‘ভারতের ভাতের গামলা’ নামে পরিচিত ছত্তিশগড়ে সরকারি ধান ক্রয় ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে ঘিরে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় হাজার হাজার কুইন্টাল ধান প্রতি বছর ‘শুকিয়ে যাওয়া, পোকামাকড় ও পাখির ক্ষতি’ দেখিয়ে হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, এই ক্ষতির মাত্রা স্বাভাবিক নয়। বরং তা একটি সংগঠিত দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয়।
সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে মহাসমুন্দ জেলায়। সেখানে মাত্র ১০ মাসে সরকারি হিসাবে ৮১ হাজার ৬২০ কুইন্টাল ধান নষ্ট দেখানো হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, এটি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১১ কুইন্টাল, দিনে ২৭২ কুইন্টাল—অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় এক ট্রাকভর্তি ধান উধাও হয়ে যাওয়ার সমান।
এই ক্ষতি হয়েছে পাঁচটি ক্রয়কেন্দ্রে—মহাসমুন্দ, বাগবাহারা, পিথোরা, বাসনা ও সারাইপালি। প্রতিটি কেন্দ্রেই কেনা মোট ধানের প্রায় সাড়ে তিন শতাংশের মতো ‘নষ্ট’ দেখানো হয়েছে।
কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যামহাসমুন্দ জেলার বিপণন কর্মকর্তা আশুতোষ কোসারিয়া ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে বলেন, বিষয়টি মূলত ‘কারিগরি’। তার দাবি, ২০২৪–২৫ মৌসুমের ধান স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১১ মাস সংরক্ষণ করা হয়েছে, ফলে আর্দ্রতা কমে ওজন কমে গেছে। তিনি বলেন, ‘রাজ্যজুড়ে গড়ে সাড়ে তিন শতাংশ ধান শুকিয়ে নষ্ট হয়। মহাসমুন্দে তা তিন দশমিক পাঁচ সাত শতাংশ।’
আরও পড়ুন>>ভারতের ওপর ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের বিলে সম্মতি দিলেন ট্রাম্পস্যার, আমি কি আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারি? ট্রাম্পকে বলেন মোদীট্রাম্পের ভয়ে রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমিয়েছে ভারত
বাগবাহারা কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত দীপেশ পাণ্ডে বলেন, বৃষ্টির মৌসুমে আসা ধানে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত আর্দ্রতা থাকে। যখন এটি পাঠানো হয়, তখন আর্দ্রতার পরিমাণ কমে ৯ থেকে ১০ শতাংশ থাকে। সেই সময়ের মধ্যে কিছু প্রাকৃতিক পচন অনিবার্য। তারপরে উইপোকা, পোকামাকড় এবং পাখি দেখা দেয়। বর্ষাকালে প্রচুর ধান মাটিতে পড়ে যায়, যা আমরা সংগ্রহ করতে পারি না এবং তা কাদার সঙ্গে মিশে যায়।
সরকারি নিয়ম বনাম বাস্তবতাতবে ছত্তিশগড়ের খাদ্য ও ভোক্তা সুরক্ষা দপ্তরের গত ১২ সেপ্টেম্বরের নির্দেশনা অনুযায়ী, এক শতাংশ ঘাটতি হলে কারণ দর্শানোর নোটিশ, এক থেকে দুই শতাংশ হলে বিভাগীয় তদন্ত, আর দুই শতাংশের বেশি হলে বরখাস্ত ও এফআইআর পর্যন্ত করার বিধান রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তিন শতাংশের বেশি ঘাটতিও ‘স্বাভাবিক’ বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এর আগে কবর্ধা জেলায় প্রায় ২৬ হাজার কুইন্টাল ধান উধাও হওয়ার ঘটনায় প্রথমে ইঁদুর-পোকামাকড়কে দায়ী করা হলেও তদন্তে ভুয়া বিল, ভুয়া শ্রমিক তালিকা ও সিসিটিভি ফুটেজ বিকৃতির প্রমাণ মেলে। সেই ঘটনায় কেন্দ্রপ্রধানকে বরখাস্ত করা হয়।
একই ধরনের চিত্র মিলেছে জশপুর জেলায়ও। সেখানে ২০২৪–২৫ খরিফ মৌসুমে প্রায় ২০ হাজার ৫৮৬ কুইন্টাল ধানের ঘাটতি ধরা পড়ে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৬ কোটি ৩৮ লাখ রুপি। সঙ্গে গায়েব হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার বস্তা, ফলে মোট ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৫৫ লাখ রুপিতে।
বড় কেনাকাটা, ছোট জবাবদিহিরাজ্য সরকার গর্বের সঙ্গে জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ১৪ নভেম্বর থেকে তারা প্রায় ৯৩ দশমিক ১২ লাখ মেট্রিক টন ধান কিনেছে এবং প্রায় ১৬ দশমিক ৯৫ লাখ কৃষকের অ্যাকাউন্টে ২০ হাজার ৭৫৩ কোটি রুপি জমা দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই বিপুল পরিমাণ ধানের কতটা আসলে মিল, রেশন দোকান ও ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে?
ছত্তিশগড়ের খাদ্য ও বেসামরিক সরবরাহ মন্ত্রী দয়ালদাস বাঘেল এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এক জেলায় ইঁদুরে সাত কোটি, আরেক জেলায় পোকায় ছয় কোটি, আর কোথাও প্রতি ঘণ্টায় এক ট্রাক ধান উধাও হয়—তাহলে সেটিকে আর প্রাকৃতিক ক্ষতি বলা যায় না। এভাবে ‘ভারতের ভাতের গামলা’ ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে এমন এক তলাবিহীন পাত্রে, যেখানে ধান ঢোকে, টাকা বেরিয়ে যায়—আর তার জন্য থাকে না কোনো জবাবদিহি।
সূত্র: এনডিটিভিকেএএ/