আন্তর্জাতিক

সংঘাতের শঙ্কার মধ্যেই আলোচনায় বসছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

সামরিক সংঘাতের শঙ্কার মধ্যেই শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) আলোচনায় বসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ওমানের রাজধানী মাস্কাটে দেশ দুটির উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এই আলোচনায় অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, আলোচনায় ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, যিনি গত সপ্তাহে বলেছিলেন যে তার দেশের সশস্ত্র বাহিনী ‘ট্রিগারে আঙুল চেপে প্রস্তুত’ রয়েছে।

শুক্রবার শুরু হতে যাওয়া আলোচনায় যোগ দিতে তিনি এরই মধ্যে ওমানের রাজধানী মাস্কাটে পৌঁছেছেন বলে বিবিসি পার্সিয়ানের খবরে বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করবেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।

গত জুনে ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের শেষ দিকে, ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার পর এটিই হবে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রথম বৈঠক।

প্রাথমিকভাবে দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনা কামনোর জন্য মিশর, তুরস্ক ও কাতারের নেতৃত্বে শুরুতে ইস্তাম্বুলে এই বৈঠকটি আয়োজন করার পরিকল্পনা ছিল। তবে, ইরান শেষ মুহূর্তে বৈঠকের স্থান পরিবর্তন করে ওমানে রাখার অনুরোধ জানায়, যেখানে গত বছর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

এছাড়া এটি কেবল ইরানি ও আমেরিকান কর্মকর্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার অনুরোধও জানিয়েছে তারা।

গত মাসে দেশব্যাপী সরকার বিরোধী বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকারের সহিংস পদক্ষেপের ঘটনায় মার্কিন প্রতিক্রিয়ার পরই এই আলোচনা শুরু হচ্ছে। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর দাবি, এই বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।

উত্তেজনা কমাতে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে এই আলোচনাকে। যদিও বৈঠকের স্থান ও এর পরিধি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আলোচনা পণ্ড হওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল।

উভয় দেশ এখনো বিপরীতমুখি অবস্থানে থাকলেও আশা করা হচ্ছে যে, যদি এই আলোচনা সফল হয়, তাহলে পরবর্তী আলোচনার জন্য একটি কাঠামো তৈরি হতে পারে।

এদিকে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করা ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ হ্রাস করার দাবি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা বলেছে, আলোচনায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি দেশটির সমর্থন ও নাগরিকদের প্রতি তাদের আচরণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

যদিও ইরান বলেছে যে আলোচনা কেবল তার পারমাণবিক কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এই মতপার্থক্যগুলো কতটা সমাধান হয়েছে তা স্পষ্ট নয়।

খুব শিগগিরই কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারলে ইরানের ওপর বোমা হামলার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে এই অঞ্চলে হাজার হাজার সেনা পাঠিয়েছে। এছাড়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেখানে একটি ‘আর্মাডা’ বা নৌবহর পাঠিয়েছে, যেখানে বিমানবাহী রণতরী, অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান রয়েছে।

এদিকে, আক্রমণের জবাবে শক্তি প্রয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইরানও। মধ্যপ্রাচ্য ও ইসরায়েলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদে আঘাত করার হুমকি দিয়েছে তারা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসার পর ইরানের বর্তমান সরকার এখনই সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।

এমন একটি সময়ে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, যখন বৃহৎ আকারের একটি বিক্ষোভ নির্মমভাবে দমন করেছে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী। ওয়াশিংটন-ভিত্তিক একটি হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে যে তারা কমপক্ষে ছয় হাজার ৮৮৩ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে।

এছাড়া এটিও সতর্ক করেছে যে সংখ্যাটি আরও অনেক বেশি হতে পারে ও ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই সংকট ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টিকে আবার আলোচনায় ফিরিয়ে এনেছে, যা পশ্চিমাদের সাথে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

কয়েক দশক ধরে, নিজেদের কর্মসূচিকে ‘শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে’ বলে দাবি করে আসছে ইরান। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এটিকে অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টার অংশ বলে অভিযোগ করেছে।

ইরান বলেছে যে তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার রয়েছে ও তারা তাদের উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম - ৪০০ কেজি (৮৮০ পাউন্ড) - তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তরের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে।

দেশটির কর্মকর্তারা অবশ্য ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তারা ছাড় দিতে রাজি আছেন। যার মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের জন্য একটি আঞ্চলিক কনসোর্টিয়াম তৈরির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

একই সাথে, ইরান বলেছে যে দেশের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করার ও এই অঞ্চলে প্রক্সিদের সমর্থন বন্ধ করার দাবি অগ্রহণযোগ্য ও সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন।

যাই হোক না কেন, আলোচনায় ইরান তার অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রত্যাহারের দাবি জানাবে বলে আশা করা হচ্ছে। আর বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর বিরোধীরা বলছেন যে কোনো ধরণের ছাড় দেশটির ধর্মীয় শাসকদের জীবন রক্ষা করবে।

আঞ্চলিক দেশগুলো উদ্বিগ্ন যে ইরানে মার্কিন হামলা আরও বিস্তৃত সংঘাত বা দীর্ঘমেয়াদী বিশৃঙ্খলার দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং তারা সতর্ক করে দিয়েছে যে কেবল বিমান শক্তি ইরানের নেতৃত্বকে উৎখাত করা সম্ভব হবে না।

সূত্র: বিবিসি

এসএএইচ