বিমান চলাচল আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আকাশপথে নিরাপদে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করছেন। তবে এই উন্নত ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ধরনের ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে।অনেকেই মনে করেন, বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি ঘটলে সেটি প্রায় নিশ্চিত দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, অথবা সামান্য ঝাঁকুনিই বড় বিপদের ইঙ্গিত। ইঞ্জিন বন্ধ হইলেই বিমার নিচে পড়ে যায়-এসব সহ সাধারণ মানুষের মনে নানা ভুল ধারণা ঘুরপাক খায়।বাস্তবে বিমান চলাচল অত্যন্ত পরিকল্পিত ও প্রযুক্তিনির্ভর। ভুল ধারণাগুলো মূলত তথ্যের অভাব, সিনেমা বা সামাজিক মাধ্যমে অতিরঞ্জিত উপস্থাপন এবং ব্যক্তিগত ভয়ের কারণে তৈরি হয়। এসব ভুল ধারণা দূর করা জরুরি, কারণ সঠিক জ্ঞান মানুষের ভয় কমায় এবং বিমান ভ্রমণের প্রতি আস্থা বাড়ায়।ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ, দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে পাইলট পেশার সঙ্গে যুক্ত আছেন। বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্সের প্রাক্তন পাইলট, বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক এভিয়েশন ট্রেনিং প্রোগ্রামের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি একটি এয়ারলাইন শুরু করার উদ্যোগও নিয়েছেন অভিজ্ঞ এই পাইলট।দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে বিমান চলাচল নিয়ে প্রচলিত এমন কিছু সাধারণ ভুল ধারণা নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফিচার লেখক মোহাম্মদ সোহেল রানা-চলুন প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক বিমান কীভাবে আকাশে উড়ে। বিমান আকাশে উড়ে প্রধানত এর আকার, পাখার ডিজাইন এবং ডানার ওপর নির্ভর করে। বিমানের ডানাগুলো এমনভাবে তৈরি যে সামনের দিকের বাতাস নিচের চেয়ে ওপরে বেশি গতিতে চলে, ফলে উপরে কম চাপ সৃষ্টি হয়-একে লিফট বলা হয়, যা বিমানকে তোলার জন্য যথেষ্ট শক্তি দেয়। ডানার নিচে উচ্চচাপ নিম্নচাপের দিকে যেতে চায় এবং ডানাকে উপরের দিকে ধাক্কা দেয় ইঞ্জিন থ্রাস্ট জোগায় আর পাইলট তা নিয়ন্ত্রণ করেন।এবার জেনে নিন বিমান চলাচল নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা-১. বিমান দুর্ঘটনা কেউ বাঁচে না, কথাটি সত্য নয়সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা হলো বিমান দুর্ঘটনা ঘটলে কেউ বাঁচে না। কিন্তু বাস্তবে এই ধারণাটি পুরোপুরি সত্য নয়। ইতিহাস ও পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে বহু বিমান দুর্ঘটনায় যাত্রী ও ক্রুরা জীবিত উদ্ধার হয়েছেন। অনেক সময় দুর্ঘটনার মাত্রা, বিমানের উচ্চতা, অবতরণের ধরন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রমের ওপর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নির্ভর করে।আধুনিক বিমানে উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী কাঠামো এবং উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে দুর্ঘটনার পরও যাত্রীদের রক্ষা পাওয়ার সুযোগ থাকে।২. ইঞ্জিন বন্ধ হইলেই বিমান নিচে পড়েঅনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা আছে যে বিমানের ইঞ্জিন বন্ধ হলেই বিমান সঙ্গে সঙ্গে নিচে পড়ে যায়। এটি একেবারেই সত্য নয়। আধুনিক বিমান এমনভাবে নকশা করা হয় যে ইঞ্জিন বিকল হলেও তাৎক্ষণিকভাবে দুর্ঘটনা ঘটে না। বিমানের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলে পাইলটদের কাছে পুনরায় স্টার্ট করার একাধিক ব্যবস্থা থাকে।এছাড়া ইঞ্জিন বন্ধ হলে বিমান গ্লাইডারের মতো আচরণ করে। অর্থাৎ উচ্চতা যত বেশি থাকবে, বিমান তত বেশি দূর পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিতভাবে গ্লাইড করে যেতে পারে। এদিকে জরুরি অবতরণের জন্য কাছাকাছি বিমানবন্দর, খোলা মাঠ বা জলাশয় চিহ্নিত করতে পারেন পাইলটরা। ইতিহাসে বহু ঘটনা আছে যেখানে ইঞ্জিন বন্ধ থাকা সত্ত্বেও পাইলটরা নিরাপদে বিমান অবতরণ করেছেন।৩. টার্বুলেন্স মানেই বিমান বিপদে পড়াটার্বুলেন্স মানেই যে বিমান বিপদে পড়েছে এই ধারণাটি সঠিক নয়। টার্বুলেন্স মূলত বাতাসের স্বাভাবিক অস্থিরতা, যা আকাশে বিভিন্ন উচ্চতায় প্রায়ই দেখা যায়। মেঘের স্তর, তাপমাত্রার পার্থক্য, পাহাড়ি অঞ্চল বা জেট স্ট্রিমের প্রভাবে বাতাসের গতি ও দিক হঠাৎ বদলে গেলে টার্বুলেন্স সৃষ্টি হয়। এটি বিমান চলাচলের একটি স্বাভাবিক অংশ।আধুনিক বিমানগুলো অত্যন্ত শক্ত কাঠামো দিয়ে তৈরি এবং টার্বুলেন্স সহ্য করার ক্ষমতা রাখে। যাত্রীদের কিছুটা ঝাঁকুনি লাগতে পারে, কিন্তু তা বিমানের জন্য বিপজ্জনক নয়। তাই টার্বুলেন্স অনুভূত হলেও আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। এটি বিমান চলাচলের পরিচিত, যা পাইলটরা নিরাপদভাবেই মোকাবিলা করেন।৪. উড়ন্ত অবস্থায় বিমানের দরজা খোলাউড়ন্ত অবস্থায় বিমানের দরজা খোলা সাধারণভাবে সম্ভব নয় এবং এর প্রধান কারণ হলো বিমানের কেবিনে বজায় রাখা উচ্চ চাপ ও নকশাগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বাণিজ্যিক বিমান সাধারণত ৩০-৪০ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়ে, যেখানে বাইরের বাতাসের চাপ ও অক্সিজেনের মাত্রা মানুষের জন্য পর্যাপ্ত নয়। তাই বিমানের ভেতরে কৃত্রিমভাবে কেবিন প্রেসারাইজেশন করা হয়। বিমানের ভিতর ও বাহিরের চাপের প্রেক্ষিতে উড়ন্ত অবস্থায় শারিরীক শক্তি দিয়ে বিমানের দরজা খোলা সম্ভব নয়। অক্সিজেনের অভাব হলে বিমানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অক্সিজেন মাস্ক নেমে আসে। আরও পড়ুনবরফের ঘুমে লাল চিংড়ি: বঙ্গোপসাগর থেকে নীরব বিদেশযাত্রা
বিয়েতে পুরুষত্বের প্রমাণ দিতে সহ্য করতে হয় চাবুকের আঘাত
কেএসকে