আইসিটিতে নারী নেতৃত্ব গড়ে তুলতে মানসিকতা বদলানো জরুরি
ফারহানা এ রহমান
দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সফল ও শীর্ষ নারী নেতাদের একজন ফারহানা এ রহমান। তথ্যপ্রযুক্তি ও সফটওয়্যার খাতের শীর্ষ সংগঠন বেসিসে নেতৃত্ব দিয়েছেন চার মেয়াদে। তার প্রতিষ্ঠান আউটর্সোসিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ওয়েবসাইট ও আইসিটি খাতে তরুণ শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে সফটওয়্যার সেবাও।
দেশে সরকারের ভ্যাট সংগ্রহে তার প্রতিষ্ঠানের তৈরি ইউওয়াই সিস্টেমের ভ্যাট ক্যালকুলেটর বিশেষ ভূমিকা রাখছে। নারী দিবস সামনে রেখে জাগো নিউজের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন আইসিটি খাতের শীর্ষ নারী নেতৃত্ব ইউওয়াই সিস্টেম্স লিমিটেডের সিইও এবং চেয়ারপারসন ফারহানা এ রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এমদাদুল হক তুহিন।
জাগো নিউজ: প্রযুক্তি খাতে একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পথচলা কতটা কঠিন ছিল?
ফারহানা এ রহমান: সত্যিকার অর্থে কেউ উদ্যোক্তা হয়ে জন্মায় না। ধীরে ধীরে পথ তৈরি করতে হয়। আমি যখন শুরু করি তখন আমার সামনে কোনো রোল মডেল ছিল না। একেবারে নিজের মতো করে পথ তৈরি করতে হয়েছে। সেই পথ তৈরি করা সহজ ছিল না, কারণ একজন উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে অনেক জায়গায় গ্রহণযোগ্যতা দরকার হয়। একজন উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে যেমন কর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা দরকার, তেমনি ক্লায়েন্টদের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা দরকার।
উদ্যোক্তা হতে হলে নানা ধরনের স্কিল থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে মেয়েরা যেভাবে বড় হয়, সেখানে তারা অনেক ক্ষেত্রেই সংরক্ষিত পরিবেশে থাকে। ফলে লেখাপড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গায় কাজ করা বা নেটওয়ার্ক তৈরি করার সুযোগ তাদের তুলনামূলক কম থাকে। এ কারণে প্রযুক্তি খাতে একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে উঠে আসা এখনো অনেক কঠিন।
জাগো নিউজ: নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলো কী?
ফারহানা এ রহমান: সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে গ্রহণযোগ্যতা। যখন আমি কোনো সিদ্ধান্ত দিই, তখন সহকর্মীরা দেখতে চান আমার আগের কাজের রেকর্ড কী, আমি কোথায় কাজ করেছি, কী ধরনের সাফল্য আছে। একজন ছেলে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে, তখন সে অনেক জায়গায় কাজ করে, প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়, বিভিন্ন নেটওয়ার্ক তৈরি করে। ফলে তার একটা রেফারেন্স তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ অনেক সময় থাকে না। ফলে যখন তারা নেতৃত্বের জায়গায় আসে, তখন অনেকেই তাদের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ করে। ক্লায়েন্টদের ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা যায়।
কেউ প্রকাশ্যে না বললেও অনেক সময় মনে করা হয়—একজন নারী কি টেকনোলজি কোম্পানি দীর্ঘদিন চালাতে পারবেন? দুদিন পরে যদি তিনি অন্য কারণে কাজ ছেড়ে দেন তাহলে সার্ভিস কে দেবে? এ ধরনের মানসিকতা এখনো অনেক জায়গায় রয়েছে।
জাগো নিউজ: ব্যবসা বা নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নারীদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কী?
ফারহানা এ রহমান: আমাদের সমাজে একটা প্রচলিত ধারণা আছে—মেয়েরা নাকি অংক বা বিজ্ঞান ভালো পারে না। ছোটবেলা থেকেই এই ধারণা ছেলেমেয়ে উভয়ের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ফলে অনেক সময় মেয়েরা নিজেরাও প্রযুক্তি বা ব্যবসার দিকে যেতে আগ্রহী হয় না। আরেকটি বিষয় হলো ‘অ্যাম্বিশন’। একটি ছেলে যদি ব্যবসা নিয়ে খুব আগ্রাসীভাবে কাজ করে, তখন আমরা বলি সে খুব ভালো ব্যবসায়ী হবে। কিন্তু একটি মেয়ে যদি একইভাবে কাজ করে, তখন অনেক সময় সেটিকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। এই মানসিকতাই বড় বাধা।
আরও পড়ুন
নারী উদ্যোক্তা হওয়ার অনুকূল পরিবেশ অনুপস্থিত
প্রতিটি বাধাই উদ্যোক্তার বিকাশের একটি সুযোগ
নারীর ওপর কোনো হস্তক্ষেপই কাম্য নয়
জাগো নিউজ: ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোতে নারী নেতৃত্বকে কীভাবে গ্রহণ করা হয়?
