যৌনশিক্ষার অভাবে রোগব্যাধি বাসা বাঁধছে তরুণদের শরীরে

জাহাঙ্গীর আলম প্রকাশিত: ০৯:০২ এএম, ০৯ জুলাই ২০১৯
যৌনশিক্ষার অভাবে রোগব্যাধি বাসা বাঁধছে তরুণদের শরীরে

যৌন ও প্রজনন শিক্ষার অভাবে তরুণদের শরীরে জটিল রোগব্যাধি বাসা বাঁধছে। এসব কারণে শুধু পারিবারিক নয়, চিকিৎসার ব্যয়ভারও বেড়ে যায়। এ অবস্থায় কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা দিতে সরকার নানামুখী কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।

এদিকে বাল্যবিয়ের কারণে দেশের মেয়েরা অল্প বয়সেই গর্ভধারণ করছে, যা মাতৃমৃত্যু এবং অপুষ্ট শিশু জন্মদানের প্রধান কারণ। এই শিশুরাও সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারছে না। অল্প বয়সে মা হওয়ায় অনেক মেয়েও নানা জটিল রোগে ভুগে থাকে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে তরুণদের উপযোগী কাউন্সেলিং সেবা নিশ্চিত করতে হবে। যৌন ও প্রজনন শিক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে।

বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১৮০ কোটি তরুণ। এর বেশিরভাগই বাস করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশই তরুণ। টেকসই উন্নয়ন ও ভবিষ্যতের নেতৃত্ব থাকবে এই তরুণদের হাতে। এই বিশালসংখ্যক তরুণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন গুণগত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল, বাংলাদেশের প্রতিনিধি আর্জেন্টিনা মেটাভেলের মতে, যদি এই তরুণদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও পেশা নির্বাচনের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে তারা অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জনে সক্ষম হবে।

অ্যাডভান্স ফ্যামিলি প্ল্যানিং বা এফপি ২০২০ নিয়ে যেসব দেশ কাজ করছে বাংলাদেশ তার অন্যতম। বাংলাদেশ সরকার এফপি ২০২০ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তবে আজও দুই কোটিরও বেশি ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সী যুব ও কিশোর-কিশোরীর উচ্চমানের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ নেই। যা তাদের ক্ষমতায়নের জন্য সহায়ক হিসেবে কাজ করত। অনেক তরুণকেই পরিবার পরিকল্পনার আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহারের ব্যাপারে অনুৎসাহিত করা হচ্ছে। এর মূলে রয়েছে বৈষম্য, সামাজিক কুসংস্কার এবং তথ্য পাওয়ার অভাব। এ ছাড়াও বয়ঃসন্ধিকালীন যে মানসিক অবস্থা তৈরি হয়, তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য নেই পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং সেবা। আবার অনেকে গোপনীয়তা সংকটের কারণেও কাউন্সেলিং সেবা নিতে যায় না। এ ক্ষেত্রে তরুণদের উপযোগী কাউন্সেলিং সেবা নিশ্চিত করতে হবে। যৌন ও প্রজনন শিক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে।

এ ক্ষেত্রে সরকার, এনজিও, ধর্মীয় নেতা এবং সুশীল সমাজের একযোগে কাজ করা প্রয়োজন। নতুবা সম্ভাবনাময় এই বিশাল জনগোষ্ঠী দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। দেশের রাজনীতি, সামাজিক পরিস্থিতি, শান্তি ও অর্থনীতির জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তাই সংশ্নিষ্ট নীতিনির্ধারকদের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা এবং তরুণদের জন্য যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যসেবা খাতের নীতিমালায় যথাযথ পরিবর্তন আনতে হবে।

চলতি বছর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক বৈশ্বিক উন্নয়ন নীতিমালার উৎস-ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন পপুলেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইসিপিডি) ২৫ বর্ষপূতিতে বাংলাদেশের তরুণদের মত, ভাবনা এবং তাদের প্রয়োজনগুলোর ভিত্তিতে আটটি বিভাগের তরুণদের ওপর একটি যৌথ প্রতিবেদন তৈরি হচ্ছে। সিরাক-বাংলাদেশ ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল এটি তৈরি করছে। এ ছাড়াও আগামী ২০-২১ অক্টোবর সিরাকের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হবে ‘বাংলাদেশ চতুর্থ জাতীয় যুব পরিবার পরিকল্পনা সম্মেলন’। এ সম্মেলনে নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি তিন শতাধিক তরুণ ও কিশোর-কিশোরী তাদের চাহিদা, স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা বিষয়ে মতামত তুলে ধরার সুযোগ পাবে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও এফপি ২০২০-এর রেফারেন্স গ্রুপে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি কাজী মহিউল ইসলাম বলেন, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে বর্তমান সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্য কর্নারের (এএফএইচসি) মতো উদ্ভাবনী প্রকল্পগুলো।

এসব কর্নারে কিশোর-কিশোরীরা প্রজনন সেবা ও তথ্য পাচ্ছে এবং তাদের আগ্রহী করে তুলতে প্রয়োজনীয় তথ্য নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়। পাশাপাশি সামাজিক আচরণ পরিবর্তন যোগাযোগ কার্যক্রমের আওতায় দেশব্যাপী প্রচার, আলোচনা অনুষ্ঠান-টকশো, বিতর্ক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের সম্পৃক্ত করে তাদের মধ্যে সামগ্রিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এর বাইরেও আমরা চেষ্টা করছি তরুণদের কথা শুনতে।

সিরাক-বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এস এম সৈকত বলেন, কিশোরীদের অল্প বয়সে গর্ভধারণ, পুষ্টিহীনতাসহ নানা স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণ বাল্যবিয়ে। এ ক্ষেত্রে ঝুঁকি এড়াতে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের কাছে পরিবার পরিকল্পনার সেবা ও তথ্য পৌঁছানো খুবই জরুরি। সেবাদাতা ও গ্রহীতার মাঝে সম্পর্ক উন্নয়ন মানসম্মত সেবার একটি সূচক। সে অর্থে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা ও তথ্যগুলো যারা দেবেন তাদের হতে হবে তরুণবান্ধব। এ ক্ষেত্রে শুধু বিবাহিত নয় বরং সব তরুণ-কিশোর-কিশোরীর ওপর জরিপ করতে হবে, জানতে হবে তারা কী চায়, কীভাবে চায় এবং তা কেমন পরিবেশে চায়।

মেরী স্টোপস, বাংলাদেশের অ্যাডভোকেসি ম্যানেজার মঞ্জুন নাহার বলেন, বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে তরুণ সমাজকে সেবার আওতায় আনতে তরুণদেরই সহযোগিতা নেওয়া এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদফতর, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদফতর, নিপোর্টের মতো প্রতিষ্ঠানের কাজেও তরুণদের কার্যকর অংশগ্রহণ জরুরি।

জেএ/এসএইচএস/এমকেএইচ

সর্বশেষ - নারী ও শিশু

জাগো নিউজে সর্বশেষ

জাগো নিউজে জনপ্রিয়