পাহাড়ের রূপ সাগরে
পাহাড় মানেই সৌন্দর্যের হাতছানি
সফরের শুরুটা খুব প্রীতিকর ছিল না। দুবার রুম বুকিং দিয়ে ক্যানসেল করতে হয়। টিকিট কাটার আগ মুহূর্তে ১০ জনের দল থেকে অসুস্থতাজনিত কারণে কমে গেলো আরও তিনজন। অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে চার চাকার গ্লাস আটকানো গাড়িতে চেপেও তাই বিশ্বাস হচ্ছিল না সত্যি যাওয়া হচ্ছে আমাদের বহুল কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে।
মেঘ-পাহাড়ের দেশে আমার ১৫তম যাত্রা হলেও বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান, মামা-মামির এটাই প্রথম। আমার এক্সাইটমেন্ট যখন নিয়ে যাওয়া, বাকিদের এক্সাইটমেন্ট তখন প্রথমবার দেশের পাহাড় দেখার। দার্জিলিং, গ্যাংটক, সিকিম, নেপালের কালো পাথুরে পাহাড় আর পাইন-ধুপ্পি গাছের সুউচ্চ সারি দেখলেও অনিন্দ্য সুন্দর দেশের সবুজ মাটির পাহাড়ের সৌন্দর্য তাদের অলক্ষ্যেই থেকে গেছে।

ভোরের প্রথম দর্শনে নীলাচল
সৌদিয়া পরিবহন ঢাকার আবদুল্লাহপুর থেকে বান্দরবানের এসি বাস চালু করেছে সম্প্রতি। ভাড়া ১২শ টাকা। পথে ফুডকোর্টে খাবার ফ্রি। আইটেম চায়নিজ অথবা বিফ তেহারি। খাবার মন্দ ছিল না। টিকিটের পয়সা কিছুটা হলেও উসুল। ঢাকা থেকে রাত ১০টায় রওয়ানা দিয়ে ভোর পৌনে পাঁচটার দিকে ঢুকলো পাহাড়ি সড়কে। সারা রাত বাইরে চোখ দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করিনি। মেঘলা পর্যটন কেন্দ্রের বেশ খানিকটা আগে থেকে সবার চোখ গাড়ির সামনের গ্লাস ফুঁড়ে। মসৃণ আঁকাবাঁকা সড়কে শরীর দুলছিল পেন্ডুলামের মতো। রাস্তার নিয়ন সাইনগুলো বাগডাশের চোখের মতো তাকিয়ে আছে যেন। দু-ধারের সড়কের পাশে গাছের সারি। গোড়ায় আবার সাদা চুনকাম করা। সেগুলো অন্ধকার রাতে গাড়ির রাত্রিকালীন চোখ হেড লাইটের আলোয় নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছিল। আরও খানিক এগোতেই সামনে হাত উঁচিয়ে গাড়ি থামালেন সেনা সদস্য। দুজন উঠলেন গাড়িতে। কোথা থেকে এসেছি, কোথায় কী কারণে যাচ্ছি, সঙ্গে জাতীয়পরিচয়পত্র আছে কি না এসে জেনে ছেড়ে ছিলেন। অবশ্য দুদিনে এমন অনেক চেকে পুরো বান্দরবানে পড়তে হয়েছে।

