‘ক্রিকেটের মতো কাবাডি খেলোয়াড়দেরও বেতনের আওতায় আনতে হবে’
জাতীয় খেলা কাবাডি আগের অবস্থানে নেই। এক সময় এশিয়ান গেমসে রৌপ্য পদক জিতলেও এখন পদক পাওয়াই কঠিন। অন্য দেশগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের উন্নতি সেভাবে হচ্ছে না। যে কারণে বাংলাদেশ দিনদিন পিছিয়ে পড়ছে।
তবে ঘরোয়া কাবাডির কার্যক্রম আগের চেয়ে বেড়েছে। কাবাডি নিয়ে মানুষ আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। আইজিপি কাপ যুব কাবাডি ও বঙ্গবন্ধু কাপ যেভাবে জাঁকজমকপূর্ণভাবে হয়েছে, তাতে আগামীতে কাবাডিতে বাংলাদেশ ভালো করবে সে আশা করাই যায়।
দেশের কাবাডির সর্বশেষ অবস্থা, খেলাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে জাগো নিউজের বিশেষ সংবাদদাতা রফিকুল ইসলামকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় কাবাডি দলের অধিনায়ক তুহিন তরফদার।
জাগো নিউজ: একটা সফল টুর্নামেন্ট শেষ করলেন। আপনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হলো বঙ্গবন্ধু কাপ আন্তর্জাতিক কাবাডি টুর্নামেন্টে। কেমন অনুভূতি আপনার?
তুহিন তরফদার: যে কোনো টুর্নামেন্ট জেতার পর ভালো লাগাই স্বাভাবিক। যে দলগুলো টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিল তাদের কেউই শক্তিতে আমাদের সমকক্ষ নয়। তাই এই টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলে সেটা হতো দুর্ভাগ্যজনক। আমরা যোগ্য দল হিসেবেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছি।
জাগো নিউজ: আপনি কাবাডি খেলা শুরু করেছেন কবে?
তুহিন তরফদার : ২০০৯ সালে খুলনায় কাবাডি শুরু করি। এরপর ঢাকার কাবাডি শুরু করি ২০১১ সালে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব আজাদ স্পোর্টিংয়ের হয়ে। জাতীয় দলে অভিষেক ২০১৬ সালে এসএ গেমসে।
জাগো নিউজ : দেশের কাবাডির সার্বিক অবস্থা কী এখন?
তুহিন তরফদার: এখন আমরা ভালো পজিশনে আছি। ফেডারেশন অনেক দেখাশোনা করছে। আশা করি ভবিষ্যতে আরও ভালো হবে। আমরা আমাদের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবো।
জাগো নিউজ: জাতীয় দলের আরও ভালো করতে হলে কী করা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
তুহিন তরফদার : কাবাডিকে এগিয়ে নিতে হলে সিনিয়র জাতীয় দলের পাশাপাশি জুনিয়র জাতীয় দলও থাকতে হবে। স্কুল পর্যায় থেকে কাবাডি শুরু করতে হবে। ক্লাবগুলোরও সিনিয়র দলের পাশাপাশি জুনিয়র দল থাকতে হবে।

জাগো নিউজ: জমজমাটভাবে আমাদের জাতীয় যুব কাবাডি হয়েছিল। আপনি কি মনে করেন ওই টুর্নামেন্ট থেকে আমরা কোনো ফল পাবো?
তুহিন তরফদার: অবশ্যই ভালো ফল পাবো। যুব কাবাডি থেকে বাছাই করা প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের নিয়ে শিগগির ক্যাম্প শুরু হবে। এই ক্যাম্প হলে সেখান থেকে জাতীয় দলের খেলোয়াড় বেরিয়ে আসবে।
জাগো নিউজ: আমাদের সামনে এশিয়ান গেমস। এই গেমসের আগে বঙ্গবন্ধু কাপ খেলা হলো। শুধু চ্যাম্পিয়ন হওয়াই নয়, এই টুর্নামেন্ট থেকে আমরা আর কি পেলাম?
