ফিচার

যার সংগ্রহে যত তিমির দাঁত, বিয়ের পাত্র হিসেবে সে তত এগিয়ে

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিয়ের পাত্র নির্বাচনে বাবা-মা অনেক কিছুই দেখেন। তার সৌন্দর্য, আয়, সম্পদ, ঘর-বাড়ি, বংশ পরিচয়। কিন্তু ফিজির বাবা-মা দেখেন পাত্রের সংগ্রহে কতগুলো তিমির দাঁত আছে। এই দাঁত দিয়েই পাত্ররা বিয়ের প্রস্তাব দেন পাত্রীকে। যার কাছে যত বেশি থাকবে তার বর হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি।

দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলরাশির মাঝে ছড়িয়ে থাকা দ্বীপপুঞ্জ ফিজি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নীল সমুদ্র, প্রবাল প্রাচীর আর উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই দেশটির সংস্কৃতিতে রয়েছে এমন কিছু প্রথা, যা আধুনিক বিশ্বের চোখে বিস্ময় জাগায়। তেমনই এক ব্যতিক্রমী ও গভীর অর্থবহ প্রথা হলো তিমি মাছের দাঁত দিয়ে বিয়ের প্রস্তাব। ফিজির সমাজে এই দাঁত শুধু একটি বস্তু নয়; এটি সম্মান, প্রতিশ্রুতি, সামাজিক বন্ধন এবং শত শত বছরের ঐতিহ্যের প্রতীক।

ফিজির স্থানীয় ভাষায় তিমির দাঁতকে বলা হয় ‘তাবুয়া’। এটি মূলত স্পার্ম হোয়েল বা দাঁতওয়ালা তিমির দাঁত, যা প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া গেলে অত্যন্ত মূল্যবান বলে বিবেচিত হয়। ইতিহাসে দেখা যায়, তাবুয়া শুধু বিয়ের প্রস্তাবেই নয়, বরং শান্তিচুক্তি, ক্ষমা প্রার্থনা, রাজনৈতিক সমঝোতা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

ফিজিয়ান সংস্কৃতিতে তাবুয়া মানে কেবল ধনসম্পদ নয়; এটি নৈতিকতা, সম্মান ও দায়িত্বের প্রতীক। কেউ যখন তাবুয়া প্রদান করে, তখন সে আসলে নিজের মান-সম্মান ও বিশ্বাস অন্যের হাতে তুলে দেয়। ফিজিতে বিয়ের আগে প্রেমিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো তাবুয়া সংগ্রহ করা। সরাসরি প্রেমিকার কাছে প্রস্তাব দেওয়ার আগে পুরুষকে তার পরিবার ও সমাজের সম্মতি অর্জন করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় তাবুয়া অপরিহার্য।

বিয়ের প্রস্তাব সাধারণত ছেলের পরিবারের পক্ষ থেকে মেয়ের পরিবারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। সেই সময় পরিবারের প্রবীণ সদস্য বা গোত্রপ্রধানের হাতে তাবুয়া তুলে দেওয়া হয়। এই দাঁতটি দেওয়া মানে হলো ছেলে ও তার পরিবার মেয়েটিকে সম্মান করছে, দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত এবং ভবিষ্যৎ জীবনে তাকে রক্ষা করবে।

বর্তমানে তিমি শিকার আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ। তাই আধুনিক ফিজিতে তাবুয়া সংগ্রহ করা সহজ নয়। বেশিরভাগ তাবুয়া আসে পুরোনো সংগ্রহ,পারিবারিক উত্তরাধিকার বা ঐতিহ্যগতভাবে সংরক্ষিত দাঁত থেকে। অনেক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটি তাবুয়া আগলে রাখে, শুধু বিশেষ উপলক্ষের জন্য।

কখনো কখনো তাবুয়া ধার করেও বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে ধার নেওয়া তাবুয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রেও রয়েছে কঠোর সামাজিক নিয়ম। দাঁতটি যথাযথ সম্মানের সঙ্গে ব্যবহার না করলে তা সামাজিকভাবে অপমানজনক বলে বিবেচিত হয়।