কটেজের রিসিপশন
মেঘলা পর্যটন কেন্দ্র চলে এলো একটু পরেই। পরের স্টপেজ নীলাচল। আমরা নামবো সেখানেই। এর মধ্যে আমাদের চান্দের গাড়ির চালকের ঘুম ভাঙালাম। পাঁচটার পরপরই গাড়ি নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো বান্দরবান শহরে। নীলাচল শহর থেকে দুই-আড়াই কিলোমিটার আগে। শহরের কাছাকাছি থাকা সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন স্পট। নীলাচল মোড় তখন নিস্তব্ধ। কুয়াশার ভার বইতে না পারা পাতারা তাদের বেদনা ঝরাচ্ছে। সেটাই নিস্তব্ধতা ভাঙানোর একমাত্র মন্ত্র। পাখিরা জাগা শুরু করেনি। পাশের একটি দোকানের শেডে সাময়িক আশ্রয় নেওয়া হলো। মিনিট দশেকের মধ্যে এসে গেলো গাড়ি। পুরো গাড়ি ভিজে নেয়ে শেষ। কয়েকবার কাপড় দিয়ে মুছেও শুকানো গেলো না। অগত্যা তাতে চড়েই উঠতে হবে হাজার ফুটের বেশি উচ্চতার নীলাচলে।
ভোরের আলো তখন চোখ মেলতে শুরু করেছে। আঁকাবাঁকা পথ পুরোটাই চড়াই। একটু পর এক দল মেঘ ছুঁয়ে গেলো শরীর ফুঁড়ে, যেন সারা রাতের ক্লান্তির দাওয়াই। প্রায় ১৭ বছর আগে প্রথমবার যখন নীলাচলে উঠেছিলাম তখন মেঠোপথ ছিল। চূড়ায় একটি গোলঘর ছাড়া আর কিছুই ছিল না। সেই নীলাচল এখন অচেনা। বুনো নীলাচল এখন অনেকটা ‘সভ্য’। বুনো সৌন্দর্য অনুপস্থিত হলেও এখনকার সাজানো সৌন্দর্যও কম নয়। গেটে গিয়ে গেটম্যানকে ঘুম থেকে জাগিয়ে জনপ্রতি ৫০ টাকা ফি দিয়ে ঢুকলাম ভিতরে। আমাদের আবাস নীলাচলের নীলাম্বরি রিসোর্ট। যে রিসোর্টের ‘ফ্রি বিজ্ঞাপন’ আমি আজীবন দিয়ে যেতে রাজি!

এখানে বসে কাটিয়ে দেওয়া যায় দীর্ঘ সময়
নীলাচল মনে হয় এদিন আমাদের চমকে দেওয়ার জন্যেই অপেক্ষা করছিল। রিসোর্টের কাছে গিয়ে থামলো গাড়ি। রুম তখন সবগুলো প্রস্তুত হয়নি। তাতে কী! প্রথম দর্শনে যে রূপের দর্শন এখানের মেঘ-পাহাড় দিলো তাতে ফ্রেশ হওয়া, ঘুম কিংবা রুমে ঢোকার কথা সবাই ভুলে গেলাম। রিসিপশনে লাগেজ রেখে সোজা ভিউ পয়েন্টে। আকাশের অন্ধকারের আবেশ তখনও কাটেনি। আকাশে জাপটে থাকা মেঘেরা রক্তিম। শরীর ছুঁয়ে উড়ে উড়ে যাওয়া মেঘগুলোর বাসা তখন পাহাড়ের কোল। ভোরের কালচে সবুজ পাহাড়ের জঙ্ঘায় বসে বসে প্রাতঃভ্রমণ করছে তারা। সেদিকে দুচোখ পেতে ‘বিষহীন’ নিশ্বাসে মনে হলো শত জনমের শান্তি সে এই পাহাড়ের ভাঁজে। এ যেন আরেক মায়ের কোল।

