দেশের লাইফ (জীবন ) ও নন-লাইফ (সাধারণ) বিমা কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন নবায়ন ফি পাঁচগুণ বাড়িয়েছে সরকার। বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে এই নিবন্ধন নবায়ন ফি বাড়ানো হয়েছে।
এই নবায়ন ফি বাড়িয়ে সম্প্রতি ‘বিমা ব্যবসার নিবন্ধন ফি বিধিমালা-২০১২’ সংশোধনের গেজেট প্রকাশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, ২০২৬, ২০২৭ ও ২০২৮ সালে নিবন্ধন নবায়ন ফি হবে প্রতি হাজার প্রিমিয়ার আয়ের ওপর ২ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ, কোনো কোম্পানি এক কোটি টাকা প্রিমিয়াম আয় করলে তাকে পরবর্তী বছরের নিবন্ধন নবায়নের জন্য ২৫ হাজার টাকা ফি দিতে হবে।
এছাড়া, ২০২৯, ২০৩০ ও ২০৩১ সালে ৪ টাকা এবং ২০৩২ সাল ও পরবর্তী সময়ের জন্য এই হার ৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই গেজেট প্রকাশের আগে বিমা কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন নবায়ন ফি ছিল প্রতি হাজার প্রিমিয়ার আয়ের ওপর ১ টাকা।
আইডিআরএ এর আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে সংস্থাটির মোট আয় ছিল ২৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিমা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশন বা নবায়ন ফি বাবদ নেওয়া হয় প্রায় ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। বাকি টাকা এসেছে রিভিউ ফি, শাখা রেজিস্ট্রেশন ফি, এজেন্সি লাইসেন্স ফি, জরিমানা আদায়, এফডিআরএ এর সুদ ও অন্যান্য আয় থেকে।
অন্যদিকে, ২০২০-২০২১ অর্থবছরে আইডিআরএ এর মোট ব্যয় হয় ১১ কোটি ২ লাখ টাকা। এ ছাড়াও আয়কর বাবদ ৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা প্রভিশন বাদ দিয়ে সংস্থাটির ওই বছরে উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ১১ কোটি ১৬ লাখ টাকা। ৩০ জুন ২০২১ সালে সংস্থাটির মোট তহবিলের পরিমাণ ছিল ১০৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
নিবন্ধন নবায়ন ফি বাড়ানোর প্রস্তাবে আইডিআর এর পক্ষ থেকে বলা হয়, ভবিষ্যতে তাদের এই ব্যয় অন্তত চারগুণ বাড়বে- এ কারণে বর্তমানে প্রতি হাজার টাকা গ্রস প্রিমিয়ামের বিপরীতে ১ টাকা হারে নেওয়া নিবন্ধন নবায়ন ফি বাড়িয়ে তিন ধাপে ৫ টাকা করার প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়েছে।
নিবন্ধন ফি বাড়ানোর ক্ষেত্রে আইডিআরএ যেসব কারণ উল্লেখ করে তার মধ্যে রয়েছে- দুয়ার সার্ভিস লিমিটেডের পরিচালিত আইআইএমএস প্লাটফর্মের বিল পরিশোধ, কর্তৃপক্ষের জনবল বৃদ্ধি এবং পেনশন-গ্র্যাচুইটি প্রদান, নিজস্ব ভবন নির্মাণ ও শাখা অফিস স্থাপন এবং বিমা খাতে পেশাদারত্ব উন্নয়নে বিসিআইআই, বিআইআইএম, ‘একচ্যুয়ারিয়াল সোসাইটি অব বাংলাদেশ’সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গঠন।
নিবন্ধন নবায়ন ফি কোম্পানিগুলোর নিজস্ব ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হলেও সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এই ব্যয় বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত পরোক্ষভাবে গ্রাহকের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ কোম্পানিগুলোর অপারেশনাল ব্যয় বেড়ে গেলে তা সামাল দিতে প্রিমিয়াম কাঠামো, কমিশন ব্যয়, সেবার মান এবং প্রশাসনিক ব্যয়ে পরিবর্তন আসতে পারে।
এমন সময়ে ফি বাড়ানো হলো যখন দেশের বিমা খাতে গ্রাহক আস্থা সংকট, দাবি পরিশোধে বিলম্ব এবং বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। ফলে বাজার সম্প্রসারণ ও গ্রাহক সুরক্ষা জোরদারের পাশাপাশি ফি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত খাতটির জন্য নেতিবাচক বার্তা তৈরি করতে পারে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রিমিয়াম আয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ বাড়বেনিবন্ধন নবায়ন ফি বর্তমানে প্রতি হাজার টাকা গ্রস প্রিমিয়ামে ১ টাকা, অর্থাৎ হার শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। এটি ৫ টাকায় উন্নীত হলে হার দাঁড়াবে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রতি হাজারে অতিরিক্ত ৪ টাকা বা অতিরিক্ত শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ ব্যয় বহন করতে হবে কোম্পানিগুলোকে।
আর প্রথম ধাপে ২ দশমিক ৫০ টাকা ফি নির্ধারণ করা হলেও কোম্পানিগুলোকে প্রতি হাজারে ১ দশমিক ৫০ টাকা বা অতিরিক্ত ০ দশমিক ১৫ শতাংশ ব্যয় বহন করতে হবে। এক্ষেত্রে ২০২৪ সালে লাইফ ও নন-লাইফ বিমা খাতে সংগৃহীত ১৮ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা গ্রস প্রিমিয়ামকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হলে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ হিসেবে কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত নিবন্ধন নবায়ন ফি দিতে হবে ২৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
এমএএস/এএমএ