মায়ের বুকের দুধ শুধু শিশুর জন্যই নয়, মায়ের নিজের স্বাস্থ্যের জন্যও আশীর্বাদ। অথচ আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, ভুল ধারণা কিংবা সামাজিক চাপে অনেক মা শিশুকে পর্যাপ্ত বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন না বা ইচ্ছা করেই এড়িয়ে যান। চিকিৎসকদের মতে, এই অভ্যাস ভবিষ্যতে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে, যার মধ্যে অন্যতম হলো ক্যানসার।
এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য জানিয়েছেন বাংলাদেশ স্তন ক্যানসার সচেতনতা ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সমন্বয়কারী এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ অ্যান্ড হসপিটালের ক্যানসার এপিডেমিওলজি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিন।
তিনি বলেছেন, শিশুকে বুকের দুধ না খাওয়ালে মায়ের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। একই সঙ্গে শিশুর শরীরেও দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগের আশঙ্কা তৈরি হয়।
প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ উপহার বুকের দুধবুকের দুধকে বলা হয় শিশুর প্রথম টিকা। জন্মের পরপরই পাওয়া কোলস্ট্রাম বা হলুদ রঙের দুধে থাকে অ্যান্টিবডি, যা শিশুকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের মতে, জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শিশুকে শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানো উচিত এবং এরপর দুই বছর বা তারও বেশি সময় বুকের দুধ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক মা বিভিন্ন কারণে এই নিয়ম মানতে পারেন না। কখনো চাকরির চাপ, কখনো পারিবারিক ভুল ধারণা, আবার কখনো দুধ কম হবে এই ভয়ে।
স্তন ক্যানসারের সঙ্গে বুকের দুধের সম্পর্কঅধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিনের মতে, বুকের দুধ খাওয়ানো নারীর শরীরে একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে। দীর্ঘ সময় বুকের দুধ খাওয়ালে-স্তনের কোষগুলো স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়, অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধির ঝুঁকি কমে, হরমোনের ভারসাম্য বজায় থাকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা কখনোই বুকের দুধ খাওয়াননি অথবা খুব অল্প সময় খাওয়ান, তাদের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। শুধু স্তন ক্যানসার নয়, ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকিও বুকের দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে কমে।
আরও পড়ুন: জীবনযাত্রার ভুলেই বাড়ছে ক্যানসারের ঝুঁকি বিয়ের অনেক বছর পার হলেও সন্তান হচ্ছে না? শিশুর জন্য ঝুঁকি কতটা?শুধু মা নন, শিশুও ক্ষতিগ্রস্ত হয় বুকের দুধ থেকে বঞ্চিত হলে। ফর্মুলা বা কৃত্রিম দুধ কখনোই বুকের দুধের বিকল্প হতে পারে না। বুকের দুধ না পেলে শিশুর মধ্যে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বাড়ে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়, স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি নিয়েও গবেষণায় আশঙ্কা উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শৈশবের পুষ্টিহীনতা ভবিষ্যতের নানা জটিল রোগের বীজ বপন করে দেয়।
ভুল ধারণা ও সামাজিক চাপআমাদের সমাজে এখনো বুকের দুধ খাওয়ানো নিয়ে অনেক ভুল ধারণা আছে। কেউ বলেন দুধ ‘পাতলা’, কেউ বলেন ‘দুধ কম’, আবার কেউ মনে করেন বুকের দুধ খাওয়ালে শরীরের গঠন নষ্ট হয়ে যাবে। চিকিৎসাবিজ্ঞান এসব ধারণাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে মনে করে।
ডা. রাস্কিন বলেন, সঠিক পরামর্শ ও মানসিক প্রস্তুতি থাকলে প্রায় সব মাই পর্যাপ্ত বুকের দুধ দিতে সক্ষম। দুধ কম হওয়ার সমস্যা হলে তা চিকিৎসকের সাহায্যে সমাধান করা সম্ভব।
কর্মজীবী মায়েরা কী করবেন?কর্মজীবী মায়েদের জন্য বুকের দুধ খাওয়ানো বড় চ্যালেঞ্জ এ কথা সত্য। তবে অসম্ভব নয়। কিছু বাস্তবসম্মত উদ্যোগ হতে পারে-
অফিসে মাতৃত্বকালীন ছুটির সঠিক বাস্তবায়ন দুধ সংরক্ষণের ব্যবস্থা শেখা পরিবার ও কর্মস্থলের সহযোগিতা সচেতনতা ও সহমর্মিতামূলক পরিবেশতবে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে মায়েদের জন্য সহায়ক নীতি না থাকলে এই সমস্যার সমাধান কঠিন হয়ে পড়ে।
সচেতনতা কেন জরুরি?বাংলাদেশে প্রতি বছর স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত নারীর সংখ্যা বাড়ছে। অথচ এর একটি বড় অংশ প্রতিরোধযোগ্য। বুকের দুধ খাওয়ানো কোনো ব্যয়বহুল চিকিৎসা নয়, বরং একটি প্রাকৃতিক ও সহজ প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিন জোর দিয়ে বলেন, বুকের দুধ খাওয়ানোকে শুধু মাতৃত্বের দায়িত্ব নয়, জনস্বাস্থ্যের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবাইকে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল হতে হবে।
শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো মানে শুধু শিশুকে সুস্থ রাখা নয়, নিজেকেও ভবিষ্যতের মারাত্মক রোগ থেকে রক্ষা করা। স্তন ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি কমাতে বুকের দুধ খাওয়ানোর বিকল্প নেই। সচেতন সিদ্ধান্তই পারে একটি পরিবারকে, একটি প্রজন্মকে সুস্থ রাখতে। আজ যে সিদ্ধান্তটি একজন মা নেবেন, সেটিই হয়তো আগামীর একটি জীবন বাঁচাবে।
জেএস/