দীর্ঘ জার্নি শেষে ক্লান্তি দূর করার দাওয়াই
রিসোর্টের পাশেই ইংরেজি ‘এস’ আকৃতির ভিউ পয়েন্ট। এখানে বসে বসে অনন্তকাল ধরে পাহাড়ের রূপ সাগরে ডুব দিতে পারবেন। আশপাশে বেশ কয়েকটি নতুন ভিউ পয়েন্ট ও থ্রিলিং রাইড ‘সুইং’ আমার জন্যও নতুন। যদিও সংস্কার কাজের জন্য সুইং বন্ধ ছিল। নীলচলের ওপরে গোলঘর। এখানকার আইকনিক স্থাপনা। সুন্দর কারুকাজ করা সিঁড়ি-রেলিং ধরে সবাই মিলে ওঠা হলো ওপরে। সূর্যটা ততক্ষণে তার তেজ দেখানোর মুডে চলে এসেছে। পাহাড়ের কথা মাথায় এলেই দার্জিলিং, কালিম্পং, সিকিম কিংবা নেপালের কথা আগে মাথায় আসে। আমরা হাজার হাজার টাকা খরচ করে ঘুরতে যাই। কিন্তু অক্টোবর-নভেম্বরে বান্দরবানের পাহাড়ের হিংসা করার মতো রূপ সব ভুলিয়ে দেয়। মাথার মধ্যে গেঁথে দেয়, দেখো ‘ঘর হইতে দু পা ফেলিয়া…’।
গোলঘর থেকে দারুণ রূপ দেখা যায় পাহাড়ের। যতদূর চোখ যায় সবুজ চাঁদোয়ায় হাত-পা ছড়িয়ে বসে থাকা মেঘের দল। পাশে কয়েটি ক্রিসমাস ট্রি টাইপ ডেকোরেটিভ পাইন গাছ। সরকারি চাকুরেদের জন্য থাকার ব্যবস্থাও আছে এ ঘরে। গোলঘরে থেকে নিচে নামতে নামতেই ভোরের নরম আলো গায়ে লাগতে শুরু করেছে। চত্বরে কয়েকটি রেলিং ঘেরা ভিউ পয়েন্ট। দর্শনে চেয়ে যদিও সেখানে ফটোগ্রাফই বেশি চলে এখন। পাহাড়ের খাদে উঁচু দাঁড়িয়ে থাকা পেঁপে গাছটি পাকা পেঁপে। তা দিয়ে প্রাতঃরাশ সারছিল মেটে রঙের কাঠ শালিক। এক কোণে বকুল গাছ। নিচে সুগন্ধী ফুলের বিছানা। গাছে টসটসে পাকা ফলে পাখির ঠোঁট। প্রকৃতি এখানে নিজের মতো করে সেজেছে।

নীলাচলের গোলঘর
অপরাশে আরও দুটি ভিউ পয়েন্ট। এদিকের ভিউ আলাদা। উত্তরে বান্দরবান শহর। সবুজ ফুঁড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো কিছু রঙিন ভবন পাহাড়ের ছন্দপতন ঘটিয়েছে। কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে এবার রুমে ফেরার পালা। নীলাম্বরি রেস্টুরেন্টে নাশতা অর্ডার করে রুমের দিকে যাত্রা। পাহাড়ের ঢালে বাদুড়ের মতো ঝুলে আছে তিনটি নীল কটেজ। ঠিক নিচে মেঘ। জেলা পরিষদের কাছ থেকে লিজ নিয়ে কটেজগুলো চালান সাইদুল ইসলাম নামে এক যুবক। সদালাপি এ যুবক বেশ রুচিশীল। প্রকৃতিকে যথাসম্ভব ঠিক রেখে সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছেন কটেজগুলো। নীলাচলসহ বান্দরবানের বিভিন্ন পর্যটন স্পট নিয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছেন ২০১৬-১৭ সালের দিকে তৎকালীন এনডিসি হোসাইন মোহাম্মদ আল মুজাহিদ ও ডিসি দিলীপ কুমার বনিক। বান্দরবানের মানুষ এখনো তাদের স্মরণ করে। তাদের সুবাদে পরিচয় হয় সাইদুলের সঙ্গে। দীর্ঘদিন চালালেও তিনি আরও বড় ইনভেস্টে যেতে পারেন না লম্বা সময়ের জন্য লিজ না পাওয়ায়।

উঁকি দিচ্ছে সূর্য
যাইহোক আমাদের ভাগ্যে পড়লো ‘জীবন্নীড়’ পাশেরটি ‘পথিক রোমিও’ । একেকটি কটেজে দুটি করে রুম। একটি করে বেলকনি। যেখানে বসে মনে কাটিয়ে দিতে পারবেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ঘুম-রেস্ট কোনোটাই নিতে ইচ্ছা হলো না। ফ্রেশ হয়ে ৫ হাজার টাকায় মাইক্রো ভাড়া করে বেরিয়ে পড়লাম। মূল গন্তব্য নীলগিরি। এক হাজার ফুট থেকে সমতলে নেমে আবার উঠতে হবে প্রায় ৩২শ ফুট ওপরে। দেশের প্রথম সড়ক টানেল দিয়ে বের হয়ে উঠলাম থানচি সড়কে। বাসস্ট্যান্ডকে পাহাড় ধস থেকে বাঁচাতে টানেলটি তৈরি করলেও তাতে অযত্ন-অবহেলার ছাপ স্পষ্ট।

