ভ্রমণেও জীবনের গল্প
আর্জেন্টিনার মাটিতে বাঙালি আনিসের সাফল্য
আর্জেন্টিনার মাটিতে পা রাখার পর অনেক দৃশ্য দেখেছি, অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। কিন্তু কিছু মানুষ থাকে যাদের সঙ্গে দেখা হলে ভ্রমণটা হঠাৎ করে কেবল জায়গা দেখার গল্পে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা রূপ নেয় মানুষের গল্পে, সংগ্রামের গল্পে, আত্মপরিচয়ের গল্পে। আনিস ভাই তেমনই একজন মানুষ। দূর দক্ষিণ আমেরিকার দেশে, হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে গিয়ে একজন বাঙালিকে এমন দৃঢ়ভাবে নিজের জায়গা তৈরি করতে দেখাটা এক অন্যরকম অনুভূতি, যা ভাষায় পুরোপুরি ধরা যায় না, শুধু হৃদয়ে জমে থাকে।
আনিস ভাই গত আঠারো বছর ধরে আর্জেন্টিনায় বসবাস করছেন। এই দীর্ঘ সময়টা শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় জমে থাকা বছর নয় বরং এটি অসংখ্য পরিশ্রমের দিন, না বলা কষ্টের রাত আর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এক শক্ত ভিতের গল্প। বিদেশের মাটিতে ব্যবসা দাঁড় করানো সহজ নয়; বিশেষ করে ভাষা, সংস্কৃতি, নিয়মকানুন, মানুষের মন বুঝে চলতে হয় যেখানে প্রতিদিন। তবুও আনিস ভাই সেই চ্যালেঞ্জকে ভয় পাননি। বরং ধৈর্য, সততা আর পরিশ্রমকে সঙ্গী করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে।
তার গার্মেন্টসের জামাকাপড় ও ব্যাগ তৈরির ব্যবসা আর্জেন্টিনার বাজারে সুপরিচিত। একসময় তার দশ থেকে পনেরোটি দোকান ছিল, যা কেবল সংখ্যার হিসাব নয় বরং তার শ্রমের সাক্ষ্য। এখনো তার একটি অত্যন্ত সুন্দর ও পরিপাটি দোকান রয়েছে, যেখানে ঢুকলেই বোঝা যায় এটি কেবল ব্যবসার জায়গা নয়, এটি তার স্বপ্নের ফল। দোকানের সাজসজ্জা, পণ্যের মান, সবকিছুতেই রয়েছে যত্ন আর রুচির ছাপ। একজন প্রবাসী বাঙালি হিসেবে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়।
সবচেয়ে ভালো লেগেছে তার প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ। চার থেকে পাঁচজন আর্জেন্টিনার মানুষ তার সঙ্গে কাজ করেন। ভিনদেশের মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারা কেবল আর্থিক সাফল্য নয়, এটি সামাজিক দায়িত্বেরও প্রতিফলন। আনিস ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে বোঝা যায়, তিনি শুধু নিজের লাভের কথা ভাবেননি বরং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছেন। হয়তো সে কারণেই স্থানীয়রাও তাকে সম্মান করে, বিশ্বাস করে।
ব্যবসার পাশাপাশি তার পারিবারিক জীবনও সমান সুন্দর। তার স্ত্রী আর্জেন্টিনার আর তাদের একটি ছেলে রয়েছে তার নাম তৌফিক। ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ভাষার মানুষের সঙ্গে জীবন গড়ে তোলা সহজ নয় কিন্তু আনিস ভাইয়ের পরিবারে সেই বৈচিত্র্যই যেন সৌন্দর্যে পরিণত হয়েছে। কথা বলার সময় তার পরিবার নিয়ে যে শান্ত, পরিতৃপ্ত হাসি তার মুখে দেখেছি তা বলে দেয়, তিনি জীবনের ভারসাম্যটা ঠিকঠাক ধরে রাখতে পেরেছেন। সফলতা যে শুধু অর্থে মাপা যায় না, পরিবার ও মানসিক শান্তিও যে তার বড় অংশ এটা তিনি নিঃশব্দে প্রমাণ করেছেন।
আরও পড়ুন
পৃথিবীর পথে হাঁটা এক অনন্য চরিত্র
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের বিস্ময়কর ভ্রমণ
আমাদের পরিচয়টা ছিল খুব স্বাভাবিক, খুব মানবিক। হয়তো ভাগ্যের টানেই পরিচয়, তারপর ধীরে ধীরে কথোপকথন, আর সেখান থেকেই তৈরি হলো এক আন্তরিক সম্পর্ক। আমরা দুই-তিন দিন একসঙ্গে ছিলাম, একসঙ্গে ঘুরেছি, আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনোস আইরেসের নানা জায়গা দেখেছি। আনিস ভাইয়ের বাসায় অনেকবার বাঙালি রান্না করে খাইয়েছেন। ভ্রমণের সময় আনিস ভাই কেবল একজন গাইড ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন আপনজনের মতো। কোথাও গেলে জায়গার ইতিহাস বলতেন, কোথাও আবার নিজের জীবনের ছোট ছোট গল্প শেয়ার করতেন; যেখানে ছিল সংগ্রাম, আশা আর আত্মবিশ্বাস।
তার আন্তরিকতা আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছে। কোনো রকম কৃত্রিমতা নেই, নেই অহংকার। এত বড় ব্যবসা, এত বছরের প্রবাসজীবন কিন্তু মানুষের সঙ্গে মিশতে গিয়ে তিনি একদম মাটির মানুষ। কথা বললে মনে হয়, তিনি আমাদেরই একজন শুধু অবস্থানটা ভিন্ন। বিদেশের মাটিতে থেকেও নিজের শেকড় ভুলে যাননি, বাঙালি পরিচয়কে ধারণ করেছেন গর্বের সঙ্গে।
বিশেষ করে আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে একটি অনুভূতি; পৃথিবীর এত দূরের এক দেশে গিয়ে একজন বাঙালিকে এত সুন্দরভাবে নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে দেখা। নিজের দেশের মানুষের সংগ্রামের গল্প শুনে বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। মনে হয়, আমরা পারি। সীমাবদ্ধতা আমাদের থামাতে পারে না, যদি ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রম থাকে। আনিস ভাই যেন সেই বিশ্বাসের জীবন্ত উদাহরণ।
আনিস ভাইয়ের সঙ্গে কাটানো কয়েকটি দিন আমার ভ্রমণের স্মৃতিতে আলাদা একটি জায়গা করে নিয়েছে। হয়তো সময়ের সাথে অনেক দৃশ্য ঝাপসা হয়ে যাবে, কিন্তু তার হাসি, তার আন্তরিক ব্যবহার আর তার গড়ে তোলা জীবনের গল্প এসব অনেকদিন মনে থাকবে। পৃথিবীর সবচেয়ে দূরের দেশে গিয়ে এমন একজন বাঙালির সঙ্গে পরিচয় হওয়া সত্যিই সৌভাগ্যের।
এই ভ্রমণ আমাকে আবার মনে করিয়ে দিয়েছে, পৃথিবী যত বড়ই হোক, মানুষের গল্পই তাকে কাছের করে তোলে। আর সেই গল্পগুলো যদি হয় পরিশ্রম, সততা আর মানবিকতার তাহলে তা শুধু শোনা নয়, অনুভব করার মতো হয়ে ওঠে। আনিস ভাইয়ের গল্প ঠিক তেমনই নীরব, গভীর আর অনুপ্রেরণায় ভরা।
এসইউ