অদ্ভুত এক শব্দে হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল।মুহূর্তের মধ্যেই হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেল। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রা, অথচ শরীর ভিজে যাচ্ছে ঘামে। ভয় গলা শুকিয়ে দিচ্ছে।
ধীরে ধীরে স্লিপিং ব্যাগের জিপারটা বুক পর্যন্ত খুললাম। নিঃশ্বাস চেপে রেখে বাইরের শব্দটা শোনার চেষ্টা করছি। তাবুর বাইরে বড় দেহের কোনো এক প্রাণীর উপস্থিতি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। কিছু একটা চিবোচ্ছে, শব্দে ঠিক তেমনই মনে হচ্ছে।
আকাশে একফোঁটাও মেঘ নেই। তারায় ভরে আছে পুরো আকাশ। বাতাস বইছে খুব মৃদু গতিতে। তাবুর ভেতরের আলো বাইরে খানিকটা ছড়িয়ে পড়ছে। সেই আলোয় তাবুর কাপড়ের গায়ে ছায়ার মতো ফুটে উঠেছে প্রাণীটির দেহ। ছায়াটা দেখে মনে হচ্ছে প্রাণীটি তাবুর থেকেও উঁচু, বিশাল আকৃতির।
এত বড় প্রাণী এখানে কী হতে পারে?ইয়েতি?না, ইয়েতিতে আমার বিশ্বাস নেই। আর থাকলেও সেটা থাকার কথা পাঁচ হাজার মিটারের ওপরে, বরফের রাজ্যে।তাহলে ইয়াক?নাকি অন্য কিছু?মাথা কাজ করছে না।গত রাতেও একটা শেয়াল এসে তাবুর চারপাশে ঘোরাঘুরি করেছিল। ভয়টা যেন তার পর থেকে জমে আছে। তিনদিন আগে শেষ গ্রাম ছেড়ে এসেছি। জানি, সামনে আরও পাঁচ-ছয় দিন কোনো গ্রাম বা মানুষের দেখা নেই।
আরও পড়ুনবাঁশখালীর বাণীগ্রাম শিখ মন্দিরের সংস্কার কাজ! আটকে গিয়েছিলাম দ্বীপ ভূখণ্ডে!
নিঃশব্দে উঠে বসলাম। অন্ধকারে হাতড়ে হেডটর্চ খুঁজছি, কিন্তু পাচ্ছি না। হাতের কাছে পানির বোতল পেলাম। অন্ধকারেই ঢাকনা খুলে পানি খাওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু এক ফোঁটাও না, পুরোটা বরফ হয়ে গেছে।আবার হেডটর্চ খুঁজতে লাগলাম।এইবার বুঝলাম, টর্চটা তো আমার মাথাতেই! ঘুমানোর আগেই পরা ছিল।জ্বালাবো?নাকি জ্বালাবো না?
টর্চ না জ্বালিয়েই আগে রুকস্যাকের পকেট থেকে সুইচ নাইফটা বের করে হাতে নিলাম। তারপর খুব ধীরে তাবুর জিপারটা সামান্য খুললাম। ছোট্ট ফাঁক দিয়ে তাকালাম, কিছুই চোখে পড়লো না। অন্ধকারে দূরে কিছু দেখা যাচ্ছে না।জিপারটা আরেকটু খুলে মাথা বের করলাম।ভয়ে শরীর জমে যাওয়ার মতো অবস্থা।ঠিক তখনই, তাবুর পেছন দিক থেকে সেই বড় দেহের প্রাণীটা দৌড়ে দূরে সরে গেল। মুহূর্তের মধ্যে মাথাটা আবার তাবুর ভেতরে ঢুকিয়ে নিলাম। শরীরের সব শক্তি যেন এক সেকেন্ডেই শেষ হয়ে গেল।
নিজেকে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করলাম। মনে মনে বললাম, এখানে মৃত্যুর চেয়েও বড় কিছু হওয়ার নেই। আর এমন কোনো প্রাণীও থাকার কথা না যে, আমাকে মেরে ফেলবে।আবার সাহস সঞ্চয় করে মাথা বের করলাম।
তাবু থেকে বিশ–পঁচিশ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে আছে সাদা রঙের কয়েকটা ঘোড়া। টর্চের আলো বাড়িয়ে ভালো করে দেখলাম, তিনটা বড় ঘোড়া আর একটা ছোট্ট ঘোড়ার বাচ্চা।ভয়টা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে মুখে দিলাম। চকলেটের মিষ্টি স্বাদে নিজেকে প্রশ্ন করলাম, এই জীবনে কি এর চেয়েও বেশি ভয় কখনো পেয়েছিলাম?এই অপার সুন্দর, নিঃসঙ্গ জায়গাটার নাম থাজুচর খারকা।
এসইউ