নীলগিরি
থানচি রোড ধরে নীলগিরি পর্যন্ত সব বয়সী মানুষের ভ্রমণের জন্য সেরা গন্তব্য। ট্রেকিং কিংবা পরের গন্তব্যপথ কঠিন। যদিও কেওক্রাডং পর্যন্ত এখন চান্দের গাড়ি যাওয়ায় সেটা আর দুর্গম নেই। যাইহোক গাড়িওয়ালা সব সময় অনেকগুলো স্পট দেখাবে বলেন। কিন্তু এর জন্য যে অতিরিক্ত কোনো তেল তাকে পোড়াতে হয় না সেটা একবার যারা গেছেন তারা জানেন। যাওয়ার পথের প্রথম স্পট শৈলপ্রপাত। পাহাড়ি জলধারা। বর্ষাকাল ছাড়া অন্য সময় এখানে জলপ্রবাহ থাকে তাকে প্রপাত বলবে না কেউ। তাই নামার ইচ্ছা হয়নি কারও। প্রায় আড়াই ঘণ্টার বেশি চলে তাই সোজা চলে নীলগিরি চলে যাওয়া। ফেরার পথে দেখা হবে চিম্বুক, ডাবল হ্যান্ড কিংবা টাইটানিক ভিউ পয়েন্ট। শেষের দুটি আমি দেখিনি আগে। মানে খুব বেশি দিন হয়নি। নীলগিরি নেমে টিকিট কাটতে হলো ১০০ টাকা করে। গাড়ির জন্য আরও ২০০। যদিও পার্কিংয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। পর্যটকরা কোন গাড়িতে গেছেন সেটা জেনেই তারা টাকা নেয়। গাড়ি আপনি এক কিলোমিটার দূরে রাস্তা ঘেঁষে রাখবেন না কোথায় রাখবেন তা নিয়ে কর্তৃপক্ষের মাথাব্যথা নেই। ভিতরে ঢুকে মনটা বেশ খারাপই হলো। আকাশভর্তি নীল আর সাদা মেঘের মাঝের ছোট একটি সবুজ গিরি বা পাহাড় হলো নীলগিরি। গিরির খাদে ছিল অল্প কয়েকটি কটেজ। একটু ব্যয়বহুল হলেও সেখানে রাত্রিযাপনে ছিল আলাদা অনুভূতি। স্বস্তির নিশ্বাস নেওয়ার মতো জায়গা ছিল। কিন্তু এবার গিয়ে দেখা গেলো শুধু কটেজ আর কটেজ। খাদে জায়গা নেই, ওপরে উঠে এসেছে। কেমন যেন দমবন্ধ অবস্থা ঠেকলো। কিছু ওয়াকওয়ে, সুদৃশ্য রেলিং করলেও সেগুলো নজর কাড়ছে কম। পুরো স্পটটি এখন কমার্শিয়াল স্পেস বলা চলে। পয়সা খরচ করে এত বেশি কমার্শিয়াল জায়গায় আর কিছুদিন পর হয়তো সাধারণ পর্যটকরা যাবেই না।

