বিশ্ব ক্যানসার দিবস

জীবনযাত্রার ভুলেই বাড়ছে ক্যানসারের ঝুঁকি

জান্নাত শ্রাবণী
জান্নাত শ্রাবণী জান্নাত শ্রাবণী , সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ০৮:৩৪ এএম, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছবি: অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিন

বিশ্ব ক্যানসার দিবস আজ (৪ ফেব্রুয়ারি)। বিশ্বজুড়ে এই দিনটি ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, ভুল ধারণা ভাঙা এবং সময়মতো চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। বাংলাদেশেও দিন দিন একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হচ্ছে ক্যানসার। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো এখনো আমাদের সমাজে ক্যানসার নিয়ে ভয়, ভুল বিশ্বাস আর অজ্ঞতার দেওয়াল অনেক উঁচু।

এই প্রেক্ষাপটে ক্যানসারের বাস্তব চিত্র, ঝুঁকি, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ স্তন ক্যানসার সচেতনতা ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সমন্বয়কারী এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ অ্যান্ড হসপিটালের ক্যানসার এপিডেমিওলজি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিন।

জাগো নিউজ: বাংলাদেশে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ছে কেন?
ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিন: বাংলাদেশে বর্তমানে যে ক্যানসারের পরিসংখ্যান দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ হিসেবে উঠে আসে জীবনযাত্রার পরিবর্তন। নগরায়ন, ধূমপান ও তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার এখনো প্রধান কারণ হলেও এর বাইরেও রয়েছে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত ওজন, দূষিত বাতাস, রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ এবং মানসিক চাপ। আমরা অনেক সময় ভাবি ক্যানসার হঠাৎ আসে। আসলে এটি দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও পরিবেশগত প্রভাবের ফল।

ছবি: অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিনছবি: অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিন

জাগো নিউজ: কোন ক্যানসার বেশি হচ্ছে?
ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিন: বাংলাদেশে পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস, মুখগহ্বর ও খাদ্যনালির ক্যানসার বেশি দেখা যায়। আর নারীদের ক্ষেত্রে স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যানসার সবচেয়ে বেশি। জীবনযাত্রার ভূমিকা এখানে খুবই স্পষ্ট। ধূমপান, জর্দা-গুল, পান-সুপারি, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এসব ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

জাগো নিউজ: ক্যানসার নিয়ে বিপজ্জনক ভুল ধারণাগুলো কী?
ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিন: সাধারণ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক ধারণা হলো ক্যানসার মানেই মৃত্যু। এই ভয় থেকেই অনেকে রোগের লক্ষণ জেনেও চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন ক্যানসার ছোঁয়াচে বা অপারেশন করলে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ে যা সম্পূর্ণ ভুল। এই ভুল ধারণাগুলোই রোগকে জটিল করে তোলে, চিকিৎসার সুযোগ নষ্ট করে দেয়।

জাগো নিউজ: ‘ক্যানসার মানেই মৃত্যু’ এই ধারণা কি মানসিকতার ক্ষতি করে?
ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিন: এই মানসিকতা রোগী ও তার পরিবারের ওপর ভয়াবহ মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। রোগী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, চিকিৎসায় আগ্রহ হারান। অথচ বাস্তবতা হলো প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে অনেক ক্যানসার পুরোপুরি ভালো হওয়ার সুযোগ থাকে।

জাগো নিউজ: কোন কোন লক্ষণে সতর্ক হতে হবে?
ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিন: দীর্ঘদিনের কাশি, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, শরীরে অস্বাভাবিক গাঁট, স্তনে চাকা বা ব্যথা, অনিয়মিত রক্তক্ষরণ, ক্ষত যা ভালো হচ্ছে না, দীর্ঘদিনের গলা ব্যথা বা গিলতে কষ্ট এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।

আরও পড়ুন: 

