পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধ উদাহরণ হলো জলাভূমি। ২০২৬ সালের বিশ্ব জলাভূমি দিবসের প্রতিপাদ্য হলো ‘জলাভূমি এবং ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান: সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উদযাপন’। এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে জলাভূমি বাস্তুতন্ত্রের সংরক্ষণ এবং টেকসই ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় ও আদিবাসী জ্ঞান, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের ভূমিকাকে তুলে ধরা হয়েছে। এটি জলাভূমি ও মানুষের গভীর সম্পর্কের ওপর জোর দেয়।
জলাভূমির অপরিসীম গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৯৭১ সালের এই দিনে ইরানের রামসার শহরে পরিবেশবাদী সম্মেলনে জলাভূমির টেকসই ব্যবহার ও সংরক্ষণের জন্য একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি সই হয়। এটি রামসার কনভেনশন চুক্তি বলে পরিচিত। ১৯৭৫ সালে রামসার কনভেনশন চুক্তি কার্যকর হয়। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ এ চুক্তিতে সই করে। এখন পর্যন্ত ১৭১ দেশ চুক্তি অনুমোদন করেছে। ১৯৯৭ সাল থেকে ২ ফেব্রুয়ারি আইইউসিএন, ইউনেসকোসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে ১০০টিরও বেশি দেশের পরিবেশসচেতন নাগরিক বিশ্ব জলাভূমি দিবস পালন করছেন। ইউনেস্কো রামসার কনভেনশনের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করে আসছে।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। নদীনালা, বিল, হাওর, বাঁওড়ের মতো বহু জলাভূমি এ দেশকে ঘিরে রেখেছে। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, এ দেশের ৭ থেকে ৮ লাখ হেক্টর ভূমি কোনো না কোনোভাবে জলাভূমির অন্তর্ভুক্ত, যা আমাদের মোট আয়তনের প্রায় ৫০ ভাগ। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, মৎস্য, পর্যটনসহ নানা ক্ষেত্রে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো জলাভূমি। এ দেশের প্রাকৃতিক স্বাদু পানির মাছের প্রধান উৎস হলো হাওরের বেসিন অঞ্চল। জীববৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে এ দেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ উদাহরণ হলো হাওর অঞ্চল ও সুন্দরবন। এছাড়া আড়িয়ল বিল ও চলনবিল এ দেশের গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি।
জাতীয় পানি নীতি (১৯৯৯) এর ৪.১৩ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, ‘...হাওর, বাঁওড় ও বিল জাতীয় জলাভূমিগুলো বাংলাদেশের আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যর ধারক এবং এক অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত দিক থেকে এগুলোর গুরুত্ব অসীম। হাওর এবং বাঁওড়গুলোতে শুষ্ক মৌসুমেও যথেষ্ট গভীরতায় পানি থাকে তবে ছোট বিলগুলো সাধারণত চূড়ান্তপর্যায়ে আর্দ্রভূমিতে পরিণত হয়। এই বিলগুলো প্লাবনভূমির নিম্নতম অংশ। এই জলাশয়গুলো আমাদের প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদের সিংহভাগের উৎস এবং নানা ধরনের জলজ সবজি ও পাখির আবাসস্থল। তা ছাড়াও শীত মৌসুমে উত্তর গোলার্ধ থেকে আগত অতিথি পাখিদের নির্ভরযোগ্য আশ্রয়। হাওর এবং বিলগুলো খালের মাধ্যমে নদীর সঙ্গে সংযুক্ত।
অতীতে প্রকৌশলগত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে অনেক বিলকে তাৎক্ষণিক ফসল লাভের জন্য নিষ্কাশিত আবাদি জমিতে পরিণত করা হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পরেই এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকট আকার ধারণ করে। প্রথমেই মাছ এবং গ্রামীণ জনগণের খাদ্যের উৎস কচু, শাপলা, কলমি জাতীয় জলজ সবজির বিলুপ্তি ঘটে। বর্ষা মৌসুমে প্লাবনভূমির বর্জ্য প্রবহমান খালের মাধ্যমে বাহিত ও শোধিত হয়ে নিষ্কাশিত হতো। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় সেই প্রাকৃতিক শোধনক্রিয়া ব্যাহত হয়ে পরিবেশের মারাত্মক সংকট সৃষ্টি করেছে।’