নীলগিরির যতটুকু এখনো সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে
নীলগিরির একটি বৈশিষ্ট হলো ৩৬০ ডিগ্রিতে পাহাড় দেখা যায়। আশপাশের উঁচু পাহাড় বলতে জীবননগর। পুরো পাহাড়টি জুড়ে এখন ইট-কাঠের স্থাপনা। বিভিন্নভাবে বানানো হয়েছে। যতটুকু জানা যায় জায়গাটি সেনা নিয়ন্ত্রিত। উত্তর দিকে হেলিপ্যাডের জায়গাটি প্রায় আগের মতোই আছে। তবে পাহাড়ের যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সেটা অনেকটা ব্যাহত এখন নীলগিরিতে। বেশিক্ষণ থাকতে মন চাইলো না। নীলগিরি যতবার গিয়েছি সেখানকার ফল সাংঘাতিক রকম পছন্দ। ৯০ টাকা দিয়ে বিশাল একটি পেঁপে আর কলা কেনা হলো। যাওয়ার সময় দুটো জাম্বুরা নেওয়া হলো বেশ কম দামে। পেঁপেটা এত বেশি মিষ্টি আর ভালো ছিল ছয়-সাতজনে ভরপুর খেয়ে মন ভরে গেলো। পরে আরও একটি নেওয়া হলো। এখানে অনেকগুলো দোকান পাবেন। নীলিগিরি গেলে অন্তত এই ফল খেতে ভুলবেন না।
ভারতের দক্ষিণের বিখ্যাত একটি পর্যটন শহর উটি। একবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। উটি যাওয়ার পথেও নীলগিরি নামে পাহাড় পড়ে। সেখানে বন্য জীবজন্তু দেখা যায়। তারা খুব নিরাপদে ঘুরে বেড়ায়। রাস্তার কাছে চলে আসে। যদিও আমরা নীলগাই ও কিছু বানর ছাড়া অন্য কিছু দেখতে পাইনি। উটি, স্টারলিং পাহাড়গুলো ব্রিটিশরা বসবাস উপযোগী করেছিল। তারাও পাহাড়কে পর্যটন এলাকা বানিয়েছে। সেখানে নিয়মিত ভারতীয় চলচ্চিত্রের শুটিং হয়। প্রায় সাত হাজার ফুটের পাহাড়ে প্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধ। স্থাপনা আছে ঠিকই, তবে সবই পরিকল্পিত। কেউ চাইলেই স্থাপনা বানাতে পারে না। সাজানো, গোছানো ছবির মতো। কিন্তু আমাদের তাদের চেয়ে বেশি সুন্দর সবুজ পাহাড়কে ইচ্ছামতো কাঁটাছেঁড়া করে শেষ করে দিচ্ছি। নিয়মনীতি তো দূরের কথা।

টাইটানিক ভিউ
রোদ বাড়লে পাহাড়ের সৌন্দর্য আস্তে আস্তে ম্লান হয়। স্বস্তি দেয় না। তপ্ত দুপুরে ফিরতি পথের যাত্রা শুরু হলো। নীলগিরি থেকে চিম্বুক পর্যন্তও বেশ চড়াই-উতরাই। আঁকাবাঁকা পথ। পথের ধারে ড্রাগনসহ বিভিন্ন ধরনের ফলের বাগান আগের চেয়ে বেশি মনে হলো। জাম্বুরা বস্তাবন্দি দেখা গেলো কয়েক জায়গায়। ট্রাকে চড়ে তার গন্তব্য হয়তো শহরে। পেঁপে, লাউ, মিষ্টি কুমড়াও চাষও কম নয়। এখন আমও হয় প্রচুর। সর্পিল পথ ধরে কিছুদূর এগোতেই ডাবল হ্যান্ড ভিউ পয়েন্ট। অল্প একটু জায়গা নিয়ে জেলা প্রশাসন করেছে এটা। পাহাড়ের কোলে দু হাত প্রসারিত করে রাখলে যেমন দেখায় তেমন ভিউয়ের জন্য এর নাম ডাবল হ্যান্ড ভিউ। দুই হাতে দুজন দাঁড়িয়ে ছবি তোলা এখানের অন্যতম আকর্ষণ। মনে হলো এখান থেকে যে ভিউ তা দেখার জন্য দুপুর নয়, মেঘভর্তি সকালে যেতে হবে।
আরও একটু এগিয়ে এবার গাড়ি থামলো টাইটানিক ভিউ পয়েন্টে। এখন বান্দরবানের অন্যতম জনপ্রিয় স্পট। টাইটানিক জাহাজের রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে জ্যাক আর রোজের দু-হাত প্রসারিত করে সেই আইকনিক পোজের স্থানের আদলে তৈরি এটা। এখানে এসে সবাই সেই পোজে ছবি তোলে। রীতিমতো সিরিয়াল ধরে ছবি তুলতে হয়। এখানেও দক্ষিণের বিস্তীর্ণ সবুজ গিরিখাদ। সকালের জমে থাকা মেঘ ভিউটা অন্য মাত্রায় নিয়ে যেত নিশ্চয়।