তাবুয়া সাধারণত চকচকে ও পালিশ করা থাকে। অনেক সময় এটিকে দড়ি বা কাপড়ে জড়িয়ে রাখা হয়। দাঁতের রং, আকার ও অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। পুরোনো ও ভালোভাবে সংরক্ষিত তাবুয়া বেশি মর্যাদার প্রতীক। বিয়ের ক্ষেত্রে এই দাঁত কেবল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর প্রতীক নয়। যদি মেয়ের পরিবার তাবুয়া গ্রহণ করে, তবে সেটি সম্মতির ইঙ্গিত। আর যদি তারা তা ফিরিয়ে দেয়, তাহলে বোঝা যায় প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়।

এই প্রথার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি নারীর সম্মানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তাবুয়া প্রদান মানে মেয়েটিকে কোনো পণ্য হিসেবে দেখা নয়; বরং তার পরিবার ও সমাজের কাছে তাকে মর্যাদার সঙ্গে গ্রহণ করা। ফিজিয়ান সমাজে বিয়ে কেবল দুই ব্যক্তির সম্পর্ক নয়; এটি দুই পরিবার ও দুই গোত্রের বন্ধন। তাই তাবুয়া দিয়ে প্রস্তাব দেওয়ার মধ্য দিয়ে পুরুষ পক্ষ দেখায় যে তারা এই সামাজিক দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।

সময় বদলেছে, ফিজিতেও আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। শহুরে তরুণ-তরুণীরা অনেক সময় প্রেম করে নিজেরাই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। তবুও গ্রামীণ অঞ্চল ও ঐতিহ্যপন্থী পরিবারগুলোতে তাবুয়া প্রথা আজও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে এখন আসল তিমির দাঁতের পরিবর্তে প্রতীকী তাবুয়া ব্যবহার করা হয়। এতে প্রথার মূল ভাব বজায় থাকে, কিন্তু পরিবেশ ও আইনগত দিকও রক্ষা করা যায়।

আধুনিক বিশ্বে তিমি সংরক্ষণ একটি বড় বিষয়। তাই ফিজির সমাজও ধীরে ধীরে এই প্রথাকে পরিবেশবান্ধব পথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। সরকার ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো মানুষকে উৎসাহ দিচ্ছে পুরোনো তাবুয়া সংরক্ষণ করতে এবং নতুন করে দাঁত সংগ্রহে নিরুৎসাহিত করছে। এই পরিবর্তনের মধ্যেও তাবুয়ার সাংস্কৃতিক গুরুত্ব কমেনি। বরং এটি এখন আরও বেশি করে পরিচয়ের প্রতীক যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটছে।

তাবুয়া প্রথা ফিজির সমাজে দায়িত্ববোধ তৈরি করে। একজন পুরুষ জানে, বিয়ে শুধু আবেগ নয়; এটি পরিশ্রম, সম্মান ও সামাজিক স্বীকৃতির বিষয়। আবার মেয়ের পরিবারও বুঝতে পারে, এই প্রস্তাব হালকাভাবে আসেনি। এই প্রথা পারিবারিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করে, প্রজন্মের মধ্যে সাংস্কৃতিক জ্ঞান আদান-প্রদান ঘটায় এবং সমাজকে একটি নৈতিক কাঠামোর ভেতরে রাখে।

ফিজির বিয়ের প্রস্তাবে তিমির দাঁত কেবল একটি অদ্ভুত রীতিই নয়; এটি একটি গভীর সাংস্কৃতিক ভাষা। এই দাঁতের ভেতর লুকিয়ে আছে শত বছরের ইতিহাস, মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা।

বিশ্বের নানা প্রান্তে বিয়ের জন্য পণ, আংটি বা উপহার দেওয়ার রীতি থাকলেও তিমির দাঁত দিয়ে বিয়ের প্রস্তাব নিঃসন্দেহে বিরল। এটি প্রমাণ করে, সংস্কৃতি কেবল বাহ্যিক আচরণ নয়; এটি মানুষের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও ইতিহাসের প্রতিফলন। ফিজির তাবুয়া প্রথা আমাদের মনে করিয়ে দেয় ভালোবাসা আর সম্পর্কের ভিত্তি কেবল অনুভূতি নয়, বরং সম্মান, দায়িত্ব আর সামাজিক বন্ধন। আরও পড়ুনবাঙালি বিয়েতে গায়েহলুদ, এই রীতির ইতিহাস কী জানেন?ফটোশুটে আটকে গেছে বিয়ের আয়োজন, ফিকে হয়েছে আনন্দ

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

কেএসকে