রাজনীতি

আওয়ামী লীগের ভোট টানতে মরিয়া বিএনপি-জামায়াত

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬ টা। গাজীপুর চৌরাস্তার মোড়ের পাশেই চায়ের দোকান। চায়ে এক চুমুক দিতেই দেখা গেল পাশের বেঞ্চে বসা দুই ব্যক্তি আলোচনায় মগ্ন। একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা হাতে দুজনই খুঁজে খুজে রাজনৈতিক খবরে চোখ বোলাচ্ছেন আর নিজেরা আলোচনা করছেন। যেহেতু সময়টা নির্বাচনের। ভোটগ্রহণ আর কদিন পরেই। স্বাভাবিকভাবেই তাদের আলোচনা চলছিল নির্বাচনকে নিয়েই।

আলোচনারত দুজনই একমত যে, এবারের নির্বাচনে কারা সরকার গঠন করবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রকাশ্য শোডাউন আর রাজনৈতিক সমাবেশে উপস্থিতি দেখে অনুমান করা গেলেও জামায়াতে ইসলামী আসলে সাংগঠিকভাবে নিজেদের কতটা গুছিয়েছে সেটিও অজানা। দলটির ভোটব্যাংক নিয়েও আন্দাজ করা কঠিন। তবে গাজীপুরের বেশিরভাগ আসনই বিএনপির দখলে থাকবে বলে অনুমান তাদের।

এবার তাদের আলোচনার মধ্যে ঢুকে পড়া। এলাকার সমস্যা আর জনভোগান্তিসহ তাদের সঙ্গে নানান বিষয়ে কথা হলো প্রতিবেদকের। কিছুক্ষণের মধ্যেই উপস্থিত হলেন আরও এক ব্যক্তি। আলোচনা চলতে থাকলো। চায়ের দোকানি সোহাগ মাঝে-মধ্যে দুই একটা কথা বলে আলোচনায় তাল দিয়ে যাচ্ছেন। এই এলাকায় কার্যক্রম স্থগিত থাকা আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট নিয়েও কথা হলো। এভবে আলোচনা চললো বেশ কিছুক্ষণ।

আলাপ থেকে জানা গেল, এই এলাকার আওয়ামী লীগের পদধারী নেতাদের কাউকেই আর প্রকাশ্যে এলাকায় দেখা যায় না। পরিচিত সমর্থকদেরও তেমন একটা দেখা যায় না। এতে বেশ সংখ্যক আওয়ামী লীগের অনুসারীরা নির্বাচনে ভোট দিতে যাবেন কি না, সেটি নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় থাকা অন্যতম প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের ওই ভোটব্যাংক নিজেদের কবজায় আনার জন্য।

প্রথমে আলোচনায় থাকা দুই ব্যক্তির একজনের নাম আলমগীর হোসেন। তিনি এই এলাকারই ভোটার। নির্বাচনের আমেজ পুরোপুরি জমে উঠেছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত সবাই প্রচারণা চালাচ্ছে। মানুষের কাছে ভোট চাইছে। দেখছেন না পাশাপাশি দুই দলের ব্যানার টানানো রয়েছে। এখন ভোটে কে জিতবে সেটি শিওর বলা না গেলেও এই আসনে বিএনপি এগিয়ে আছে। আওয়ামী লীগের লোকজন ভোট দিতে গেলে সেসব ভোট বেশিরভাগই এখানে বিএনপিতে যাবে। জামায়াত টুকটাক পাবে। আওয়ামী লীগের নেতারা পলাতক, পরিচিত কর্মীদেরও তেমন দেখা যায় না৷ বাকী কর্মীরা নীরব।

আরেক ব্যক্তি রিপন হোসেন বলেন, সব প্রার্থীই প্রচারণা চালাচ্ছেন। ভোট শেষে দেখা যাবে কে জেতে। বিএনপির সম্ভাবনা থাকলেও জামায়াত বেশ আঁটঘাট বেঁধেই মাঠে নেমেছে৷ তাই একেবারেই নিশ্চিত কিছু বলা যায় না।

কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা বাস স্ট্যান্ড এলাকার চায়ের দোকানী মমতা বেগম। ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে এই এলকায় বসবাস তার, এখানকার ভোটারও তিনি। পঞ্চাশোর্দ্ধ এই নারী বলেন, আমি এখানকার ভোটার। এর আগেও ভোট দিয়েছি। এবারের নির্বাচনে ধানের শীষ-দাঁড়িপাল্লা সবাই ভোট চেয়েছে। নেতারা আসে, দলের লোকজনও আসে। সবাই ভোট চাচ্ছে। আমিও ভোট দিতে যাবো।

