ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. নারী ও শিশু

প্রতিকূলতা জয়: ঢাকা বিভাগে ৫ জন পেলেন ‘অদম্য নারী পুরস্কার’

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ০৬:৪১ পিএম, ০২ মার্চ ২০২৬

নানা বাধা, দারিদ্র্য, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতাকে পেছনে ফেলে আত্মপ্রতিষ্ঠার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ঢাকা বিভাগের পাঁচ নারী। তাদের এই সংগ্রামী ও অনুপ্রেরণাদায়ী পথচলাকে স্বীকৃতি জানাতে ‘অদম্য নারী পুরস্কার-২০২৫’ দেওয়া হয়েছে।

সোমবার (২ মার্চ) রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উদ্যোগে এবং ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠানটি হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব। ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জিনাত আরা এবং ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক।

প্রতিবারের মতো এবারও পাঁচটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে পাঁচজন নারীকে সম্মানিত করা হয়। অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী হিসেবে টাঙ্গাইলের আরিফা বেগম, শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে কৃতিত্বের জন্য মুন্সিগঞ্জের মারুফা আক্তার, সফল জননী হিসেবে কিশোরগঞ্জের নাছরিন আক্তার, নির্যাতনের দুঃসহ অভিজ্ঞতা পেরিয়ে জীবনসংগ্রামে জয়ী হওয়ায় শরীয়তপুরের মুক্তা আক্তার এবং সমাজ উন্নয়নে অবদানের জন্য ফরিদপুরের মোসা. আফরোজা ইয়াসমিন এ সম্মাননা লাভ করেন।

আরিফা বেগম
টাঙ্গাইলের আরিফা বেগমের জীবনের গল্প অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক। পারিবারিক অশান্তি ও অভাবের কারণে মাত্র ১৫ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়। এর আগে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াকালীন অন্যের সেলাই দেখে কাজ শেখেন তিনি। বিয়ের পর স্বামীর একটি তাঁত দিয়ে শুরু করেন শাড়ি, থ্রি-পিস ও পাঞ্জাবি তৈরির কাজ। পরে বাবার বাড়ি থেকে আরও দুটি তাঁত এনে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন।

মাত্র ৫০ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে শুরু করা উদ্যোগটি এখন ৪১ লাখ টাকার প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে আরিফার কারখানায় ২০টি তাঁত রয়েছে এবং ৩৫ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। মাসিক আয় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। বাংলাদেশ সামাজিক ব্যবসায় উদ্যোক্তা মেলায় সর্বোচ্চ পণ্য বিক্রি করে ৩০ জনের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি।

মুক্তা আক্তার
শরীয়তপুরের মুক্তা আক্তারের জীবন ছিল শোক ও প্রতারণায় ভরা। সাত বছর বয়সে বজ্রপাতে বাবা ও বড় ভাইকে হারান। পরে প্রতারণার শিকার হয়ে বিয়ে করতে বাধ্য হন। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় জানতে পারেন স্বামীর আগের স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে। স্বামী ভরণপোষণ বন্ধ করে দিলে চরম দুর্দশায় পড়েন তিনি। কাজের সন্ধানে সৌদি আরবে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরেন।

পরবর্তীতে শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির (এসডিএস) সহায়তায় ঘুরে দাঁড়ান মুক্তা। বর্তমানে তিনি বিদেশে প্রতারণার শিকার হয়ে ফেরা নারীদের পুনর্বাসন এবং মানবপাচার প্রতিরোধে কাজ করছেন। উঠান বৈঠকের মাধ্যমে ৩৫০ জনের বেশি মানুষকে সচেতন করেছেন।

মারুফা আক্তার
মুন্সিগঞ্জের মারুফা আক্তারের স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া। আর্থিক সংকট ও দীর্ঘ যাতায়াতের কষ্ট সহ্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন তিনি। স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জনের পর চার মাসের সন্তান কোলে নিয়েই এমফিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সফল হন। বর্তমানে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে লোক প্রশাসন বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।

নাছরিন আক্তার
কিশোরগঞ্জের নাছরিন আক্তারের বিয়ে হয় মাত্র ১৩ বছর বয়সে। স্বামীর ব্যবসায়িক ব্যর্থতা ও অসুস্থতায় সংসারের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন। দর্জির কাজ করে সন্তানদের মানুষ করেন। ২০০৯ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর ছয় সন্তানকে একাই বড় করে তোলেন। আজ তার চার মেয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক, এক ছেলে ইতালিতে দক্ষ কর্মী ও ছোট ছেলে জার্মানির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত।

আফরোজা ইয়াসমিন
ফরিদপুরের আফরোজা ইয়াসমিন অল্প বয়সে বিয়ে ও দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা বন্ধ হলেও থেমে যাননি। মাত্র ৩৭৫ টাকা বেতনে ব্র্যাকের শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যান। দীর্ঘ ২৫ বছরের প্রচেষ্টায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে নারীদের স্বাবলম্বী করতে আফরোজা হস্তশিল্প ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ২০১২ সালে সুন্নতি প্রি ক্যাডেট স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি শিশু নির্যাতন ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ইউনিসেফ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করছেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী বলেন, দেশের নারীরা নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এগিয়ে যাচ্ছেন এবং সমাজ এখন তাদের সাফল্য গ্রহণে প্রস্তুত। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৯১ সাল থেকে দীর্ঘ সময় ধরে নারীরা দেশের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং একটি সুন্দর সমাজ গঠনে তাদের অবদান অনস্বীকার্য।

অনুষ্ঠান শেষে অতিথিরা সম্মাননাপ্রাপ্ত নারীদের হাতে ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেন। উপস্থিত সুধীজনের মতে, এই স্বীকৃতি সমাজের অন্যান্য অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য শক্তিশালী প্রেরণা হয়ে থাকবে।

এমডিএএ/একিউএফ