কৃষকের সন্তানের এভারেস্ট জয়ের মহাকাব্য
ইকরামুল হাসান শাকিল একটি নাম নয়, একটি বিস্ময়। তার যাত্রাটা শুধু পাহাড়ের উচ্চতায় ওঠার গল্প নয়; এটা মাটি থেকে উঠে আসার গল্প। এটা বেঁচে থাকার, লড়াই করার আর নিজেকে প্রতিদিন নতুন করে আবিষ্কার করার গল্প।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে শুরু করে পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়া মাউন্ট এভারেস্ট। এই অসম্ভব দূরত্ব সে পাড়ি দিয়েছে নিজের শরীর, মন আর অটল বিশ্বাসকে সঙ্গী করে। পৃথিবীর মাত্র দুইজন মানুষের মধ্যে সে একজন, যে কি না সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে শুরু করে পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়া মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেছে। শাকিল শুধু এভারেস্ট জয়ী নন, সে হিমালয়ের সেই দুর্গম এবং ঐতিহাসিক দ্য গ্রেট হিমালয়ান ট্রেল সম্পন্ন করা বিরল মানুষদের একজন।

হিমালয়ের ট্রেল মানে কেবল সৌন্দর্য নয়; এ এক মৃত্যুকূপের মধ্য দিয়ে হেঁটে চলা। তুষারঝড় যখন চারপাশ অন্ধকার করে দেয়, যখন অক্সিজেনের অভাবে ফুসফুস ছিঁড়ে যেতে চায়, তখন শাকিলের সঙ্গী ছিল কেবল নিজের হৃৎস্পন্দন আর অদম্য বিশ্বাস। তিনি দেখেছেন প্রকৃতির রুদ্ররূপ, অনুভব করেছেন পাহাড়ের নিঃশব্দ প্রার্থনা। প্রতিটি কদম ছিল নিজের সীমানাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পরীক্ষা। যা পৃথিবীর একমাত্র পর্বতারোহী হিসেবে এই ‘সি টু সামিট এভারেস্ট’ এবং ‘ দ্য গ্রেট হিমালয়ান ট্রেল’ সম্পন্ন করেছে। এটা কোনো হঠাৎ পাওয়া সুযোগ নয়, কোনো একদিনের সাহস নয়, এটা বছরের পর বছর ধরে জমে ওঠা ঘাম, ত্যাগ আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির ফল।
শাকিলের গল্পের শুরুটা কোনো আধুনিক জিমনেসিয়াম বা বিলাসী ট্রেইনিং সেন্টারে হয়নি। তার সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গাটা তার শেকড়। সামর্থ তৈরি হয়েছে বাংলার তপ্ত রোদে, কাদামাখা ধানের ক্ষেতে। সে এসেছে কৃষক পরিবার থেকে। মাটির গন্ধ, ঘামের লবণাক্ততা আর রোদে পোড়া শরীর, এই ছিল তার শৈশবের পরিচয়। শৈশব, কৈশোর এমনকি আজও সে ধান কাটে। মাঠে কাজ করা, কাঁধে বোঝা নেওয়া, রোদ-বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকা, এই অভিজ্ঞতাগুলোই ধীরে ধীরে তাকে ভেতর থেকে ইস্পাতের মতো শক্ত করেছে।

অভাবের তাড়নায় কখনো তাকে বাজারে মাছ কাটতে হয়েছে, কখনো করতে হয়েছে রংমিস্ত্রির সহযোগী বা ইলেক্ট্রিশিয়ানের সহযোগীর কাজ। কিন্তু প্রতিটি কাজের চাপ তাকে মানসিকভাবে ইস্পাতের মতো শক্ত করে তুলেছে। জীবনের কোনো অধ্যায়েই সে কাজকে ছোট করে দেখেনি। বরং প্রতিটি কাজ থেকেই সে শিখেছে টিকে থাকার কৌশল, সম্মান নিয়ে বাঁচার পাঠ। এখান থেকেই তার গল্পটা হয়ে ওঠে ব্যতিক্রমী। কারণ এভারেস্ট জয় করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়, কিন্তু একদম শেকড় থেকে উঠে এসে মাটি, ঘাম আর সংগ্রামকে পাথেয় করে এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছানো মানুষ খুব কম।
‘যে মানুষটি তপ্ত দুপুরে ধান কাটতে শিখছে, হিমালয়ের হাড়কাঁপানো শীত তাকে হারাবে কীভাবে?’ শাকিলের জীবন এই প্রশ্নটিই বারবার ছুড়ে দেয় আমাদের দিকে। সে কখনো কোনো শর্টকাট বেছে নেয়নি। পাহাড়ের মতোই তার জীবনও ছিল খাড়া, পিচ্ছিল আর অনিশ্চয়তায় ভরা। প্রতিটি ধাপে প্রশ্ন ছিল, আজ কাজ থাকবে তো? কাল খাবার জুটবে তো? পরিবারকে সামলে স্বপ্ন দেখা যাবে তো? তবুও সে থামেনি। এই যাত্রার ভেতর ছড়িয়ে আছে অসংখ্য রোমাঞ্চকর মুহূর্ত। কখনো গভীর রাতের অন্ধকারে তুষারঝড়ের মুখোমুখি হওয়া, কখনো বরফের ভেতর দিয়ে নিঃশব্দ পদচারণা, কখনো পাহাড়ি কুঁড়েঘরে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে অদ্ভুত এক আত্মিক বন্ধন। এই গল্পগুলো শুধু পাহাড়ের নয়, এগুলো মানুষের গল্প। ভয়, সাহস, আশা আর বিশ্বাসের গল্প।

শাকিল প্রমাণ করেছেন, বড় স্বপ্ন দেখার জন্য রাজপ্রাসাদের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয় পাহাড়ের মতো অটল একটি হৃদয়ের। সব মিলিয়ে, ইকরামুল হাসান শাকিল শুধু একজন এভারেস্ট জয়ী নন, সে একটি জীবন্ত গল্প, যে গল্প বলে একজন কিংবদন্তির। পরিশ্রম কখনো বৃথা যায় না। শেকড় যত গভীরে, ডানা তত উঁচুতে মেলে। আর স্বপ্ন যদি হয় পাহাড়সম, তবে মাটি থেকে আকাশ ছোঁয়াও অসম্ভব কিছু নয়।
এসইউ