তুহিন তরফদার: এই টুর্নামেন্টের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পেরেছি আমাদের দুর্বল ও সবল জায়গাগুলো কোথায়। এখন এশিয়ান গেমসের আগ পর্যন্ত দুর্বল জায়গাগুলো নিয়ে কোচ কাজ করতে পারবেন।
জাগো নিউজ: বঙ্গবন্ধু কাপে তো অনেক জুনিয়র খেলোয়াড় ছিল দলে। তারা কেমন করলো টুর্নামেন্টে?
তুহিন তরফদার: অনেক জুনিয়র খেলোয়াড় আছে যারা ঘরোয়া টুর্নামেন্টগুলো ভালো করছে; কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কেমন খেলবে সেটা দেখার সুযোগ ছিল না। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয় সেটা নতুনরা দেখলো বঙ্গবন্ধু কাপের মাধ্যমে। তাই আমি বলবো বঙ্গবন্ধু কাপ আমাদের ভালো কাজ দেবে এশিয়ান গেমসে।
জাগো নিউজ: বলছিলেন যে, বঙ্গবন্ধু কাপের মাধ্যমে আপনারা নিজেদের দুর্বলতা দেখতে পেরেছেন। এখন দুর্বলতা কোথায়?
তুহিন তরফদার: আমাদের বড় দুর্বলতা রক্ষণে। বঙ্গবন্ধু কাপে দেখেছেন আমাদের রক্ষণ নড়বড়ে ছিল। যে কারণে ম্যাচ বের করতে সমস্যা হয়েছে। অন্য পজিশনগুলোতে ভালো খেলেছে সবাই। ডিফেন্ডাররা আরও ভালো খেললে আমাদের ম্যাচগুলো একতরফা হতো। ডিফেন্সে আমাদের আরও ভালো করতে হবে।
জাগো নিউজ: আর কোনো দুর্বলতা ছিল?
তুহিন তরফদার : হ্যাঁ। আমাদের ম্যাচ টেম্পারমেন্টে ঘাটতি ছিল। গত বছর মার্চে বঙ্গবন্ধু কাপ খেলেছি। তারপর খেলতে নামলাম এই মার্চে বঙ্গবন্ধু কাপে। দীর্ঘ বিরতির কারণে ম্যাচ টেম্পারমেন্টে ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। এটা কাটাতে হলে আন্তর্জাতিক ম্যাচ বেশি খেলতে হবে।

জাগো নিউজ: এশিয়ান গেমস সামনে রেখে ফেডারেশন জাতীয় দলকে ভারতে পাঠিয়ে অনুশীলনের পাশাপাশি কম করে হলেও ১০টি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলানোর ব্যবস্থা করছে। এটাকে কীভাবে দেখছেন?
তুহিন তরফদার: এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। বিশ্ব কাবাডিতে ভারত রোলমডেল। ভারতের ক্লাবগুলো অনেক দেশের জাতীয় দলের চেয়েও শক্তিশালী। তাদের বিপক্ষে খেললে আমাদের ম্যাচ টেম্পারমেন্ট বৃদ্ধি পাবে।
জাগো নিউজ: দেশের কাবাডি উন্নয়নের জন্য আর কী করা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
তুহিন তরফদার: আগেই বলেছি, স্কুল পর্যায় থেকে কাবাডি শুরু করতে হবে। ভারতে বয়সভিত্তিক কাবাডি হয়। তৃণমূল থেকে কাবাডি খেলোয়াড় তুলে আনতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের ক্রিকেটের মতো বেতনের আওতায় আনতে হবে। তাহলে যুব সমাজ আগ্রহী হবে কাবাডি খেলতে। অভিভাবকরাও আগ্রহী হবে তাদের সন্তানকে কাবাডি খেলায় পাঠাতে। তারা জানবে, কাবাডি খেললে অর্থ উপার্জন সম্ভব, চাকরি পাওয়া সম্ভব। তখন জাতীয় দলেও প্রতিযোগিতা বাড়বে।
জাগো নিউজ: দেশের দুই প্রধান খেলা ফুটবল ও ক্রিকেট। ক্রিকেট খেললে অনেক টাকা। আপনার কি মনে হয় কাবাডি খেলায় এসে ভুল করেছেন?
