ভ্রমণ

কচ্ছপিয়ার খাল পেরোতেই মেঘনার শোভা

ভ্রমণ মানেই কোনো ভ্রমণকেন্দ্রে যাওয়া—ধারণাটি কচ্ছপিয়া খালের ধারে এসে ভেঙে যাবে। খুব বেশি পথ পেরোতে হয় না, কোনো নামকরা পর্যটন স্পটও নয়। তবুও কচ্ছপিয়া খাল পেরোনোর পরই যে মেঘনার রূপ চোখে পড়ে, তা অনেক খ্যাতনামা ভ্রমণ কেন্দ্রকেও হার মানায়।

কচ্ছপিয়া কোথায়কচ্ছপিয়া ঘাট বা খালটি ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার অংশ। চরফ্যাশন পৌর শহর থেকে দক্ষিণ আইচা হয়ে কচ্ছপিয়া ঘাটে পৌঁছানো যায়। এরপর সেখান থেকে ট্রলার বা স্পিডবোটে নদীর বিভিন্ন দিকে যাওয়া যায়। ঢালচর, তারুয়া সমুদ্রসৈকত, দক্ষিণ আইচা যেতে এই খালপথ ব্যবহার হয়। খালটি মাত্র আধা কিলোমিটার গিয়েই ঠেকেছে মেঘনা নদীতে। এককথায় কচ্ছপিয়ার খাল মেঘনারই একটি অংশ।

খাল পেরোনোর মুহূর্তখালের পাড়ে এসে প্রথমেই চোখে পড়ে ছোট নৌকা আর ধীরগতির জীবন। কেউ জাল গোছাচ্ছেন, কেউ নৌকা ঠেলছেন। কাঠের ট্রলারে চেপে যেন ভ্রমণের প্রথম রোমাঞ্চ। এপারের কোলাহল ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যায়, আর মনটা প্রস্তুত হয় অন্য এক ছন্দে ঢুকে পড়তে।

সামনে খুলে যায় মেঘনাখাল শেষ হতেই হঠাৎ সামনে আসবে বিশাল এক জলরাশি। মেঘনার প্রথম দর্শন। চোখ যেন নিষ্পলক হয়ে যাবে সেই সৌন্দর্যে। যতদূর দেখা যায়—শুধু জল আর জল। মেঘনা এখানে প্রশস্ত, মুক্ত আর নির্ভার। নদীর বুকজুড়ে আলো-ছায়ার খেলা চলে সারাক্ষণ। সকালের দিকে জল শান্ত, বিকেলে বাতাস উঠলে ঢেউগুলো নদীকে আরও জীবন্ত করে তোলে। চোখের সামনে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় মেঘনার বিশাল বুক। নদী এখানে শুধু জলধারা নয়, যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস—আকাশ, বাতাস আর মানুষের জীবনের গল্প একসঙ্গে আঁকা।

জায়গাটার সবচেয়ে বড় পাওয়া ‘নীরবতা’। শহরের হর্ন, ভিড় বা ব্যস্ততা এখানে নেই। আছে শুধু বাতাসের শোঁ শোঁ, পানির ঢেউয়ের ছলাৎছল আর দূরের পাখির ডাক। কিছুক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে থাকলেই মনে হয়, অনেকদিন পর নিজেকে নিজের মতো করে পাওয়া গেল। সে দৃশ্য ভাষায় ধরা কঠিন।

আরও পড়ুনপদ্মাপাড়ে ট্রলার ভ্রমণে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় যে কারণে নদী ভ্রমণে ছুটছেন পর্যটকেরা 

এখানকার মানুষ মেঘনার সঙ্গে বাঁচে। নদীই তাদের জীবিকা, নদীই তাদের আশ্রয়। জেলেদের সকাল শুরু হয় খুব ভোরে, নৌকা ভাসে কুয়াশার ভেতর দিয়ে। নৌকা, জল, জাল মিলিয়ে এখানে জীবন খুব সাধারণ, অথচ গভীর। কারও তাড়াহুড়ো নেই, নেই কৃত্রিমতা। শিশুদের খেলাধুলা, নারীদের মাছ ধোয়া, জেলেদের ঘরে ফেরার দৃশ্য—সব মিলিয়ে এক অনাড়ম্বর জীবনের ছবি। এককথায় নদীর ছন্দেই এখানে সবকিছু চলে। সেসব দৃশ্য নিজ চোখে দেখলে তৃপ্ত হবেন যে কোনো পর্যটক।

কোথাও নৌকার সারি, কোথাও জালের ফাঁকে রোদ ঝিলমিল করে ওঠে। সকালের আলোয় নদী শান্ত ও স্নিগ্ধ, বিকেলে রোদ হেলে পড়লে মেঘনার বুকে তৈরি হয় রুপালি ঝিলিক—দেখতে দেখতে সময় থেমে যেতে চায়। এখানে দেখা যাবে সূর্যাস্তের মেঘনা। আকাশ লালচে হয়ে নদীর বুকে রং ছড়িয়ে দেয়। পানির ওপর পড়া সেই আলো মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যায়—দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নেমে আসে আর মনটা ভারী শান্ত হয়ে যায়।

কেন যাবেন এখানেযারা বিলাসী ভ্রমণ নয় বরং অনুভবের ভ্রমণ খোঁজেন—তাদের জন্য কচ্ছপিয়া-মেঘনার তীর আদর্শ। যারা প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখতে চান, নদীর জীবনের সঙ্গে কিছুক্ষণ মিশে যেতে চান, তারা এখানে যেতে পারেন। একা গেলেও ভালো লাগবে, আবার কাছের মানুষদের সঙ্গেও সময় কাটানো যায় নিরিবিলি পরিবেশে। যদি সময় থাকে, সূর্যাস্ত মিস করবেন না।

আগেই জেনে রাখুনকচ্ছপিয়া ভ্রমণের আগে কিছু বিষয় জেনে রাখলে উপকৃত হবেন:১. বিকেল বা ভোরের সময় গেলে অভিজ্ঞতা সবচেয়ে ভালো হবে। ২. ক্যামেরা থাকলে নিন—মেঘনা ফটোগ্রাফারদের প্রিয়।৩. বেশি পর্যটক নেই, তাই খাবার-পানির ব্যবস্থা নিজে রাখাই ভালো।

কচ্ছপিয়া খাল পেরোলেই যে এমন এক মেঘনা অপেক্ষা করে আছে, সেটা না এলে বোঝা যায় না। খুব কাছে থেকেও আমরা সুন্দর বাংলাদেশকে চিনি না। যদি সুযোগ পেলে খালের ওপারে পা বাড়ান—নদী আপনাকে নিরাশ করবে না। নদীর কাছে এসে বোঝা যায়—প্রকৃতি এখনো আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে, নীরবে, গভীর ভালোবাসায়।

এসইউ