স্পেনের দক্ষিণ অঞ্চল আন্দোলোসিয়ায় সেভিয়ার ব্যস্ত পথের কোলাহল পেরিয়ে আল-কাজারের প্রাচীন ফটকে এসে দাঁড়াতেই মনে হলো সময় যেন হঠাৎ কয়েক শতাব্দী পেছনে ফিরে গেছে। ইট-পাথরের দেয়াল ছুঁয়ে আছে ইতিহাস, খিলানের ফাঁক গলে ঢুকে পড়ছে অতীতের আলো-ছায়া। প্রতিটি করিডোর, প্রতিটি অলংকরণ আর প্রতিটি জলাধার নিঃশব্দে বলে যাচ্ছে মুসলিম স্বর্ণযুগের এক গৌরবময় অধ্যায়ের কথা।
রিয়াল আল-কাজার অব সেভিয়া কেবল একটি প্রাসাদ নয়-এটি সভ্যতার মিলনস্থল, যেখানে ইসলামি সৌন্দর্য আর ইউরোপীয় রাজকীয়তার হাত ধরাধরি করে পথচলা। শাসক বদলেছে, যুগ বদলেছে, কিন্তু ইতিহাসের আত্মা আজও এখানেই বাস করে।
দেশটিতে দশম শতকে মুসলিম শাসনকদের হাত ধরে যে দুর্গের জন্ম হয়েছিল, সেটিই একদিন হয়ে ওঠে আন্দালুসিয়ার প্রশাসনিক হৃদয়। আরবি ‘আল-কাসর’ শব্দ থেকেই আল-কাজারের নাম-যার অর্থ দুর্গ বা রাজপ্রাসাদ। সে সময় আন্দালুসিয়া ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সংস্কৃতি আর স্থাপত্যের আলোয় উদ্ভাসিত এক স্বর্ণভূমি। করদোভা, গ্রানাদা আর সেভিয়ার মতো শহরগুলো ছিল মুসলিম সভ্যতার দীপ্ত কেন্দ্র, আর আল-কাজার সেই গৌরবের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
১২৪৮ সালে খ্রিস্টান বাহিনী সেভিয়া দখল করলেও আল-কাজার ভাগ্যবান-ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। বরং মুসলিম শিল্পীদের হাতেই নতুন করে সাজানো হয় প্রাসাদটি। ১৪শ শতকে রাজা পেদ্রো প্রথম এখানে গড়ে তোলেন এক অনন্য স্থাপত্যশৈলী-মুদেহার।
ইসলামি নকশার সূক্ষ্মতা আর ইউরোপীয় রাজকীয়তার জাঁকজমক মিলে জন্ম নেয় এক অপূর্ব সৌন্দর্য। দেয়ালে আরবি ক্যালিওগ্রাফি, জ্যামিতিক নকশা আর নিখুঁত কারুকাজ আজও জানান দেয়-এটি শুধু খ্রিস্টান রাজাদের বাসভবন নয়, বরং মুসলিম ঐতিহ্যের বহমান উত্তরাধিকার।
প্রাসাদের ভেতরে পা রাখতেই চোখে পড়ে প্যাটিও দে লাস দোনসেলাস-খিলানে ঘেরা এক প্রশান্ত অঙ্গন, মাঝখানে শান্ত জলাধার। পানিতে ভেসে ওঠে শতাব্দীপ্রাচীন দেয়ালের প্রতিবিম্ব, যেন ইতিহাস নিজের মুখ দেখছে নিজেই। আর সালোন দে অ্যাম্বাসাদোরেসের সোনালি গম্বুজের নিচে দাঁড়ালে শিহরণ জাগে। একসময় এখানেই বসতেন রাজারা, চলত কূটনৈতিক দরবার। চারপাশের দেয়ালে খোদাই করা আরবি লিপি আজও সাক্ষ্য দেয় সেই সময়ের গৌরবের।
প্রাসাদের বাইরে বিস্তৃত বাগান যেন এক স্বপ্নলোক—কমলা গাছের সারি, গোলাপের সুবাস, ফোয়ারার জলছন্দ আর সরু জলধারার মৃদু কলকল ধ্বনি। মুসলিম স্থাপত্যে বাগান ছিল জান্নাতের প্রতীক, আর আল-কাজারের এই উদ্যান সেই ধারণারই জীবন্ত রূপ। ইতিহাসের সংঘর্ষ আর দখলের গল্পের মাঝেও এখানে যেন শান্তির এক নীরব আশ্রয়। এই অসাধারণ ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে ১৯৮৭ সালে ইউনেস্কো আল-কাজারকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়। আজ এটি স্পেনের রাজপরিবারের সরকারি বাসভবন হলেও এর প্রতিটি দেয়ালের ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে আছে হারানো আন্দালুসিয়ার গল্প।
আল-কাজার কেবল একটি প্রাসাদ নয়-এটি সময়ের বুকে লেখা এক আবেগঘন মহাকাব্য। এখানে আছে বিজয়ের উল্লাস, পরাজয়ের বেদনা, আর সভ্যতার মেলবন্ধনের অনন্য ইতিহাস। মুসলিম স্বর্ণযুগের যে আলো একদিন ইউরোপকে আলোকিত করেছিল, আল-কাজার আজও সেই আলোর নীরব প্রদীপ হয়ে জ্বলছে-শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে।
এমআরএম/এমএস