জাগো নিউজ: চিকিৎসায় দেরির কারণ কী?
ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিন: বাংলাদেশে ক্যানসার রোগীরা সবচেয়ে বেশি দেরি করেন সচেতনতার অভাবে। এর সঙ্গে যুক্ত আছে ভয়, সামাজিক কুসংস্কার এবং অর্থনৈতিক সমস্যা। অনেকেই প্রথমে ঝাড়ফুঁক বা ভ্রান্ত চিকিৎসার আশ্রয় নেন, ফলে রোগ আরও জটিল হয়।

জাগো নিউজ: প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসার সুফল কী?
ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিন: প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার ধরা পড়লে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ আরোগ্য সম্ভব হয়, চিকিৎসার খরচও কম হয় এবং রোগীর জীবনযাত্রা স্বাভাবিক থাকে।

জাগো নিউজ: তরুণদের মধ্যেও বাড়ছে ঝুঁকি, এর কারণ কী?
ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিন: বর্তমানে তরুণদের মধ্যেও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ছে। এর পেছনে কাজ করছে ফাস্টফুড নির্ভর খাদ্যাভ্যাস, দীর্ঘ সময় বসে থাকা, মোবাইল ও স্ক্রিনে আসক্তি, ঘুমের অনিয়ম এবং মানসিক চাপ।

জাগো নিউজ: নীরব ঝুঁকির অভ্যাসগুলো কী কী?
ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিন: ধূমপান ছাড়াও অতিরিক্ত লবণ ও চিনি গ্রহণ, প্রক্রিয়াজাত খাবার, অনিয়ন্ত্রিত ওষুধ সেবন, প্লাস্টিকের অতিরিক্ত ব্যবহার, এমনকি দীর্ঘদিন মানসিক চাপেও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

জাগো নিউজ: ক্যানসারের ঝুঁকি এড়াতে নারীদের জন্য জরুরি পরীক্ষাগুলো কী কী?
ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিন: নারীদের ক্ষেত্রে নিয়মিত স্তন পরীক্ষা, ম্যামোগ্রাম এবং জরায়ুমুখ ক্যানসারের জন্য প্যাপ স্মিয়ার ও ভিআইএ পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো এই পরীক্ষাগুলো করলে ক্যানসার আগেই শনাক্ত করা সম্ভব।

জাগো নিউজ: ক্যানসার চিকিৎসায় বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত?
ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিন: বর্তমানে বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। অনেক জটিল চিকিৎসাই দেশে সম্ভব হচ্ছে। তবু কিছু ক্ষেত্রে রোগীরা এখনো বিদেশমুখী হন, বিশেষত আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য।

আরও পড়ুন: 

 

জাগো নিউজ: ক্যানসার চিকিৎসা কি সত্যিই খুব ব্যয়বহুল?
ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিন: ক্যানসার চিকিৎসা ব্যয়বহুল এই ধারণা আংশিক সত্য। তবে সরকারি হাসপাতাল ও বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে তুলনামূলক কম খরচেও চিকিৎসা সম্ভব। সবচেয়ে বড় সমাধান হলো প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা।

জাগো নিউজ: ক্যানসার রোগীর ক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকাগুলো কী?
ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিন: পরিবার ও সমাজের ইতিবাচক আচরণ রোগীর মানসিক শক্তি বাড়াতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। ভালোবাসা, সহানুভূতি ও সাহস রোগীর চিকিৎসা গ্রহণে বড় সহায়ক। রাষ্ট্রের উচিত ক্যানসার স্ক্রিনিং কার্যক্রম বিস্তৃত করা, তামাক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা, চিকিৎসা সুবিধা জেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া এবং সচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানো।

জাগো নিউজ: বিশ্ব ক্যানসার দিবসের সবার জন্য কী বার্তা দিতে চান?
ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাস্কিন: আজ থেকেই নিজের শরীরের প্রতি যত্নবান হোন। ভয় নয়, সচেতনতা বেছে নিন। ক্যানসার মানেই মৃত্যু নয়, সময়মতো পদক্ষেপ নিলেই জীবন বাঁচানো সম্ভব। বিশ্ব ক্যানসার দিবসে এই বার্তাই হোক আমাদের অঙ্গীকার নিজের জন্য, প্রিয়জনের জন্য, জীবনের জন্য।

জেএস/এমএমএআর/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।