ফটোশুটে আটকে গেছে বিয়ের আয়োজন, ফিকে হয়েছে আনন্দ
বাঙালি বিয়ের আয়োজন সর্বদাই ছিল এক জীবন্ত চিত্র। বর-কনে, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব-সবাই মিলে আনন্দ, রঙিন আয়োজন আর নানান আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে নিজেদের সুখ-স্মৃতি তৈরি করে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিয়ের ট্রেন্ড অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। বিশেষ করে গায়েহলুদ, মেহেন্দি, বিয়ে, বৌভাত প্রতিটি অনুষ্ঠান এখন ফোকাস করে শুধু ফটোশুট, ভিডিওগ্রাফি এবং কনটেন্ট তৈরির দিকে। বিয়ের চিরচেনা আনন্দ যেন ফিকে হয়ে গেছে এবং আত্মীয়স্বজনের অংশগ্রহণও অনেকটাই সীমিত হয়ে এসেছে।
এখনকার বিয়েতে ফটোগ্রাফি ও ভিডিওগ্রাফি অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ডিজিটাল কনটেন্টের যুগে বর-কনের পরিবার চাইছে, প্রতিটি মুহূর্ত যেন ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হয়। গায়েহলুদ থেকে মেহেন্দি, বিয়ে থেকে বৌভাত সব অনুষ্ঠানই এখন কেবল ছবি ও ভিডিওর জন্য সাজানো হচ্ছে। ফলে বিয়ের সেই প্রাকৃতিক আনন্দ, যেখানে আত্মীয়-স্বজন একসঙ্গে নাচত, গান করত, গল্প করত, সবাই মিলে বাড়ি-ঘর সাজাতো এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে। বর-কনের সঙ্গে পরিবারের মানুষদের মিথস্ক্রিয়া সীমিত হয়েছে এবং নিজের আনন্দ কেবল ক্যামেরার ফ্রেমে আটকে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।
ফটোশুট কেন্দ্রিক বিয়ের প্রথা কেবল আনন্দের মাত্রাই কমায় না, বরং সামাজিক ও মানসিক প্রভাবও ফেলে। অনেক পরিবার মনে করেন, বিয়ের প্রতিটি মুহূর্ত যেন অনলাইনে শেয়ার করার যোগ্য হতে হবে। ফলে অতিথিরা নিজেদের মনের আনন্দ প্রকাশ করতে পারেন না, বরং তারা একটি সঠিক ছবি তোলার চাপ অনুভব করে। বর-কনেদের জন্যও এটি দ্বিমুখী প্রভাব ফেলে। একদিকে তারা চায় তাদের বিশেষ দিনটি স্মৃতির ফ্রেমে বন্দি হোক, অন্যদিকে চায় আত্মীয় বা পরিবারকেও সময় দিতে, ফলে বিয়ের দিনে তাদের জন্য চাপ তৈরি করে। মনের আনন্দ, হাসি, মজা এসব অনেক সময়ই প্রাকৃতিকভাবে বের হয়ে আসে না।
ডিজিটাল ক্যামেরা, ড্রোন, স্টুডিও সেটআপ এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে বিয়ের প্রতিটি মুহূর্ত ধারণ করা হয়। যদিও এতে বিয়ের স্মৃতি সুন্দরভাবে সংরক্ষিত হয়, তবুও প্রকৃত আনন্দের অনুভূতি অনেকটা ফিকে হয়ে যায়। গায়েহলুদে মেহেন্দি সেজে বসার সময় বর-কনে শুধু ক্যামেরার দিকে তাকাচ্ছেন, অতিথিরা ফ্রেমের মধ্যে সুন্দর দৃশ্য তৈরিতে ব্যস্ত। প্রকৃত আনন্দের মুহূর্ত যেমন হঠাৎ করে পরিবারের হাসি, খেলার আনন্দ, মজার মুহূর্ত এসব হারিয়ে যায়।
