দেশের অন্যতম শীর্ষ একজন ধনীর ছেলে নির্বাচনি হলফনামায় দেখিয়েছেন, তার কোনো জমি, বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট নেই। তার স্ত্রীর আছে ১২০ ভরি স্বর্ণ। এছাড়া ১০ হাজার টাকার অলংকার ও পাঁচ হাজার টাকার আসবাবপত্র রয়েছে তার।
আরেকজন প্রার্থী স্ত্রীর নামে ১৮৭ ভরি স্বর্ণালংকার রয়েছে বলে হলফনামায় উল্লেখ করেন। তিনি নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দেখিয়েছেন মাত্র ১ হাজার ১৭৬ টাকা।
এমন সম্পদ বিবরণী দেখে যে কারও খটকা লাগতে পারে। তার মতো অনেকে এমন সব তথ্য দিয়েছেন যা সাধারণ জনগণের কাছে বিশেষ গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি, যা নিয়ে তৈরি হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।
ইসি স্বপ্রণোদিত হয়ে অডিট করতে পারে, কিন্তু এটা তারা করে না। ইসি যেন স্বপ্রণোদিতভাবে যাচাই-বাছাই করে- এটা জরুরি। জনকল্যাণে সৎ লোক নির্বাচনে দরকার। আইনে যা থাকুক, ইসির হাত অনেক লম্বা। সুষ্ঠু ভোটের জন্য ইসি চাইলে স্বপ্রণোদিতভাবে যাচাই করতে পারে কিন্তু করে না।- সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার
দেশের রাজনীতির হাল যাদের হাতে থাকবে তাদের এমন সম্পদ বিবরণীর রহস্য কী, সেটা নিয়ে রয়েছে নানান প্রশ্ন। নির্বাচন কমিশনই (ইসি) বা কীভাবে যাচাই-বাছাই করে কিংবা আদৌ এগুলোর সত্যতা যাচাই করে কি না সেটাও অনেকটা অজানা সাধারণ মানুষের কাছে।
আরও পড়ুন‘বেনজীরের ক্যাশিয়ার’ জসীমের ৪৪ ফ্ল্যাট-২ বাড়িহলফনামায় তথ্যে গরমিলকে ‘টাইপিং মিসটেক’ বললেন সারজিস আলমপ্রার্থীর হলফনামায় সন্দেহজনক তথ্য থাকলে দুদককে জানানকোটিপতি জামায়াত আমির, আছে ডুপ্লেক্স বাড়ি-নগদ ৬০ লাখ টাকাঢাকায় বিএনপি নেতা ফজলুর দুই ফ্ল্যাট, দাম মাত্র ২০ লাখ টাকা
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, স্বপ্রণোদিতভাবে প্রার্থীর হলফনামা খতিয়ে দেখে না ইসি। প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী বা সংশ্লিষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি যদি হলফনামায় যাচাইয়ের জন্য আপিল করেন তখন ইসি সেটা যাচাই করে। আর প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য ‘অসংগতিপূর্ণ’ মনে হওয়ার কারণের সঙ্গে যুক্ত আয়কর, নিজের নামে সম্পদ না থাকা, স্ত্রীর নামে বেশি সম্পদ দেখানো, নিজেকে সৎ প্রমাণ করা প্রভৃতি কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
হলফনামা কী, যে সব তথ্য দিতে হয়হলফনামা হলো আইনগতভাবে স্বীকৃত দলিল, যেখানে একজন ব্যক্তি শপথ করে বলেন, এতে দেওয়া তথ্য সম্পূর্ণ সত্য ও সঠিক। নির্বাচনি হলফনামায় ব্যক্তিগত (যেমন নাম, বয়স, ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা ইত্যাদি) দিতে হয়। এছাড়া নিজের ও স্ত্রী, সন্তানদের জমি, বাড়ি ইত্যাদি স্থাবর সম্পদ, নগদ টাকা, ব্যাংকে জমা টাকা, সোনা, কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বা মালিকানাসহ অস্থাবর সম্পদের তথ্য দিতে হয়।
হলফনামায় দেওয়া তথ্যের পর্যাপ্ততা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতা দীর্ঘদিনের। এর অন্যতম কারণ, আমাদের দেশের রাজনীতি ও জনপ্রতিনিধিত্বের স্লোগান যদিও জনস্বার্থ, বাস্তবে তা মূলত ক্ষমতার লড়াই আর ক্ষমতার অবস্থান ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ফলে ব্যক্তিগত সম্পদ বিকাশের লাইসেন্সের নামান্তর।- টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীর স্বাক্ষরিত একটি হলফনামা যার সঙ্গে সবশেষ করবছরের আয়কর রিটার্নের কপি সংযুক্ত করে দাখিল করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রার্থীর মনোনয়নপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত হলফনামার নমুনা অনুযায়ী বিভিন্ন তথ্য ও তার স্বপক্ষে কাগজপত্র যথাযথভাবে দাখিল করা হয়েছে কি না এবং হলফনামার তথ্যসমূহ যথাযথ কি না সেটি যাচাই করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তার। এক্ষেত্রে হলফনামায় দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সহায়তা নেওয়া হয়।