ফারহানা এ রহমান: যে কোনো জায়গায় নারী নেতৃত্ব নিজেকে প্রমাণ করতে হয়—ঘরে হোক বা বাইরে। বিশেষ করে আইসিটি সংগঠনগুলোতে সদস্যদের বড় অংশই পুরুষ। সেখানে একজন নারী সদস্যের পক্ষে একা কিছু করা সহজ নয়। তাকে তার পুরুষ সহকর্মীদের আস্থা অর্জন করতে হয়। তারা যখন বিশ্বাস করেন যে এই ব্যক্তি পারফর্ম করতে পারবেন, তখনই তাকে সামনে এগিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সংগঠনে কাজ করা আর ব্যবসা করা দুই ধরনের আলাদা দক্ষতা। অনেক মানুষের সঙ্গে কাজ করে নিজের জায়গা তৈরি করার জন্য ভিন্ন ধরনের স্কিল প্রয়োজন হয়।
জাগো নিউজ: আইসিটি খাত আপনি নারীদের জন্য কতটা সম্ভাবনাময় মনে করেন?
ফারহানা এ রহমান: আমি মনে করি আইসিটি খাত নারীদের জন্য খুবই সম্ভাবনাময়। কারণ এখানে কাজের ধরন অনেকটা ফ্লেক্সিবল। আউটসোর্সিং বা প্রযুক্তি খাতে অনেক সময় নির্দিষ্ট ৯টা থেকে ৫টা অফিসের প্রয়োজন হয় না। ঘরে বসেও কাজ করা যায়। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অনেক নারী সংসার ও সন্তান সামলানোর কারণে বাইরে নিয়মিত চাকরি করতে পারেন না। কিন্তু প্রযুক্তি খাতে তারা বাসা থেকেও কাজ করতে পারেন। শুধু প্রয়োজন সঠিক দক্ষতা ও পেশাদার মানসিকতা।
জাগো নিউজ: নতুন প্রজন্মের নারীদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
ফারহানা এ রহমান: কোভিড-১৯ এর পরে প্রযুক্তি খাতে অনেক নতুন ধরনের পেশা তৈরি হয়েছে। যেমন সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট তৈরি, ডিজিটাল মার্কেটিং, অনলাইন প্রমোশন, গ্রাফিক ডিজাইনসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ। সবাইকে যে সফটওয়্যার ডেভেলপার হতে হবে এমন নয়। কেউ ভালো লিখতে পারে, কেউ ভালো ডিজাইন করতে পারে, কেউ ভালো উপস্থাপনা করতে পারে— বিভিন্ন দক্ষতার ভিত্তিতেও প্রযুক্তি খাতে কাজ করা সম্ভব।
এছাড়া এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার সিকিউরিটি, ডেটা অ্যানালিটিক্সসহ অনেক নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে নতুন প্রজন্মের উচিত এই নতুন ক্ষেত্রগুলো নিয়ে কাজ করা। জ্ঞান অর্জন করা।
জাগো নিউজ: নতুন সরকারের কাছে আইসিটি খাতের প্রত্যাশা কী?
ফারহানা এ রহমান: একটি শিল্পখাত এগিয়ে নিতে হলে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হয়। কিন্তু গত কয়েক বছরে আমরা সংগঠনগুলোকে খুব বেশি ব্যবসাবান্ধব কার্যক্রমে দেখিনি। সংগঠনগুলোতে ব্যবসায়ী নেতৃত্ব নেই। আমি আশা করি নতুন সরকার আইসিটি সংগঠনগুলোকে আবারও ব্যবসাবান্ধব কার্যক্রমে সক্রিয় করবে। পাশাপাশি সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কগুলো কার্যকরভাবে চালু করা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের আইসিটি খাত ব্র্যান্ডিং করার দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
জাগো নিউজ: ভবিষ্যতে বেসিসকে কীভাবে দেখতে চান?
ফারহানা এ রহমান: ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আরও শক্তিশালী ভূমিকায় বেসিসকে দেখতে চাই। প্রযুক্তি খাত প্রতিদিন পরিবর্তিত হচ্ছে, তাই প্রতিনিয়ত নতুন নীতিমালা প্রয়োজন। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নিয়ে আমরা অনেক কথা বলেছি, কিন্তু বাস্তবায়নযোগ্য নীতিমালার সংখ্যা এখনো খুব বেশি নয়। এই জায়গাগুলোতে বেসিসকে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের আইসিটি খাত দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণে নেতৃত্ব দিতে হবে বেসিসকে।
ইএইচটি/এএসএ/ এমএফএ