অন্যদিকে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড ২০০০ সালের প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করেছে, ‘...হাওর ও জলাভূমি এলাকা অর্থ নিচু প্লাবিত অঞ্চল যাহা সাধারণত হাওর এবং বাওর বলিয়া পরিচিত।’ ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল ১৯৯০-এর ১৮৭ নং অনুচ্ছেদে আছে, ‘...বদ্ধ জলমহাল বলিতে এরূপ জলমহাল বুঝাইবে যাহার চতুঃসীমা নির্দিষ্ট অর্থাৎ স্থলবেষ্টিত এবং যাহাতে মৎস্যসমূহের পূর্ণতা প্রাপ্তির জন্য বৎসরের নির্দিষ্ট সময়ে মৎস্য ধরার উপযোগী। সাধারণত, হাওর, বিল, ঝিল, হ্রদ, দিঘি, পুকুর ও ডোবা ইত্যাদি নামে পরিচিত জলমহালকে বদ্ধ জলমহাল বলিয়া গণ্য করা হয়’।
জাতীয় পানি নীতিতে আরও উল্লেখ আছে, ‘...হাওর, বাঁওড় ও বিল জাতীয় জলাভ‚মিগুলো বাংলাদেশের আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যর ধারক এবং এক অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ। সরকার মনে করে যে বর্জ্য শোধন, ভুগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, সব জলজ ও জলচর প্রাণী ও তৃণের অস্তিত্ব এবং সর্বোপরি পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নিশ্চিত করতে, জলাশয়গুলোর শুধু সংরক্ষণই নয়, উপরন্তু উন্নয়ন প্রয়োজন যাতে এগুলোকে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরিত করা যায়।
বাংলাদেশের প্রাণ এই জলাভূমি, তথা নদী, নালা, হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। সাংবিধানিকভাবেও এর গুরুত্ব স্বীকৃত। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮-ক-এর অনুচ্ছেদ এ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্য প্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন, যা সরকারের পরিবেশবান্ধব নীতির প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা যায়।’ কিন্তু সম্পদের অতিরিক্ত আহরণ, পরিবেশদূষণ, জনসংখ্যার চাপসহ নানা কারণে এ দেশের জলাভূমিগুলোর প্রায় প্রতিটিই কমবেশি বিপদের সম্মুখীন। হারিয়ে গেছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছসহ নানা উদ্ভিদ ও প্রাণী। বহু জীব বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। অনেকের আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে গেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে এখন পর্যন্ত ১২টি এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বলে ঘোষণা করা হয়েছে, যার প্রায় সব কটিই জলাভূমি। এর মধ্যে ১৯৯৯ সালে সুন্দরবন, টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর, মারজাত বাঁওড় এবং পরে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বালু এবং গুলশান লেককে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ অনুযায়ী এসব অঞ্চলে ক্ষতিকর কারখানা স্থাপন, মাটি, পানি ও বায়ু দূষণকারী কার্যক্রম, মাছসহ জলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর কার্যকলাপ এবং যেকোনো ধরনের পরিবেশদূষণ নিষিদ্ধ; যদিও বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন।
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণসহ হাওরাঞ্চলের উন্নয়নে সরকারের ২০১২ থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত ২০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে। অন্যান্য জলাভূমি সংরক্ষণের জন্যও পরিকল্পনা রয়েছে। আয়তনে ছোট হলেও বাংলাদেশের রয়েছে অত্যন্ত সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য। শুধু জীববৈচিত্র্যই নয়, কৃষি, মৎস্য ও পর্যটনের জন্য টেকসই জলাভূমি ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। বিশ্ব জলাভূমি দিবসে পরিবেশসচেতন নাগরিকেরা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবে জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে নতুন করে অনুপ্রাণিত হবেন-এটাই প্রত্যাশা।
আরও পড়ুননতুন প্রজন্ম জানে না শহীদ আসাদের ইতিহাস!মাদুলির মোড়কে নিরাপত্তার খোঁজ, ভ্রান্ত বিশ্বাসে বাঁধা বাস্তবতা
কেএসকে