প্রার্থীর সম্পদের বিবরণী ঠিক আছে কি না এটা নির্বাচন কমিশনের অডিট করা দরকার। কিন্তু তারা প্রার্থীর সম্পদ অডিট করে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা দেওয়া হলফনামায় বিশ্লেষণ করে জানা যায়, আমজনতা পার্টির তারেক রহমান এবার সবচেয়ে ‘গরিব’ প্রার্থী। তার নামে গাড়ি, বাড়ি, জমি, ফ্ল্যাট কিছুই নেই। পেশা হিসেবে ব্যবসা উল্লেখ করা তারেক ১০ লাখ ৫৯ হাজার ১৪৩ টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন। হাতে নগদ একটি টাকাও নেই।
প্রার্থীর হলফনামা ইসি স্বপ্রণোদিতভাবে যাচাই করে না। তবে প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী বা সংশ্লিষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি যদি হলফনামায় যাচাইয়ের জন্য আপিল করেন, তখন আমরা যাচাই করি।- নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার
হলফনামার তথ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তারেক রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার বাবা-মায়ের সম্পদ আছে, কিন্তু তারা কিছুই আমার নামে এখনো দেননি। সেই হিসেবে আমার কিছু নেই। আমার শ্বশুরের সম্পদ আছে, সেটাও আমার স্ত্রীর নামে নেই। আল্লাহর রহমতে সবাই বেঁচে আছেন। আমার নামে সম্পদ হস্তান্তরের সময় হয়নি।’
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরাজাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রার্থীরা হলফনামায় সঠিক তথ্য দিয়েছেন কি না- এ বিষয়ে গণমাধ্যমের দায়িত্ব আছে। প্রার্থীরা যেন সৎ মানুষকে ভোট দিতে পারেন। হলফনামা নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে সত্যতা নিয়ে। অনেক তথ্য বিভ্রান্তিমূলক। প্রশ্ন সুরাহা করার জন্য গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী রিপোর্ট তৈরি করে প্রকাশ করা দরকার। প্রার্থীরা কতটুকু তথ্য দিয়েছেন, কতটুকু সত্য- এটা অনুসন্ধান করতে হবে। অনুসন্ধানী রিপোর্ট করতে হবে বেশি বেশি।’
ইসি স্বপ্রণোদিতভাবে প্রার্থীর হলফনামা যাচাই করে না জানিয়ে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘ইসি স্বপ্রণোদিত হয়ে অডিট করতে পারে, কিন্তু এটা তারা করে না। ইসি যেন স্বপ্রণোদিতভাবে যাচাই-বাছাই করে- এটা জরুরি। জনকল্যাণে সৎ লোক নির্বাচনে দরকার। আইনে যা থাকুক, ইসির হাত অনেক লম্বা। সুষ্ঠু ভোটের জন্য ইসি চাইলে স্বপ্রণোদিতভাবে যাচাই করতে পারে কিন্তু করে না।’
এই বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘হলফনামার তথ্য নিয়ে আমরা ২০০৫ সাল থেকে লড়াই করে আসছি। উদ্দেশ্য একটাই- জনগণকে ক্ষমতায়িত করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নির্বাচন কমিশন কখনোই প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করেনি। সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকেও আমরা প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে, এসব তথ্য যাচাই করা হোক এবং যারা ভুল তথ্য দেয় বা তথ্য গোপন করে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আইনেও এ ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে।’
