দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্য ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সব ধরনের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে সোমালিয়া। এর মধ্যে রয়েছে বন্দর পরিচালনা, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষা খাতে করা গুরুত্বপূর্ণ সব সমঝোতা।
সোমালিয়ার মন্ত্রিপরিষদ সোমবার (১২ জানুয়ারি) এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহমেদ মুআল্লিম ফিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, ‘নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন ও প্রমাণের ভিত্তিতে আমরা এমন কিছু কার্যক্রমের অস্তিত্ব পেয়েছি, যা সোমালি প্রজাতন্ত্রের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য ও রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করছে।’
এ বিষয়ে আমিরাতের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সোমালিল্যান্ড ইস্যুতে উত্তেজনাবিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে সোমালিল্যান্ড ইস্যু। গত ডিসেম্বরে ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর মোগাদিশুতে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। সোমালিল্যান্ড সোমালিয়ার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত একটি স্বঘোষিত স্বাধীন অঞ্চল, যা ১৯৯১ সালে বিচ্ছিন্ন হলেও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি।
আরও পড়ুন>>সোমালিল্যান্ডকে ‘স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের’ স্বীকৃতি দিলো ইসরায়েলসোমালিল্যান্ডকে দেওয়া ইসরায়েলের স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান করলো সৌদি আরবসোমালিল্যান্ড/ ইসরায়েলের স্বীকৃতি নিয়ে ২১ আরব-আফ্রিকান দেশের নিন্দা
স্বাধীন বিশ্লেষক আবদিনুর দাহির আল-জাজিরাকে বলেন, সোমালিদের বড় একটি অংশ মনে করে, ইসরায়েলের এই স্বীকৃতির পেছনে আমিরাত ভূমিকা রেখেছে। তাই আমিরাতের বিরুদ্ধে এটি একটি রাজনৈতিক পাল্টা বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমিরাতের বিরুদ্ধে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও রাষ্ট্রবিরোধী শক্তিকে সমর্থনের অভিযোগ করা হয়, যার মধ্যে সুদানের আধাসামরিক বাহিনী আরএসএফ’কে সহায়তার অভিযোগও রয়েছে।
যদিও আবুধাবি এ ধরনের অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে।
গত এক দশকে সোমালিল্যান্ড আমিরাতের বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা বিনিয়োগের একটি বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেরবেরা বন্দরে ৩০ বছরের কনসেশন পেয়েছে আমিরাতের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ড।
মোগাদিশুর একটি সরকারি সূত্র জানিয়েছে, বিচ্ছিন্ন ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে আমিরাতের প্রভাব বাড়ানো নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে রূপ নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক আফ্রিকা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের হিসাবে, পূর্ব আফ্রিকায় আমিরাতের বিনিয়োগ প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলার, যা অঞ্চলটিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর মোট বিনিয়োগের প্রায় ৬০ শতাংশ।
ইয়েমেন ও আকাশসীমা বিতর্কদক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) নেতা আইদারুস আল-জুবাইদি গত ৮ জানুয়ারি সৌদি আরবের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে বেরবেরা বন্দর ব্যবহার করে আমিরাতে যান। এরপর সোমালিয়ার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ দেশটির জাতীয় আকাশসীমা ও বিমানবন্দরের অননুমোদিত ব্যবহারের তদন্ত শুরু করে।
ফেডারেল কাঠামোয় অনিশ্চয়তাসোমালিয়া একটি ফেডারেল রাষ্ট্র হওয়ায় এখনো স্পষ্ট নয়, সব রাজ্য এই সিদ্ধান্ত মেনে চলবে কি না। বিশেষ করে পান্টল্যান্ড ও জুবাল্যান্ডের সঙ্গে আমিরাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক সাংবিধানিক সংস্কার ও আসন্ন নির্বাচন নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে রাজ্য দুটির।
এদিকে সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্সি মন্ত্রী খাদর হুসেইন আবদি মোগাদিশুর সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন,‘সোমালিয়ার কল্পনাবিলাস বাস্তবতা বদলাতে পারবে না। আমিরাত সোমালিল্যান্ডের বিশ্বস্ত বন্ধু।’
এসব ঘটনায় হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে কূটনৈতিক উত্তেজনা ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র: আল-জাজিরাকেএএ/