নতুন সাজে চিম্বুক
এবার বেশ খানিকক্ষণ টানা চলে পৌঁছাতে হবে চিম্বুক পাহাড়। এক সময় এটাই ছিল বান্দরবানের পর্যটনের মূল আকর্ষণ। প্রায় আড়াই হাজার ফুট উঁচু এ পাহাড়টিই ছিল শহরের কাছাকাছি প্রিয় গন্তব্য। নীলগিরিতে খাওয়া ফল চলার পথে ঝাঁকিতে তখন প্রায় হজম হওয়ার পথে। পেটে টান পড়েছে। চিম্বুক নেমে হোটেলে খাবার অর্ডার করে ২০ টাকা টিকিট কেটে উঠতে লাগলাম চিম্বুক চূড়ায়। এখানে খাবার আগে থেকে তৈরি করে রাখে না। অর্ডার করে তৈরি করে। শহরে ফিরতে দেরি হবে বিবেচনায় সেখানে খাওয়ার সিদ্ধান্ত। চিম্বুকে আগে ফ্রি ওঠা যেত। কয়েক বছর আগে চিম্বুককে ঢেলে সাজিয়েছে জেলা প্রশাসন। সেখানে থাকার ব্যবস্থাও আছে। সওজের একটি বাংলোও তৈরি হয়েছে। আছে একটি রেস্টুরেন্টও।

নীলাচলের ভোর
চিম্বুক ভালো লাগার প্রথম কারণ এখানকার বিশাল খোলা জায়গা। দারুণ একটি চত্বর, খোলা মঞ্চ, বসার জায়গা তৈরি করা হয়েছে। বেশ সুদর্শন। চারপাশে কাঞ্চনসহ বিভিন্ন ফুলের সমাহার। বিশাল বটের ছায়ায় মঞ্চ। সামনে পাহাড়ের বুকে খোলা জায়গায় বসে পারফরম্যান্স দেখতে পারবে কয়েকশ মানুষ। পেটের টানে দুপুরের কাঠখোট্টা সৌন্দর্য বেশিক্ষণ উপভোগ করতে ভালো লাগলো না। দ্রুত নেমে খেয়েদেয়ে ফিরলাম নীলাচল। সূর্যাস্ত দেখার শ্রেষ্ঠ জায়গা বলা হয় নীলাচলকে। এজন্য এখানে বিকেলে ভিড় জমে বেশি। রাতে জার্নির পর টানা ভ্রমণে সবাই ক্লান্ত। সূর্যাস্ত দীর্ঘক্ষণ উপভোগ করার মতো অবস্থা ছিল না। নীলাম্বরি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার ও সকালের নাশতার অর্ডার করে ফিরলাম রুমে। রাতে ব্যাম্বো চিকেনের ব্যবস্থা করা যায়নি নিচে নেমে কাঁচা বাঁশ কাটার লোকের অভাবে। তাই বারবিকিউ আর নানরুটিতে তুষ্ট থাকতে হলো। কটেজের মতো রেস্টুরেন্টটিও কিন্তু দারুণ। খাবার খুবই স্বাস্থ্যকর এবং পরিচ্ছন্ন। সকালে বাইরের খোলা চত্বরে টেবিল বসিয়ে মেঘের সঙ্গে মিলেমিশে প্রাতরাশ সারার এমন পরিবেশ বান্দরবানের আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। চার হাজার টাকা রুম ভাড়ায় যারা নীলাম্বরিতে থাকেন তারা অর্ডার করলেই এখানে খাওয়া যায়। এছাড়া আগে অর্ডার করলে অন্যরাও খেতে পারেন।

পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙলো সূর্য জাগার আগে। দরজা খুলে বেলকনি যেতেই ভিজিয়ে দিলো একদল মেঘ। ঘরের মধ্যেও তখন মেঘের বাসা। অদ্ভুত সে অনুভূতি। সবাইকে ডেকে তুলে বের হলাম হাঁটতে। সামনে পূর্ব দিকে নবচত্বরসহ কয়েকটি ভিউ পয়েন্ট তৈরি করা হয়েছে। রুম ছেড়ে বের হতে হতেই আলোর রেখা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। মেঘ, সারি সারি গাছ ফুঁড়ে রশ্মি পড়ছে চোখেমুখে। রবীন্দ্রনাথের নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের মতো পৃথিবীকে যেন নতুন করে আবিষ্কারের কথা মনে পড়লো।

এমন আবাস যে কেউ উপভোগ করতে চাইবেন
চারদিকে কুয়াশার টুপটাপ শব্দ, লজ্জাবতী গাছগুলো আমাদের পদস্পর্শে তার স্বভাব দেখাচ্ছে। ফুল ফুটেছে অনেক গাছে। গোলাপি কদমের মতো। পাহড়ের এক ধরনের গন্ধ আছে। অদ্ভুত আবেশ করা সে গন্ধ। বর্ণনা করে বোঝানো মুশকিল। সেই গন্ধই টানে হৃদয়পানে। চারদিকে মেঘে ঢাকা। এই মেঘ উপভোগ করতে হলেও আমাদের পাহাড়ে যাওয়া উচিত একবার। ভোর ৬টার পরও দু-একজনকে দেখা গেলো পাহাড়ের রূপ দেখতে এসেছেন বাইরে থেকে। হয়তো নীরবতার মাঝে পাহাড়কে, জীবনকে নতুন করে উপলব্ধির আশায়। বাবা-মা, মামা-মামি বয়সী হলেও তারা সব কষ্ট ভুলে দিব্যি হেঁটে হেঁটে সব উপভোগ করলেন। সঙ্গ দিলো সহধর্মিনী। ছেলে আদৃতর প্রথম পাহাড় দেখা। খোলা জায়গা পেয়ে সে দৌড়ে বেড়ালো। প্রতিটি ক্ষেত্রে তার ছিল প্রথম দেখার বিস্ময়। পাহাড় মানেই বৈচিত্র্য, মানুষকে অনেক কিছু শেখায়। শীত শীত সকালে চূড়ায় বসে জীবনকে নতুন করে উপলব্ধি করতে পারার চেয়ে বড় পাওয়া আর কী আছে!

এবারের বান্দরবান যাত্রা এখানেই শেষ। যাওয়ার আগে শহরের আদিবাসী জাদুঘর ঘুরে যাওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে বেশ বেগ পেতে হলো। স্থানীয়রা প্রায় কেউ চেনেন না। কয়েক দফা শুনে বুঝিয়ে পরে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ভিতরে জাদুঘরে পৌঁছানো গেলো। গিয়ে দেখা গেলো কয়েকজন স্কটিশ গবেষক সেখানে খুঁটে খুঁটে সব দেখছেন। তার আগে বান্দরবান বাজারে বার্মিজ মার্কেটেও ঢুঁ মারা হলো। বেশ সস্তায় কেনা হলো টুকটাক কিছু পোশাক-আশাক। রাঙ্গামাটির তুলনায় এখানে পণ্য সস্তা।

জাদুঘর
যাইহোক, জাদুঘরে আছে পাহাড়ে বসবাস করা বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর ব্যবহার্য অংলকার, আসবাব, পোশাক, বাদ্যযন্ত্র, জীবনযাত্রায় ব্যবহার করা বিভিন্ন উপকরণ। মোটামুটি পাহাড়কে জানার জন্য দারুণ একটি জায়গা। হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে এসে বিদেশিরা সেখানে উপস্থিত হলেও দেশি পর্যটকরা জানেনেই না বলতে গেলে। বান্দরবান গেলে অবশ্যই ঘুরে আসবেন এ জাদুঘরে। দারুণ আরও কিছু সময় পার করে বান্দরবানের যাত্রা শেষ হলো। পরবর্তী গন্তব্য লেক আর পাহাড়ের দেশ রাঙ্গামাটি। সে গল্প অন্য আরেকদিন।
এএসএ