বিশ বছরের বেশি সময় ধরে একই এলাকায় বসবাস খলিল মিয়ার। নিজ জেলা কুড়িগ্রামের রৌমারী। তিনি ওখানকার ভোটার। আগে একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করলেও এখন সড়ক-যানবাহনে পেয়ারা, আমড়া বিক্রি করেন। এই এলাকার রাজনীতি নিয়ে জানাশোনাও বেশ।

জাগো নিউজকে তিনি বলেন, দোকানপাটে গল্প শুনি ধানের শীষের। এখন যেসব লোকজন মিছিল-মিটিংয়ে যায় তারা যদি ভোট দেয় তাহলে বিএনপি জিতে যাবে। ভোট নিয়ে কার মনে কী আছে বোঝা যায় না। প্রথম দিকে মুজিবুর সাহেব (বিএনপি প্রার্থী) এই এলাকায় সভা করতে পারে নাই। এখন সবাই সাপোর্ট দিতেছে। বিএনপির নেতাকর্মীরা সবাই এক হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, গ্রামের ভোটার আমি। নির্বাচনের দিনসহ চারদিন কারখানা বন্ধ থাকবে। ওই সময় বাড়িতে গেলে ভোট দেবো। তখন দেখা যাবে বাস ভাড়া বাড়ায় দিছে। এই কদিন ইনকাম ভালো হলে বাড়িতে যেয়ে ভোট দেবো। নইলে আর যাবো না।

গাজীপুর-১ আসনটি জেলার মোট ৫টি আসনের মধ্যে ভোটার সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় বৃহত্তম। আসনটিতে মোট ভোটার ৭ লাখ ২০ হাজার ৯৩৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৩ লাখ ৬০ হাজার ২৩৪ জন, নারী ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৯৩ জন ও হিজড়া ১২ জন।

আসনটি গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলা এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ১৮ নং ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। আর থানার সংখ্যা ৩ টি ( কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ি, কাশিমপুর)।

এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের মূল সমস্যা যানজট। এছাড়া চুরি, ছিনতাইয়ের মতো নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা আছেই। আরও আছে মাদকের ছড়াছড়ি। আগামীতে সংসদ সংসদ্য যিনি নির্বাচিত হবেন তার কাছে প্রত্যাশা এসব সমস্যার সমাধানে কার্যকরী ভূমিকা রাখবেন। এছাড়া গণপরিবহনে শৃঙ্খলা, সড়ক-ফুটপাত সংস্কার করে ধূলাবালিমুক্ত শহর দেখতে চান এখানকার বাসিন্দারা। সব মিলিয়ে নাগরিক নিরাপত্তা আর শহরের সৌন্দর্য দেখতে চান তারা।

ভোটের হিসাবে এলাকার সাধারণ মানুষ বলছে, দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় তাদের একটি নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে। নেতাকর্মীরা পলাতক থাকলেও তাদের সেই ভোটব্যাংকের দিকে নজর দিচ্ছে বিএনপি এবং জামায়াত। আওয়ামী লীগের চুপ থাকা অনুসারীরা ভোটে ফ্যাক্টর হবে। তাছাড়া এলকায় শিল্প কারখানা থাকায় শ্রমিক ভোটার রয়েছে অনেক। টানা ছুটিতে সেই ভোটাররা কেন্দ্রে ভোট দিতে যাবেন কি না সেটিও চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে বিএনপি কিছুটা এগিয়ে রয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

যা বলছেন প্রার্থীরা

এই আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. শাহ্ আলম বকশী মুঠোফোনে জাগো নিউজকে বলেন, জমি উর্বর হচ্ছে। ভাসমান ভোটার অনেকেই চলে যাবে। তবে শ্রমিকদের ভোট পাওয়ার বিষয়ে আমি আশাবাদী।

কার্যক্রম স্থগিত থাকা আওয়ামী লীগের ভোট পাওয়ার চেষ্টা করছেন কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা সবার কাছে যাচ্ছি। আওয়ামী লীগ-বিএনপি এগুলো কিছুই দেখছি না। আমরা আশাবাদী শুধু আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপিরও অনেক ভোট আমরা পাবো।

নির্বাচিত হলে প্রথমে দুর্নীতি এবং মাদক নির্মুলের কথাও জানান তিনি। তবে মুঠোফোনে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

প্রার্থী যারা

এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রার্থী মো.মজিবুর রহমান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মো. শাহ্ আলম বকশী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী রুহুল আমীন, জাতীয় পার্টির (জাপা) এস এম শফিকুল ইসলাম, গণফ্রন্টের প্রার্থী আতিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চৌধুরী ইরাদ আহমদ সিদ্দিকী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) তসলিমা আক্তার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী (মোটরসাইকেল প্রতীকে) মো.ইমারত হোসেইন খান।

এনএস/এএমএ