তুহিন তরফদার: ১০ বছর আগে হলে মনে করতাম কাবাডি খেলতে এসে ভুল করেছি। এখন মনে হয় ঠিকই করেছি। দেখেন, এখন ভারতের প্রো-কাবাডিতে কোনো দলে ডাক পেলেই কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা। এর চেয়ে বেশিও পাওয়া যায়। আমাদের জিয়াউর রহমান (২) তো বেঙ্গল ওয়ারিয়র্সে খেলে ৩৩ লাখ টাকা পেয়েছিলেন।
জাগো নিউজ: আর কী কী সুবিধা আছে?
তুহিন তরফদার: জাতীয় দলে যারা খেলছেন তাদের বেশিরভাগই কাবাডি খেলোয়াড় হিসেবে বিভিন্ন সংস্থায় চাকরি পেয়েছেন। এখন পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ছে, আর্থিক সহযোগিতাও পাওয়া যাচ্ছে। ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই খেলোয়াড়দের বেতনের আওতায় আনা হবে। কাবাডি এখন কেবল এই অঞ্চলের খেলাই নয়, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যাচ্ছে। কাবাডি খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে ভাগ্যবানই মনে করি।
জাগো নিউজ: আমাদের কতজন খেলোয়াড় এ পর্যন্ত ভারতের প্রো-কাবাডিতে খেলেছেন?
তুহিন তরফদার: আমিসহ আটজন খেলোয়াড় এ পর্যন্ত ভারতের প্রো-কাবাডি খেলেছেন। অন্যরা হলেন- সাজিদ, রোমান, আরদুজ্জামান, জিয়াউর রহমান-১, জিয়াউর রহমান-২, মাসুদ করিম, জাকির।
জাগো নিউজ: কাবাডি যতই জমজমাট হোক, মানুষ চায় এশিয়ান গেমসে আগের অবস্থান ফিরে পেতে। এশিয়ায় আরও অনেক দেশ কাবাডিতে উঠে আসছে। এখন পদক পাওয়া কতটা সম্ভব?
তুহিন তরফদার: দেখুন, এখন আমরা যে পর্যায়ে আছি তাতে এশিয়ান গেমসে রৌপ্য পাওয়া কঠিন। হ্যাঁ, যদি সেমিফাইনালে ভারত ও ইরানের দেখা হয়ে যায় তাহলে আমাদের পক্ষে ফাইনালে ওঠা সম্ভব।
জাগো নিউজ: এখন তো দক্ষিণ কোরিয়াও অনেক শক্তিশালী দল। সেই সঙ্গে শ্রীলঙ্কাও। তাদের কি হারানো সম্ভব?
তুহিন তরফদার: দক্ষিণ কোরিয়াকে আমরা হারাতো পারবো। দলটিকে আমরা বিশ্বকাপে হারিয়েছি। শ্রীলঙ্কিাও শক্তিশালী দল। তাদের তো এবার হারালাম।
জাগো নিউজ: ঘরোয়া কাবাডি আরও জাঁকজমকপূর্ণ করতে কী করা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
তুহিন তরফদার: কাবাডি এখন সার্ভিসে দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল। লিগে দেশের দুই জনপ্রিয় ক্লাব মোহামেডান ও আবাহনীসহ আরও দল আনতে হবে। তাহলে সিভিল প্লেয়ার বাড়বে। জাতীয় দলে ঢোকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাও বেড়ে যাবে।
জাগো নিউজ : আপনাকে ধন্যবাদ।
তুহিন তরফদার : আপনাকেও ধন্যবাদ।
আরআই/আইএইচএস