‘যোগ্য প্রতিনিধি (রিপোর্টার ও ক্যামেরাম্যান)’ পাঠিয়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করতে বলা হয়েছিল।

বিকেল ৩টায় সংবাদ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েও ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস আরা খানম নির্বাহী কমিটির কয়েকজনকে নিয়ে উপস্থিত হয়েছে ৪৫ মিনিট পর। প্রথম থেকেই সংবাদিকদের তোপের মুখে পড়েন সাধারণ সম্পাদক। সংবাদ সম্মেলনের আমন্ত্রণপত্রের ভাষার ব্যাখা দিতে বলা হয় সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে এবং গণমাধ্যমে কি মিথ্যা নিউজ করেছে তাও জানতে চাওয়া হয়।
এর কোনো প্রশ্নেরই জবাব দিতে পারেননি সাধারণ সম্পাদক। সংবাদ সম্মেলনের আমন্ত্রণপত্র প্রসঙ্গে তিনি কেবল বলেছেন, দেখার সময় হয়নি। অফিস থেকে লিখেছে, তিনি শুধু স্বাক্ষর করেছেন। তার মানে সাধারণ সম্পাদকের একটি চিঠি পড়ারও সময় হয়নি। এটা ভুল হয়েছে। এ সময় পাশে থাকা নির্বাহী সদস্য সারোয়ার ক্ষমা চেয়েছেন।
ফেডারেশনগুলোর অভিভাবক প্রতিষ্ঠান জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ( এনএসসি) প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে যুগ্ম সম্পাদক সাজ্জাদকে অব্যাহতি প্রদান করেছে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পক্ষ থেকে চিঠি প্রাপ্তির কথা এখনো স্বীকার করেনি। উল্টো সংবাদ সম্মেলনে সাজ্জাদের বিরুদ্ধে যারা অভিযোগ করেছেন তাদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান বা ভুল উপস্থাপন হিসেবে দাবি করেন তিনি। যা এক প্রকার জাতীয় ক্রীড়া পরিষদকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর মতোই।
এ নিয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নির্বাহী পরিচালক দৌলতুজ্জামান বলেন, ‘তাকে(সাজ্জাদ) অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত চলমান। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ফেডারেশনের কর্মকান্ড পর্যবেক্ষণ করছে।’
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ তিন সদস্য কমিটি করেছিল। সেই কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছে। সেই কমিটি থাকাবস্থায় আবার মন্ত্রণালয় আরেকটি কমিটি করেছে। মন্ত্রণলায় উর্ধ্বতন প্রতিষ্ঠান হওয়ায় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তদন্তের তেমন কার্যকরিতা থাকছে না। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ও মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনাহীনতা এবং সমন্বয়হীনতাও দৃশ্যমান।
শুটিং গুলি ও অস্ত্র নিয়ে খুব সংবেদনশীল খেলা। শুটিং ফেডারেশনের স্টোর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই স্টোরের ভিডিও ফুটেজ সাত দিনের বেশি থাকে না। সেই স্টোরের পাসওয়ার্ড সাজ্জাদের কাছে। যেটা সাধারণত সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের কাছে থাকার কথা। এ নিয়ে সাধারণ সম্পাদকের ব্যাখ্যা, ‘সভাপতির নির্দেশক্রমেই সেই পাসওয়ার্ড তার (সাজ্জাদ) কাছে ছিল। ফুটেজ যেন অন্তত তিন মাসের থাকে এটা নির্বাহী কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাস্তবায়ন পর্যায়ে রয়েছে।’
অলিম্পিক বৃত্তির আওতায় থাকা শ্যুটার কামরুন নাহার কলির অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। এরপরও কেন কলির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে না? এমন প্রশ্নে কোনো সদুত্তর দিতে না পেরে ঘুরেফিরে বারবার কলির শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এবং দু’বার শোকজের প্রসঙ্গ এনেছেন। কলির সংস্থা নৌবাহিনী থেকে শাস্তি প্রত্যাহার এবং তার পক্ষে শোকজের জবাব দেয়া হয়েছে। সেটাও পাননি বলে জানান ফেডারেশনের কর্মকর্তারা।
সরকার সাজ্জাদকে অপসারণ করেছে। সরকার চাইলে যে কোনো সময় পুরো কমিটিই বাতিল করে দিতে পারে। তাহলে এখন সাজ্জাদের বিষয়ে ফেডারেশনের অবস্থান কি? এমন প্রশ্নের জবাবে সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, ‘আমরা এ বিষয়ে নির্বাহী কমিটির সভায় আলোচনা করবো। আমরাতো জানিই না যে, তাকে অপসারণ করা হয়েছে।’ প্রথম দিকে তিনি বলার চেষ্টা করছিলেন সরকারের সিদ্ধান্ত মানবেই না। পরে অবশ্য পাশে বসা এক সদস্য বলছিলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত তো মানতেই হবে।
আরআই/আইএইচএস/