প্রার্থীরা হলফনামায় অর্জিত সম্পদের থেকে কম দেখাচ্ছেন কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক এবং দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘হলফনামায় দেওয়া তথ্যের পর্যাপ্ততা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতা দীর্ঘদিনের। এর অন্যতম কারণ, আমাদের দেশের রাজনীতি ও জনপ্রতিনিধিত্বের স্লোগান যদিও জনস্বার্থ, বাস্তবে তা মূলত ক্ষমতার লড়াই আর ক্ষমতার অবস্থান ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ফলে ব্যক্তিগত সম্পদ বিকাশের লাইসেন্সের নামান্তর।’
তিনি বলেন, ‘একই সঙ্গে রয়েছে বৈধ সূত্রের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জন ও কর ফাঁকির স্বাভাবিকতা। এ বাস্তবতার পাশাপাশি সমসাময়িক বাজারমূল্য আর প্রার্থীদের জীবনমানের তুলনায় কোটি টাকার সম্পদ যেমন বিশাল কিছু না, তেমনি হলফনামার তথ্য আয়কর রিটার্নের তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া বাঞ্ছনীয়। সেজন্যই এনবিআরের পাশাপাশি ইসি ও দুদকের কাছে জনগণের প্রত্যাশা কোনো প্রকার ভয়-করুণার ঊর্ধ্বে যথাযথ প্রক্রিয়ায় হলফনামায় দেওয়া তথ্য যাচাই করা।’
ড. ইফতেখার আরও বলেন, ‘প্রকৃত অবস্থার সঙ্গে অসংগতির ক্ষেত্রে ইসির এখতিয়ার প্রার্থিতা বাতিল করা, এনবিআরের দায়িত্ব কর ফাঁকির জন্য, আর দুদকের এখতিয়ার অবৈধ সূত্রে অর্জিত অর্থ-সম্পদের প্রমাণসাপেক্ষে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এই নজরদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব অবস্থানের পাশাপাশি পারস্পারিক সমন্বয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করতে পারলে রাজনৈতিক চর্চায় ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।’
তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে হবে গণভোট। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল রয়েছে ৫৯টি। এর মধ্যে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ৫১ রাজনৈতিক দল।
৩০০টি নির্বাচনি এলাকায় দাখিল করা মনোনয়নপত্রের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে মোট ১ হাজার ৮৪২ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
যা বলছেন ইসি সংশ্লিষ্টরাপ্রার্থীদের হলফনামায় দেখানো আয় ও সম্পদের বিবরণী নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানান আলোচনা-সমালোচনা নিয়ে কথা হয় ইসি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে।
এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলি জাগো নিউজকে বলেন, সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা রয়েছে ইসির। তথ্য মিথ্যা প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধি অনুযায়ী জেল ও জরিমানার বিধানও আছে। রিটার্নিং কর্মকর্তার উচিত এগুলো যাচাই-বাছাই করা। প্রার্থীর সব সম্পদ দেখাতে হবে। কোনো সম্পদের অর্জনকালীন মূল্যের পাশাপাশি বর্তমান বাজারদরও দেওয়া উচিত।’
নির্বাচন কমিশন স্বপ্রণোদিতভাবে হলফনামায় তথ্য খুব একটা যাচাই-বাছাই করে না। তবে কোনো প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি যদি ইসিতে আপিল করে তবে ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হলফনামায় যাচাই-বাছাই করে নির্বাচন কমিশন। তবে এমন ইতিহাস খুব একটা নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘প্রার্থীর হলফনামা ইসি স্বপ্রণোদিতভাবে যাচাই করে না। তবে প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী বা সংশ্লিষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি যদি হলফনামায় যাচাইয়ের জন্য আপিল করেন, তখন আমরা যাচাই করি। হলফনামায় কেউ যাচাই-বাছাই করার চ্যালেঞ্জ করলে আমরা যাচাই করি।’
এমওএস/এএসএ/এমএফএ/জেআইএম