গায়েহলুদ অনুষ্ঠান অনেক সময় রঙিন, উজ্জ্বল এবং আনন্দের হয়। কিন্তু বর্তমান ট্রেন্ডে বর-কনের প্রতিটি পজ, হাসি, হাত-পা, বসা সবই ক্যামেরার ফ্রেমে। মেহেন্দি অনুষ্ঠানে বর-কনের হাত-প্রদর্শন, পায়ের মেহেন্দি ডিজাইন সবই ক্যামেরার ফোকাসে থাকে। মেহেন্দি উৎসবের স্বাভাবিক আনন্দের পরিবর্তে বর-কনে ও অতিথিরা ক্যামেরার জন্য সঠিক ছবি খোঁজার চেষ্টা করেন। প্রধান বিয়ে অনুষ্ঠানেও ভেতরের মায়া, আত্মীয়দের সঙ্গে আন্তরিক আলাপ, খোলা হাসি এসব অনেকটা গোপন থাকে। বৌভাত বা বিয়ের শেষ অনুষ্ঠানেও অতিথিরা ক্যামেরা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। বর-কনের সঙ্গেও আত্মীয়দের মজা বা খোলামেলা আলাপ কমে যায়।
তবে নতুন ট্রেন্ডের ভালো দিকও রয়েছে। বর-কনে তাদের বিশেষ দিনটি স্মৃতির ফ্রেমে বন্দি করতে পারছেন। প্রতিটি মুহূর্ত সুন্দরভাবে রেকর্ড হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেখার জন্য রাখা যায়। বিশেষ করে যারা পরবর্তী প্রজন্মকে তাদের বিয়ের ইতিহাস দেখাতে চায়, তাদের জন্য এটি অনেক মূল্যবান। ফটোশুট ও ভিডিওগ্রাফির মাধ্যমে বর-কনের আনন্দের ছবি অনেক সুন্দরভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে। যদিও প্রাকৃতিক আনন্দ কমেছে, তবে ডিজিটাল ক্যামেরার ফ্রেমে এই স্মৃতি দীর্ঘদিন পর্যন্ত টিকে থাকে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিয়ের আনন্দকে পুনরায় ফিরিয়ে আনতে দরকার কিছু ব্যালেন্স। শুধু ফটোশুট বা ভিডিওর দিকে মনোযোগ না দিয়ে, বর-কনেদের এবং আত্মীয়দের প্রাকৃতিক মজা এবং আনন্দের মুহূর্তও সংরক্ষণ করা উচিত। পরিবারের মানুষদের জন্য কিছু সময় রাখা, যেখানে তারা শুধু একসঙ্গে মজা করবে। অতিথিদের ফটোশুটের বাইরে খোলা সময়ে আনন্দ করার সুযোগ দেওয়া। বর-কনেদের সঙ্গে পরিবারের স্মৃতি-মুহূর্ত ধরা, শুধু ফ্রেমের জন্য নয়। অতিথিদেরও ফ্রেমের বাইরে থাকা অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত করা। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে বিয়ের আনন্দ পুনরায় প্রকৃত রূপে ফিরে আসতে পারে।
বর্তমান সময়ে বিয়ের আয়োজন একটি নতুন রূপ নিয়েছে। ফটোশুট, ভিডিওগ্রাফি এবং কনটেন্ট বানানো এখন প্রধান ফোকাস। ফলে বর-কনের আনন্দ এবং আত্মীয়স্বজনের খোলাখুলি অংশগ্রহণ অনেকটা ফিকে হয়ে গেছে। কিন্তু অন্যদিকে, এই ফ্রেম-সেন্ট্রিক অনুষ্ঠান বর-কনেদের জন্য স্মৃতি সংরক্ষণের দারুণ সুযোগ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে যদি কিছু ব্যালেন্স বজায় রাখা যায়, তবে প্রাকৃতিক আনন্দ, হাসি-খুশি এবং ফ্রেমের মধ্যে বন্দি স্মৃতি দুটোই একসঙ্গে পাওয়া সম্ভব। আর সেই দিনগুলোই হবে বিয়ের আসল মধুর স্মৃতি।
আরও পড়ুন
গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী বিয়ের আয়োজন কি হারাতে বসেছে
যেখানে সবাই মেলায় জীবনসঙ্গী খোঁজে, বিয়ের আগেই মা হয় মেয়েরা
কেএসকে